কাদিয়ানিদের ভ্রান্তির জবাব- (১ম পর্ব)

Shortlink:

সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে – রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
أنا خاتم الأنبياء ومسجدى اخرالمساجد
“আমি সর্বশেষ নবী এবং আমার মসজিদ সর্বশেষ মসজিদ।”
কাদিয়ানিরা এ হাদিসে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানির নবুওয়াত দাবীর বৈধতা খুঁজে পাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। তাদের যুক্তি হল, হাদিসের শেষভাগে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, “আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) সর্বশেষ মসজিদ”। অথচ দুনিয়াতে লক্ষ লক্ষ মসজিদ আজো তৈরি হচ্ছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত হবে। তা সত্ত্বেও “মসজিদে নববী” যদি সর্বশেষ মসজিদ হয়ে থাকে তাহলে নবী মুহাম্মদ (সা.) শেষনবী হওয়া সত্ত্বেও তার পরে নতুন নবীর আগমন হতে পারবেনা কেন? (এ হল কাদিয়ানীদের বক্তব্য)।
___________
একটি কথা বলে রাখা দরকার তা হল, আমরা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ করছি যে, কাদিয়ানীরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে প্রায়শই বলে বেড়াত যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাতামুন্নাবিয়্যীন বা সর্বশেষ নবী এবং তার পরে আর কোনো নবীর আগমন হবেনা- এ আকিদা তাদেরও। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সে নিজেও তার রচিত “মাজমু ইশতিহারাত” পুস্তকের ১ম খন্ডের ২৩১ নং পৃষ্ঠায় এমনই লিখেছে। এমনকি সে মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নতুন যে কোনো নবুওয়াত এবং রেসালাত দাবিদারকে অভিশপ্ত আর “কাফির” আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু বড্ড বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এমন আকিদা আর বিশ্বাসের দাবিদাররাই মুসলিম শরিফের উক্ত হাদিসের খণ্ডিত অংশের বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নতুন নবীর আগমনের সম্ভাবনা থাকার দাবী উঠায় এবং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তাদের এ দ্বিমুখী চরিত্র উম্মতে মুহাম্মদির সাথে কতবড় ধোঁকাবাজি তা চিন্তা করে দেখুন!
_________
এবার চলুন তাদের আপত্তির জবাব দিই। মূলত কাদিয়ানিরা উক্ত হাদিসের প্রকৃত মর্মার্থ বুঝেনি যে এমন নয়। তারা বুঝেশুনেই মির্যার নবুওয়াত দাবির বদনাম ঘোচাতে হাদিসকে বেঁকিয়ে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। নচেৎ হাদিসে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে যে, انا آخر الأنبياء তথা আমি শেষ নবী। আর তার পরক্ষণেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, مسجدى آخر المساجد তথা আমার মসজিদই শেষ মসজিদ। এখানে নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজেকে সর্বশেষ নবী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে যেন বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমি যেমন সর্বশেষ নবী ঠিক তদ্রুপ আমার প্রতিষ্ঠাকৃত মসজিদে নববীও সর্বশেষ মসজিদ। আমার পরে যেমন কোনো নবীর আগমন হবেনা, তেমনি আমার পরে কোনো মসজিদও নবীর মাধ্যমে তৈরি হবেনা।
__________
এবার হয়ত জানতে চাচ্ছেন যে, এ ব্যাখ্যাটি কোথায় আছে? হ্যাঁ এ কথাটিই আমরা বার বার বুঝাতে চাই যে কুরআনের সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা খোদ করআন, তারপর নবীর ব্যাখ্যা, তারপর অন্যদের।
হাদীসের ক্ষেত্রেও একই নীতি। প্রথম ব্যাখ্যা নবীর, তারপর সাহাবাদের, তারপর ধারাবাহিকভাবে অন্যদের।
