কি কারনে তথাকথিত পুত্র বধূ ক্রীতদাস যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করলেন স্বয়ং নবী (স:)

“কি কারনে তথাকথিত পুত্র বধূ ক্রীতদাস যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিবাহ করলেন স্বয়ং নবী (স)”

আল্লাহর রাসূল (সঃ) নবুয়তের পরে যা কিছু করেছেন তার সবটাই ছিল আল্লাহর নিয়ন্ত্রনে। রাসূল (সঃ) এর কোন কাজকে অস্বীকার করা বা প্রশ্নের সম্মুখিন করা সরাসরি আল্লাহর হুকুমকে চ্যালেঞ্জ করার সামিল। আল্লাহর কুদরতের সবটুকু সবার পক্ষে বুঝা সম্ভব নাও হতে পারে তাই বলে তাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করা যাবেনা। মুমিনদের কাজ হল শুনলাম এবং মেনে নিলাম।
যারা আল্লাহর হুকুম এবং রাসূল (সঃ) এর আমলকে প্রশ্নের সম্মুখিন করে তারা মূলত মুমিন নয় বরং মোনাফেক। সেই সকল অবিশ্বাসীদের ব্যপারে আল্লাহ কঠিন সতর্ক বানি উচচারণ করেছেন।

আল কাহফ এর ২৯নং আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেনঃ
পরিষ্কার বলে দাও, এ হচ্ছে সত্য, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে, এখন যে চায় মেনে নিক এবং যে চায় অস্বীকার করুক৷
আমি (অস্বীকারকারী) জালেমদের জন্য একটি আগুন তৈরি করে রেখেছি যার শিখা গুলো তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলেছে৷

সেখানে তারা পানি চাইলে এমন পানি দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হবে, যা হবে তেলের তলানির মতো৷

এবং যা তাদের চেহারা দগ্ধ করে দেবে৷ কত নিকৃষ্ট পানীয় এবং কি জঘন্য আবাস!

জাহেলীয়াতের সকল রসম রেওয়াজকে ভেঙ্গে একটা ইনসাফপূর্ণ সমাজ কায়েম করার জন্যই আল্লাহ তা’য়ালা রাসূল (সঃ) কে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন। সমাজের সকল ভ্রুকুটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাসূল (সঃ) আল্লাহর সকল বিধানকে বাস্তব জীবনে আমল করে দেখিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (সঃ) আল্লাহর বিধান দুনিয়ায় বস্তবায়ন করায়, শয়তানের শরীরের আগুণ লেগে গেছে, তাই শয়তানের চ্যালারা আজও জ্বলে পুড়ে মরছে, তাই কিছু বিষয়ে তারা সেই ১৪৫০ বছর থেকেই চর্বিত চর্বন করে আসছে। যার মধ্যে রাসূল (সঃ) এর পালক পুত্র যায়েদের (রঃ) স্ত্রী যিনি রাসূল (সঃ) এর ফুফাত বোনও ছিলেন তার বিবাহ বিচ্ছেদের পরে আল্লাহর হুকুমে রাসূল (সঃ) কর্তৃক তাকে বিবাহ করা অন্যতম।

৫ম হিজরীর যিলক্বাদ মাসে ঘটে এ নতুন কৌশলটির প্রথম আত্মপ্রকাশ। এ সময় নবী করীম (সা:) আরব থেকে পালক পুত্র সংক্রানত্ম জাহেলী রীতি নিমর্ুল করার জন্য নিজেই নিজের পালক পুত্রের (যায়েদ রা: ইবনে হারেসা) তালাক দেয়া স্ত্রীকে (জয়নব রা: ইবনে জাহশ) বিয়ে করেন। এ সময় মদীনার মুনাফিকরা অপপ্রচারের এক মিথ্যা বিরাট তান্ডব সৃষ্টি করে। বাইর থেকে ইহুদী মুশরিকরাও তাদেও কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মিথ্যা অপবাদ রটাতে শুরু করে। তারা অদ্ভূত অদ্ভূত সব গল্প তৈরী করে চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে থাকে। যেমন নবী করীম সা: কিভাবে তার পালক পুত্রের স্ত্রীকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যান(নাউযুবিলস্না)। কিভাবে পুত্র তার প্রেমের খবর পেয়ে যায় এবং তার পর নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার উপর থেকে নিজের অধিকার প্রত্যাহার কওে, তারপর তিনি কিভাবে নিজের পুত্রবধূকে বিয়ে করেন। এ গল্পগুলো এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, মুসলমানরাও এগুলোর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেননি। এ কারনে মুহাুদ্দিস ও মুফারসিরদের একটি দল হযরত যয়নব ও যায়েদের সম্পর্কে যে হাদীস বর্ননা করেছেন সেগুলোর মধ্যে আজো ঐসব মনগড়া গল্পের অংশ পাওয়া যায়। হযরত যয়নব রা: ছিলেন নবী করীম সা: এর আপন ফুফুর মেয়ে। তার সমগ্র শৈশব থেকে যৌবনকাল নবী করীম সা: এর সামনে অতিবাহিত হয়েছিল। তাকে ঘটনাক্রমে একদিন দেখে নেয়া এবং নাউযুবিলস্না তার প্রেমে পড়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই দেখা যায় না। কারন কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ অভিজাত পরিবারের মেয়ে একজন মুক্তিপ্রাপ্ত গোলামের পত্নী হওয়াকে স্বভাবতই মেনে নিতে পারতো না। কিন্তু নবী করীম সা: কেবলমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার সূচনা নিজের পরিবার থেকে শুরম্ন করার জন্যই হযরত যয়নব রা: এ বিয়েতে রাজী হতে বাধ্য করেন। এসব কথা বন্ধু এবং শত্রম্ন সবাই জানতো। আর একথাও সবাই জানতো, হযরত যয়নবের বংশীয় আভিজাত্যবোধই তার ও যায়েদ ইবনে হারেসার মধ্যকার দাম্পত্য সম্পর্ক স্থায়ী হতে দেয়নি এবং শেষ পর্যনত্ম তালা্ হয়ে যায়। কিন্তু এ সব সত্তেও নির্লজ্জ মিথ্যা অপবাদকারীরা নবী করীম সা: এর ওপরে জঘন্য ধরনের নৈতিক দোষারোপ করে এবং এত ব্যাপক আকারে সেগুলো ছড়ায় যে, আজো পর্যনত্ম তাদের এ মিথ্যা প্রচারনার প্রভাব দেয়া যায়।

“বিষয়টি সম্পর্কে সূরা সূরা আল আহযাব এর ৩৭ নং আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছেঃ আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।”

এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয় বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী (সাঃ) হযরত যয়নবকে (রাঃ) বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল।
এ আয়াত গুলো অধ্যায়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যে শত্রুরা নবী (সঃ) এর বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তরজ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি। বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছাড়নো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা।
(আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন):
এখানে যায়েদের (রাঃ) কথা বলা হয়েছে। সামনের দিকে কথাটি সুস্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ কি ছিল এবং নবী (সাঃ) এর অনুগ্রহ কি ছিল সে কাহিনীটি বর্ননা করে দেয়া জরুরী মনে করছি।
যায়েদ (রাঃ) ছিলেন আসলে কালব গোত্রের হারেসা ইবনে শারাহীল নামক এক ব্যক্তির পুত্র। তাঁর মাতা সু’দা বিনতে সা’লাব ছিলেন তাঈ গোত্রের বনী মা’ন শাখার মেয়ে। তাঁর বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর মা তাকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান। সেখানে নবী কাইন ইবনে জাসকরের লোকেরা তাদের লোকালয় আক্রমণ করে এবং লুটপাট করে যেসব লোককে নিজেদের সাথে পাকড়াও করে নিয়ে যায় তদের মধ্যে হযরত যায়েদও ছিলেন। তারা তায়েফের নিকটবর্তী উকাযের মেলায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিক্রি করে দেয়। হযরত খাদীজার (রা) ভাতিজা হাকিম ইবনে হিযাম তাঁকে কিনে নিয়ে যান। তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে এসে নিজের ফুফুর খেদমতে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করেন। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত খাদীজার (রা) যখন বিয়ে হয় তখন নবী করীম (সাঃ) তার কাছে যায়েদকে দেখেন এবং তার চালচলন ও আদব কায়দা তার এত বেশী পছন্দ হয়ে যায় যে, তিনি হযরত খাদীজার (রা) কাছ থেকে তাকে চেয়ে নেন। এভাবে এই সৌভাগ্যবান ছেলেটি সৃষ্টির সেরা এমন এক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসে যান যাকে কয়েক বছর পরেই মহান আল্লাহ নবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে যাচ্ছিলেন। তখন হযরত যায়েদের (রা) বয়স ছিল ১৫ বছর। কিছুকাল পরে তার বাপ চাচা জানতে পারেন তাদের ছেলে মক্কায় আছে। তারা তার খোজ করতে করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে যার। তারা বলেন, আপতি মুক্তিপণ হিসেবে যা নিতে চান বলুন আমরা তা আপনাকে দিতে প্রস্তুত আছি, আপনি আমাদের সন্তান আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন। নবী করীম (সা) বলেন, আমি ছেলেকে ডেকে আনছি এবং তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দি‌চিছ, সে চাইলে আপনাদের সাথে চলে যেতে পারে এবং চাইলে আমার কাছে থাকতে পারে। যদি সে আপনাদের সাথে চলে যেতে চায় তাহলে আমি এর বিনিময়ে মুক্তি পণ হিসেবে কোন অর্থ নেবো না এবং তাকে এমনিই ছেড়ে দেবো। আর যদি সে আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আমি এমন লোক নই যে, কেউ আমার কাছে থাকতে চাইলে আমি তাকে খামখা তাড়িয়ে দেবো। জাববে তারা বলেন, আপনি যে কথা বলেছেন তাতো ইনসাফেরও অতিরিক্ত। আপনি ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে নিন। নবী করীম (সা) যায়েদকে ডেকে আনেন এবং তাকে বলেন, এই দু’জন ভদ্রলোককে চেনো৷ যায়েদ জবাব দেন, জি হ্যাঁ, ইনি আমার পিতা এবং ইনি আমার চাচা। তিনি বলেন, আচ্ছা, তুমি এদেরকেও জানো এবং আমাকেও জানো। এখন তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, তুমি চাইলে এদের সাথে চলে যেতে পারো এবং চাইলে আমার সাথে থেকে যাও। তিনি জবাব দেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কারো কাছে যেতে চাই না। তার বাপ ও চাচা বলেন, যায়েদ, তুমি কি স্বাধীনতার ওপর দাসত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছো এবং নিজের মা-বাপ ও পরিবার পরিজনকে ছেড়ে অন্যদের কাছে থাকতে চাও৷ তিনি জবাব দেন, আমি এ ব্যক্তির যে গুণাবলী দেখেছি তার অভিজ্ঞতা লাভ করার পর এখন আর দুনিয়ার কাউকেও তার ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না। যায়েদের এ জবাব শুনে তার বাপ ও চাচা সন্তুষ্ট চিত্তে তাকে রেখে যেতে রাজি হয়ে যান। নবী (সাঃ) তখনই যায়েদকে আযাদ করে দেন এবং হারাম শরীফে গিয়ে কুরাইশদের সাধারণ সমাবেশে ঘোষণা করেন, আপনারা সবাই সাক্ষী থাকেন আজ থেকে যায়েদ আমার ছেলে, সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং আমি তার উত্তরাধিকারী হবো। এ কারণে লোকেরা তাঁকে যায়েদ ইবণে মুহাম্মাদ বলতে থাকে। এসব নবুওয়াতের পূর্বের ঘটনা।
তারপর যখন নবী (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন চারজন এমন ছিলেন যারা এক মুহূর্তের জন্যও কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই তাঁর মুখে নবুওয়াতের দাবী শুনতেই তাকে নবী বলে মেনে নেন। তাদের একজন হযরত খাদীজা (রা), দ্বিতীয়জন হযরত যায়েদ (রা), তৃতীয় জন হযরত আলী (রা) এবং চতুর্থজন হযরত আবু বকর (রা)। এ সময় হযরত যায়েদের (রা) বয়স ছিল ৩০ বছর এবং নবী করীমের (সা) সাথে তার ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল।
হিজরাতের পরে ৪ হিজরীতে নবী (সা) নিজের ফুফাত বোনের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন। নিজের পক্ষ থেকে তার মোহরানা আদায় করেন এবং ঘর-সংসার গুছিয়ে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও দেন। এ অবস্থায় প্রতিই মহান আল্লাহ তাঁর “যার প্রতি আল্লাহ ও তুমি অনুগ্রহ করেছিল” বাক্যাংশের মধ্যে ইশারা করেছেন।

(তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।):
এটা সে সময়ের কথা যখন হযরত যায়েদ (রা) ও হযরত যয়নবের (রা) সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী (সাঃ) এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই। হযরত যয়নব (রাঃ) যদিও আল্লাহ ও তাঁর রসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো হযরত যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি। এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে। এক বছরের কিছু বেশী দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

(আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত।):
কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী (সাঃ) নিজেই হযরত যয়নবকে (রা) বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল হযরত যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক। কিন্তু যখন যায়েদ (রাঃ) এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাকে নিষেধ করলেন। একথায় আল্লাহ বলছেন, তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো । যদি এ সূরার ১,২,৩,ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড় হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভুত হবে যে, হযরত যায়েদ ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছি সে সময়ই আল্লাহ নবী (সাঃ) কে এ মর্মে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিযে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কি তা নবী (সাঃ) জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড় বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল- এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতস্তত করছিলেন। এ কারণে হযরত যায়েদ (রা) যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম (সাঃ) তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না। তার উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চমর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের (সাঃ) ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখ নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়। তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশংকা ছিল। অথচ আল্লাহ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন। ”তুমি লোক ভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সংগত”- এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইগিত করছে।
ইমাম যয়নুল আবেদীন হযরত আলী ইবনে হোসাই (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ নবী (সাঃ) কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব (রাঃ) আপনার স্ত্রী মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন। কিন্তু যায়েদ (রাঃ) যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না। এ কথায় আল্লাহ বলেলেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে আল্লাহ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)
আল্লামা আলূসীও তাফসীর রুহল মা’আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে (রা) বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর। অভিব্যক্ত ক্রোধের সারৎসার হচেছঃ তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না৷ অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে।”

(অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে):
অর্থাৎ যায়েদ (রা) যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো। প্রয়োজন পূর্ণ করলো শব্দ গুলো স্বতষ্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোন প্রয়োজন থাকলো না। কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না। কারণ স্বামীর আর কোন আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়। তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
নবী (সাঃ) নিজেই নিজের ইচ্ছায় এ বিয়ে করেননি বরং আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে করেন, এ ব্যাপারে এ শব্দগুলো একবারেই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।এ শব্দগুলো একথা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে যে, আল্লাহ এ কাজ নবী (সাঃ) এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না। আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোন পথ ছিল না। কাজেই আল্লাহ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন।

(Dbadboi Xian)

Leave Your Comments

Your email address will not be published.