ব্যাখ্যাটি নবী মুহাম্মদ (সা.) আরেকটি হাদিস দ্বারা আমাদের পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। সে সম্পর্কে পরে আলোচনায় আসছি। তার আগে আমাদের জানতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা) নিজ তত্ত্বাবধানে হিজরতের পর মদিনায় এসে প্রথমে মসজিদে কুবা তারপর মসজিদে নববী তৈরি করেছিলেন। মসজিদে কুবা বা কুবা মসজিদ (আরবি: مسجد قباء) সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত। এটি ইসলামের প্রথম মসজিদ। হিজরতের পর মুহাম্মদ (সা) এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এখানে তিনি বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন।
তারপর মসজিদে নববী মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সর্বশেষ মসজিদ যা বর্তমান সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত। গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদুল হারামের পর মসজিদে নববীর স্থান। মুহাম্মদ (সা) হিজরত করে মদিনায় আসার পর এই মসজিদ নির্মিত হয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মসজিদ। রাসূল সা. কর্তৃক ৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সর্বশেষ মসজিদ হওয়াতে তিনি বলেছিলেন : مسجدى آخر المساجد তথা আমার মসজিদই শেষ মসজিদ। সুতরাং কাদিয়ানিদের জন্য মতলবসিদ্ধ ব্যাখ্যা দেয়ার সকল রাস্তাই বন্ধ।
_________
এবার আসুন বুঝা যাক আমরা উপরিউক্ত মর্মার্থ কোন হাদিস দ্বারা বুঝলাম। তার জবাবে বলব, হাদিসের অন্যতম কিতাব ‘আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব’ কিতাবেও উপরিউক্ত হাদিসটি পাওয়া যায়। সেখানে শব্দের সামান্য পরিবর্তন সহ বর্ণনাকারীর বর্ণনাতে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে – آخر مساجد الأنبياء তথা নবীদের মসজিদগুলোর সর্বশেষ মসজিদ। এ পর্যন্ত শেষ না, আরো আছে দেখুন। হযরত উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন :
قال رسول اﷲﷺ أنا خاتم الأنبياء و مسجدى خاتم مساجد الأنبياء
অর্থাৎ রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন : আমি সর্বশেষ নবী আর আমার মসজিদ নবীদের মসজিদগুলোর সর্বশেষ মসজিদ।” (দেখুন, কাঞ্জুল উম্মাল খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ২৫৬; হারামাঈন পরিচ্ছেদ)।
______
তার মানে হল, রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করার জন্য প্রত্যেক যুগেই নবীগণ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, আর সর্বশেষ নবী হিসেবে আমি মসজিদে নববী নির্মাণ করেছি। যেহেতু আমার পরে কোনো নবী নেই, সেহেতু নবীগণের মসজিদগুলোর সর্বশেষ মসজিদ হচ্ছে আমার মসজিদ। (এ হল হাদিসের প্রকৃত মর্মার্থ।)
______
আফসোস! ভণ্ড নবী মির্যা কাদিয়ানীকে নবী সাব্যস্ত করার হীন উদ্দেশ্যে তার অনুসারিরা হাদিসের প্রকৃত মর্মার্থ ন্যক্কারজনকভাবে পাল্টে দিয়েছে।
__________
পরিশেষে বলতে পারি যে, পবিত্র কুরানের একটি আয়াত অপর আয়াতের জন্য ব্যাখ্যা হিসেবে যেমন সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তেমনি রাসূল (সা)-এর কোনো হাদিস যদি মর্মের দিক থেকে অস্পষ্ট থাকে তখন তাঁর অপরাপর হাদিস দ্বারা সেই অস্পষ্টতাকে পরিষ্কার করে নিতে হবে। আমরা সহীহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হাদিসটির সঠিক মর্মার্থ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-থেকে রাসূল (সা)-এর আরেকটি হাদিস দ্বারা পরিষ্কার করে নিই। যা দুনিয়ার অন্যান্য সমুদয় বুঝ ও ব্যাখ্যার চেয়ে সর্বোত্তম এবং একমাত্র ব্যাখ্যা। তার বিপরীতে সকল মর্মার্থ বাতিল। সুতরাং কাদিয়ানিদের উদেশ্যমূলক বুঝটি বানোয়াট এবং বাতিল। জ্ঞানীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *