হাদীস, আসারে সাহাবা ও তাবেয়ী এবং তা‘আমুলে উম্মাহর আলোকে মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতিগত পার্থক্য

Shortlink:

নারী পুরুষ উভয়ই মানুষ। এ হিসেবে উভয়ের মাঝে কোন তারতম্য নেই। নারী পুরুষ একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ পরিপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু এই স্বতঃসিদ্ধতা সত্ত্বেও উভয়ের মাঝে রয়েছে গঠনগত অনেক ব্যবধান। ব্যবধানই যদি না থাকতো তাহলে উভয়ের নাম ভিন্ন হতো না। নারীর ঋতুস্রাব হয়; কিন্তু পুরুষের তা হয় না। নারীর উদরে গর্ভথলি আছে; পুরুষের নেই। নারী সন্তান প্রসব করে, পুরুষ ধারণই করতে পারে না। নারীর স্বর, চেহারা দৈহিকগঠন এক রকম, পুরুষের ভিন্ন রকম। পুরুষের গোঁফ, দাড়ি গজায় নারীর স্বাভাবিকত তা হয়না। এটাই প্রমাণ করে নারী পুরুষ সর্বক্ষেত্রে সমান নয়। আগেও কখনো সমান ছিলো না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও কখনো হবেনা। এসব পার্থক্যের দিকগুলোকে বাহ্যিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্ব দেয়া হয়, তেমনি ইসলামি শরীয়তে ইবাদত পালনের ক্ষেত্রেও কিছু হুকুম পালনে পার্থক্য করে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে হুকুম অভিন্ন। এসব ব্যবধানের দিক সবার অজানা নয়।
কিছু ব্যবধান এখানে তুলে ধরলাম-

১. পুরুষের কর্মক্ষেত্র যুদ্ধের ময়দানে, আর নারীর কর্মস্থল প্রসূতি ঘরে। পুরুষ ওখানে মারা গেলে শহীদ হয় আর নারী প্রসবের সময় মারা গেলে শহীদ হয়।

২. পুরুষ একসাথে চার স্ত্রী রাখতে পারে, নারী একাধিক স্বামী গ্রহণই করতে পারেনা।

৩. ইসলামী বিধান মতে উপার্জনের দায়িত্ব পুরুষের। আর নারীর রয়েছে তা ভোগ করার অধিকার। পৈত্রিক সম্পদ মেয়ে যা পাবে, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে কুরআনের বিধান মতে ছেলে পাবে তার দ্বিগুণ।

৪. পুরুষের উপর হজ ফরয হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচাদি থাকলেই যথেষ্ট। আর নারীর ক্ষেত্রে হজ আদায়ের জন্য নিজের খরচ ছাড়াও স্বামী বা মাহরাম পুরুষের যাতায়াত খরচের ব্যবস্থাও থাকা শর্ত।

৫. ইহরামের আকার আকৃতি পুরুষের হয় একরকম আর নারীর হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

৬. ইহরাম খোলার সময় পুরুষের মাথা হলক করা অধিক পুণ্যময়, আর নারীদের মাথা হলক করা মারাত্মক গুনাহ।
নামাযের ক্ষেত্রে দেখুন-
১. ইমাম ও খতীব একমাত্র পুরুষই হতে পারে, নারী ইমাম-খতীব হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

২. আযান ইকামত দেওয়া পুরুষেরই দায়িত্ব। নারীর জন্য আযান ইকামত দেওয়া বৈধ নয়।

৩. পুরুষ জামাতে নামায পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। আর নারীর জন্য জামাতের কোন বিধান নেই।

৪. পুরুষের নামায বিনা ওযরে মসজিদ ছাড়া পূর্ণ হয় না। আর মহিলা ঘরে নামায পড়েই পূর্ণ সাওয়াব লাভ করে।

৫. জুমা ও ঈদের নামায পুরুষের জন্য সময়ভেদে ফরয ও সুন্নাত; কিন্তু মহিলার জন্য এর বিধানই রাখা হয়নি।

৬. নারীর জন্য সতরের পরিধেয় একরকম; পুরুষের বেলায় তা ভিন্ন।
এসব ব্যবধান সুস্পষ্ট। কেউ দ্বিমত করতে পারবে না।

এবার দেখুন নামায পড়ার পদ্ধতিগত ব্যবধান সম্পর্কে শরয়ী দলিল ভিত্তিক কয়েকটি উদাহরণ:

নারী পুরুষের নামাযে ব্যবধান রয়েছে

প্রথম দলিল: হাদীসের আলোকে
ক. ইয়াযিদ বিন আবি হাবীব রা. রাসূল স. এর ঘটনা বর্ণনা করেন-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى امْرَأَتَيْنِ تُصَلِّيَانِ فَقَالَ: ্রإِذَا سَجَدْتُمَا فَضُمَّا بَعْضَ اللَّحْمِ إِلَى الْأَرْضِ فَإِنَّ الْمَرْأَةَ لَيْسَتْ فِي ذَلِكَ كَالرَّجُلِগ্ধ (المراسيل لابي داود: ص৫৫،رقم: ৮৭شاملة)

একবার রাসূল স. নামাযরত: দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদেরকে নামায শিক্ষার উদ্দেশ্যে বললেন, যখন সিজদা করবে তখন শরীর যমিনের সাথে মিলিয়ে দিবে। (অতপর তার কারণ উল্লেখ করে বললেন) কেননা, মহিলারা এ ক্ষেত্রে পুরুষের মত নয়। (নারী পুরুষ এ ব্যাপারে সমান নয়।) (মারাসীলে আবী দাউদ: পৃ:৫৫ হা: ৮০)

প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমীর ইয়ামানী র. এ হাদীসটিকে দলিল স্বরূপ পেশ করে নারী পুরুষের মাঝে সিজদার ব্যাপারে পার্থক্য আছে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। (সুবুলুস সালাম:১/৩৫১)

আহলে হাদীসের ইমাম, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন তার রচিত বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে হাদীসটির ব্যাপারে লিখেছেন: “উল্লেখিত হাদীসটি সকল ইমামের মূলনীতি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য। (দ্র:আওনুল বারী:১/৫২০)

খ. হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. থেকে বর্ণিত-

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا جَلَسَتِ الْمَرْأَةُ فِي الصَّلَاةِ وَضَعَتْ فَخِذَهَا عَلَى فَخِذِهَا الْأُخْرَى، وَإِذَا سَجَدَتْ أَلْصَقَتْ بَطْنَهَا فِي فَخِذَيْهَا كَأَسْتَرِ مَا يَكُونُ لَهَا، وَإِنَّ اللهَ تَعَالَى يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَيَقُولُ: يَا مَلَائِكَتِي أُشْهِدُكُمْ أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهَا ” (السنن الكبري للبيهقي: ২/২২৩،رقم: ৩১৯৯ شاملة)

রাসূল স. বলেছেন মহিলা যখন নামাযে বসবে, তখন যেন এক উরু অপর উরুর উপর রাখে। আর যখন সিজদা করে তখন যেন পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। এটা তার সতরের ক্ষেত্রে বেশী উপযোগী। আল্লাহ তায়ালা তাকে দেখে বলেন ওহে আমার ফেরেশতারা ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। (সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী: ২/২২৩)

গ. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর আল ইয়ামানী রা. বলেন-

جِئْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: (فساق الحديث) ্রيَا وَائِلُ بْنَ حُجْرٍ، إِذَا صَلَّيْتَ فَاجْعَلْ يَدَيْكَ حِذَاءَ أُذُنَيْكَ، وَالْمَرْأَةُ تَجْعَلُ يَدَيْهَا حِذَاءَ ثَدْيَيْهَاগ্ধ.(المعجم الكبير للطبراني: ২২/১৯،رقم: ২৮ شاملة)

আমি ইয়ামান থেকে রাসূল স. এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি আমাকে অনেক বিষয়ের সাথে একথা বললেন, হে ওয়াইল বিন হুজর! যখন তুমি নামায পড়বে, তখন কান বরাবর হাত তুলবে। আর মহিলা হাত উঠাবে বুক বরাবর। (আলমুজামুল কাবীর তাবরানী: ২২/১৯-২০ হাদীসটি হাসান, আমল যোগ্য)
এ জাতীয় আরো বহু হাদীস আছে অথচ এর বিপরীতে কোন হাদীস বিদ্যমান নেই। অতএব মহিলা-পুরুষের নামাযে পার্থক্য সুস্পষ্ট। এ ব্যাপারে সাহাবাদের আমলও অনুরূপ।

দ্বিতীয় দলিল: সাহাবাদের ফাতওয়া
ক. হযরত আলী রা. বলেন-
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: ্রإِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَلْتَحْتَفِزْ، وَلْتُلْصِقْ فَخِذَيْهَا بِبَطْنِهَاগ্ধ (رواه عبد الرزاق في المصنف وابن ابي شيبة في مصنفه. اسناده جيد والصواب في الحارث هو التوثيق.)
মহিলা যখন সিজদা করবে তখন সে যেন খুব জড়সড় হয়ে সিজদা করে এবং উরু পেটের সাথে মিলিয়ে রাখে। (মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক: ৩/১৩৮, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা:২/৩০৮)

খ. ইবনে আব্বাস রা. এর ফাতওয়া-
عن ابن عباس (رض) أنه سئل عن صلاة المرأة، فقال تجتمع وتحتفز. (رواه ابن ابي شيبة، رجاله ثقات)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞাস করা হয়েছে যে, মহিলা কিভাবে নামায আদায় করবে ? তিনি জবাবে বলেন, খুব জড়সড় হয়ে এবং অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায আদায় করবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা:১/৩০২ হাদীসটি সহীহ)
সাহাবাদের শিষ্য ও অনুসারী তাবেয়ীনে কিরামের ফাতওয়াও এমন।

তৃতীয় দলিল: তাবেয়ীনের ফাতওয়া
ক. আতা ইবনে আবী রাবাহ রা. (মক্কা বাসীর ইমাম)-এর ফাতওয়া-

حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، قَالَ: أنا شَيْخٌ لَنَا , قَالَ: سَمِعْتُ عَطَاءً، سُئِلَ عَنِ الْمَرْأَةِ: كَيْفَ تَرْفَعُ يَدَيْهَا فِي الصَّلَاةِ؟ قَالَ: ্রحَذْوَ ثَدْيَيْهَاগ্ধ(مصنف ابن ابي شيبة: ১/২৭০)
হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ র.কে জিজ্ঞেস করা হলো, নামাযে মহিলা কতটুকু হাত উঠাবে ? তিনি বললেন, “বুক বরাবর”। (মুসন্নাফে ইবনে আবী শাইবা:১/২৭০)

খ. ইবনে জুরাইজ র. বলেন-
قُلْتُ لِعَطَاءٍ: تُشِيرُ الْمَرْأَةُ بِيَدَيْهَا بِالتَّكْبِيرِ كَالرَّجُلِ؟ قَالَ: ্রلَا تَرْفَعْ بِذَلِكَ يَدَيْهَا كَالرَّجُلِগ্ধ، وَأَشَارَ فَخَفَضَ يَدَيْهِ جِدًّا، وَجَمَعَهُمَا إِلَيْهِ جِدًّا…..الخ (مصنف ابن ابي شيبة: ১/২৭০)
আমি আতা র. কে জিজ্ঞাসা করলাম, মহিলা কি তাকবীরের সময় পুরুষের সমান হাত তুলবে ? তিনি বললেন, মহিলা পুরুষের মত হাত উঠাবে না। (অতপর তিনি মহিলাদের হাত তোলার আকৃতি বুঝালেন) তার উভয় হাত পুরুষ অপেক্ষায় অনেক নিচুতে রেখে শরীরের সাথে খুব মিলিয়ে রাখলেন। অতপর বললেন, “মহিলাদের পদ্ধতি পুরুষ থেকে ভিন্ন)। (মুসান্নাফে আবী শাইবা:১/২৭০)

গ. মক্কা বাসীর অপর ইমাম মুজাহিদ ইবনে জাবের র. এর বর্ণনা-
عَنْ مُجَاهِدٍ أَنَّهُ كَانَ يَكْرَهُ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ بَطْنَهُ عَلَى فَخِذَيْهِ إِذَا سَجَدَ كَمَا تَضَعُ الْمَرْأَةُ ”
অর্থাৎ পুরুষের জন্য মহিলার মত উরুর সাথে পেট লাগিয়ে সিজদা করাকে তিনি মাকরুহ বলতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১/৩০২)

ঘ. ইবনে শিহাব যুহরী র. এর ফাতওয়া-
“قال لا ترفع يديها حذو منكبيها”
অর্থাৎ মহিলা কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১/২৭০)

ঙ. হাসান বসরী ও কাতাদাহ র. বলেন-
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا وَكِيعٌ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: ্রإِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَلْتَلْزَقْ بَطْنَهَا بِفَخِذَيْهَا، وَلَا تَرْفَعْ عَجِيزَتَهَا، وَلَا تُجَافِي كَمَا يُجَافِي الرَّجُلُগ্ধ
মহিলা যখন সিজদা করবে তখন সে যেন যথা সম্ভব জড়সড় থাকে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ফাঁকা রেখে সিজদা না করে। যাতে কোমর উচু হয়ে না থাকে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা:১/৩০৩)

চ. ইবরাহিম নাখয়ী র. বলেন-
كَانَتْ تُؤْمَرُ الْمَرْأَةُ أَنْ تَضَعَ ذِرَاعَهَا وَبَطْنَهَا عَلَى فَخِذَيْهَا إِذَا سَجَدَتْ، وَلَا تَتَجَافَى كَمَا يَتَجَافَى الرَّجُلُ، لِكَيْ لَا تَرْفَعْ عَجِيزَتَهَاগ্ধ
মহিলাদের আদেশ করা হতো, তারা যেন সিজদা অবস্থায় হাত ও পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। পুরুষের মত অঙ্গ প্রতঙ্গ ফাঁকা না রাখে। যাতে কোমর উচু হয়ে না থাকে। (মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক:৩/১৩৭)

ছ. খালিদ ইবনে লাজ র. বলেন-
كُنَّ النِّسَاءُ يُؤْمَرْنَ أَنْ يَتَرَبَّعْنَ إِذَا جَلَسْنَ فِي الصَّلَاةِ، وَلَا يَجْلِسْنَ جُلُوسَ الرِّجَالِ عَلَى أَوْرَاكِهِنَّ، يُتَّقَى ذَلِكَ عَلَى الْمَرْأَةِ مَخَافَةَ أَنْ يَكُونَ مِنْهَا الشَّيْءُগ্ধ
মহিলাদেরকে আদেশ করা হত, তারা যেন নামাযে দুই পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের উপর বসে। পুরুষদের মত না বসে। সতর জাতীয় কোন অঙ্গ প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এ হুকুম দেয়া হয়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১/৩০৩)

চার ইমামের মাযহাব ও মহিলা পুরুষের নামাযে পার্থক্য
ক. হানাফী মাযহাব
ইমাম মুহাম্মদ র. বলেন-
“أحب الينا أن تجمع رجليها في جانب ولا تنصب انتصاب الرجل”. ০كتاب الآثارلمحمد: ১/২০৯)
আমাদের নিকট মহিলার নামাযে বসার উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে- উভয় পা এক পাশে মিলিয়ে রাখবে, পুরুষের মত এক পা দাঁড় করিয়ে রাখবে না। (কিতাবুল আসার ইমাম মুহাম্মাদ: ১/৬০৯)
খ. মালেকী মাযহাব
ইমাম কারাফী র. ইমাম মালেক র.এর মত উল্লেখ করেন-

أَمَّا مُسَاوَاةُ النِّسَاءِ لِلرِّجَالِ فَفِي النَّوَادِرِ عَنْ مَالِكٍ تَضَعُ فَخِذَهَا الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى وَتَنْضَمُّ قَدْرَ طَاقَتِهَا وَلَا تُفَرِّجُ فِي رُكُوعٍ وَلَا سُجُودٍ وَلَا جُلُوسٍ بِخِلَافِ الرَّجُلِ. (الذخيرة للقرافي:২/১৯৩)

মহিলা ডান উরু বাম উরুর উপর রাখবে এবং যথা সম্ভব জড়সড় হয়ে বসবে। রুকু সিজদা ও বৈঠকে কোনো সময় উরুদ্বয় ফাঁকা রাখবে না। পুরুষের পদ্ধতি ভিন্ন। (যাখিরা-২/১৯৩)

গ. শাফেয়ী মাযহাব
ইমাম শাফেয়ী র. বলেন-
(قَالَ الشَّافِعِيُّ) : وَقَدْ أَدَّبَ اللَّهُ تَعَالَى النِّسَاءَ بِالِاسْتِتَارِ وَأَدَّبَهُنَّ بِذَلِكَ رَسُولُهُ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – وَأُحِبُّ لِلْمَرْأَةِ فِي السُّجُودِ أَنْ تَضُمَّ بَعْضَهَا إلَى بَعْضٍ وَتُلْصِقَ بَطْنَهَا بِفَخِذَيْهَا وَتَسْجُدَ كَأَسْتَرِ مَا يَكُونُ لَهَا وَهَكَذَا أُحِبُّ لَهَا فِي الرُّكُوعِ وَالْجُلُوسِ وَجَمِيعِ الصَّلَاةِ أَنْ تَكُونَ فِيهَا كَأَسْتَرِ مَا يَكُونُ لَهَا. (الام للشافعي: ১/১৩৮)
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা মহিলাদের শরীরকে পুরোপুরি আবৃত রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। আর রাসূল স. ও অনুরূপ শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাই আমার নিকট উত্তম হলো, সিজদা অবস্থায় মহিলারা এক অঙ্গের সাথে অপর অঙ্গকে মিলিয়ে রাখবে। পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে। সিজদা এমনভাবে করবে যাতে সতরের চুড়ান্ত হেফাজত হয়। অনুরূপ রুকু বৈঠক এমনকি পুরো নামাযে এমনভাবে থাকবে যাতে সতরের নিশ্চিত হেফাজত হয়। (উম্ম -শাফেয়ী:১/১৩৮)

ঘ. হাম্বলী মাযহাব
ইবনে কুদামা র. ইমাম আহমদ র. এর মাযহাব বর্ণনা করেন-
أَمَّا الْمَرْأَةُ فَذَكَرَ الْقَاضِي فِيهَا رِوَايَتَيْنِ عَنْ أَحْمَدَ إحْدَاهُمَا، تَرْفَعُ؛ لِمَا رَوَى الْخَلَّالُ، بِإِسْنَادِهِ عَنْ أُمِّ الدَّرْدَاءِ، وَحَفْصَةَ بِنْتِ سِيرِينَ أَنَّهُمَا كَانَتَا تَرْفَعَانِ أَيْدِيَهُمَا. وَهُوَ قَوْلُ طَاوُسٍ، وَلِأَنَّ مَنْ شُرِعَ فِي حَقِّهِ التَّكْبِيرُ شُرِعَ فِي حَقِّهِ الرَّفْعُ كَالرَّجُلِ، فَعَلَى هَذَا تَرْفَعُ قَلِيلًا. قَالَ أَحْمَدُ: رَفْعٌ دُونَ الرَّفْعِ. وَالثَّانِيَةُ: لَا يُشْرَعُ؛ لِأَنَّهُ فِي مَعْنَى التَّجَافِي، وَلَا يُشْرَعُ ذَلِكَ لَهَا، بَلْ تَجْمَعُ نَفْسَهَا فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ وَسَائِرِ صَلَاتِهَا.(المغني لابن قدامة: ২/১৩৯)
তাকবীরের সময় মহিলারা হাত উঠাবে কিনা ? এ বিষয়ে কাজী (ইয়ায) ইমাম আহমদ র. থেকে দুটি মত উল্লেখ করেছেন। প্রথম মত অনুযায়ী হাত তুলবে। কেননা, খাল্লাল র. হযরত উম্মে দারদা রা. এবং হযরত হাফসা বিনতে সীরীন র. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা হাত উঠাতেন, তবে সামান্য। আহমদ র.বলেন, তূলনামূলক কম উঠাবে। দ্বিতীয় মত এই যে, মহিলাদের জন্য হাত উঠানোর বিধান নেই। কেননা, হাত উঠালে কোনো কোনো অঙ্গকে ফাঁক করতেই হয়। অথচ মহিলাদের জন্য এর বিধান দেয়া হয়নি; বরং তাদের জন্য নিয়ম হলো, রুকু সিজদাসহ পুরো নামাযে নিজেদের কে গুটিয়ে রাখা। (আল মুগনী কুদামা: ২/১৩৯)

লামাযহাবীদের অনুসৃত আলেমগণের মত
মাও. মুহাম্মদ দাউদ গযনবী র. তার ‘ফাতওয়ায়ে গযনবিয়্যা’তে লিখেছেন, তার পিতা আল্লামা আব্দুল জাব্বার গযনবী কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো যে, মহিলাদের নামাযের মধ্যে জড়সড় হয়ে থাকা কি উচিত ? জবাবে তিনি একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেন: হ্যাঁ, এর উপরই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের চার মাযহাব সহ সকলের অবিচ্ছিন্ন আমল চলে আসছে। অতপর তিনি চার মাযহাবের কিতাবের উদ্বৃতি প্রদান করে বলেন-

মোট কথা- মহিলাদের জড়সড় হয়ে নামায পড়ার হাদীস, চার মাযহাবের ইমামগণ ও অন্যান্যদের সর্ব সম্মত আমলের আলোকে প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী হাদীস ও উম্মতের সর্ব সম্মত আমল সম্পর্কেই অজ্ঞ। (গযনবীয়্যা : পৃ:২৭/২৮)
তাদের অন্য আলেম মাও. আলী মুহাম্মদ সাঈদ র.ও মহিলা-পুরুষের নামাযে পার্থক্যের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তার বর্ণিত গ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে উলামায়ে আহলে হাদীস। (মাজমুআয়ে মাসায়েল:১/৩০৫)
তাদের ইদানিং কালের মহামান্য মাও. আব্দুল হক হাশেমী মুহাজিরে মক্কি র. এ পার্থক্য স্বীকার করে একটি পুস্তিকাই রচনা করেছেন। তার নাম হলো:
“نصب العمود في تحقيق مسئلة تجافي المرأة في الركوع والسجود والقعود”
সুবুলুস সালামের গ্রন্থকার মুহাদ্দিস আমীরে ইয়ামানী র. তা স্বীকার করেছেন। পুর্বে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদেরই সুপ্রসিদ্ধ ইমাম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান ও আওনুল বারীতে তা মেনে নিয়েছেন।
এই ছিল যুগ যুগ ধরে মহিলা-পুরুষের নামাযের ব্যবধানের ইতিহাস। রাসূল স. এর হাদীস, সাহাবা ও তাবেয়ীনের ফাতওয়া, আসার এবং চার মাযহাবের ইমামদের সর্ব সম্মত মতানুসারে মহিলা-পুরুষের নামাযের কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্যের বিবরণ।
এবার পরিসংখ্যান হিসেবে প্রত্যেক বিষয়কে পৃথকভাবে দেখুন।

মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতিগত পার্থক্যের বিস্তারিত বিবরণ

তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত উঠানোর ক্ষেত্রে চারটি পার্থক্য
প্রথম পার্থক্য-
তাকবীরে তাহরীমার সময় পুরুষ কান পর্যন্ত হাত উঠাবে। পক্ষান্তরে মহিলা বুক পর্যন্ত উঠাবে।
১নং দলিল-
হযরত ওয়ায়েল বিন হুজর রা. সূত্রে বর্ণিত-

عن وائل بن حجر قال : جئت النبي صلى الله عليه و سلم فساق الحديث وفيه فقال لي رسول الله صلى الله عليه و سلم : يا وائل بن حجر إذا صليت فاجعل يديك حذاء أذنيك والمرأة تجعل يديها حذاء ثدييها.
وقال الهيثمي في مجمع الزوائد وقال رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي حَدِيثٍ طَوِيلٍ فِي مَنَاقِبِ وَائِلٍ مِنْ طَرِيقِ مَيْمُونَةَ بِنْتِ حُجْرٍ، عَنْ عَمَّتِهَا أُمِّ يَحْيَى بِنْتِ عَبْدِ الْجَبَّارِ، وَلَمْ أَعْرِفْهَا، وَبَقِيَّةُ رِجَالِهِ ثِقَاتٌ.(إعلاء السنن: رقم :৬৫৬)

তিনি বলেন, আমি রাসূল স. এর দরবারে হাজির হলাম। তখন তিনি আমাকে (অনেক কথার সাথে এ কথাও) বললেন, হে ওয়াইল ইবনে হুজর ! যখন তুমি নামায শুরু করবে তখন কান বরাবর হাত উঠাবে। আর মহিলা বুক বরাবর হাত উঠাবে। (আল- মু‘জামুল কাবীর:২২/১৯, কানযুল উম্মাল :৭/৪৩১, ইলাউস সূনান: ২/১৭১ এই হাদীসটি হাসান।)

২নং দলিল-
আনাস রা. সূত্রে বর্ণিত-
عن أنس قال : كان رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا افتتح الصلاة كبر ورفع يديه حتى يحاذي بإبهاميه أذنيه (رواه الدار قطني وقال رجاله كلهم ثقات كذا في الزيلعي.)
তিনি বলেন যে, রাসূল সা. যখন নামায শুরু করতেন তখন উভয় হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কান পর্যন্ত উঠাতেন। (ইলাউস্সুনান: ২/৬৭৩ হাদীসটির সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য)

৩নং দলিল-
মালেক বিন হুওয়াইরিস রা. সূত্রে বর্ণিত-
عن مالك بن الحويرث أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- كان إذا كبر رفع يديه حتى يحاذى بهما أذنيه وإذا ركع رفع يديه حتى يحاذى بهما أذنيه وإذا رفع رأسه من الركوع فقال ্র سمع الله لمن حمده গ্ধ. فعل مثل ذلك.
রাসূল স. যখন তাকবীর বলতেন তখন উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। অন্য বর্ণনায় কানের লতি পর্যন্ত উঠাতেন। (মুসলিম শরীফ:১/১৬৮)

৪নং দলিল-
হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. সূত্রে বর্ণিত-
عن علقمة بن وائل ومولى لهم أنهما حدثاه عن أبيه وائل بن حجر أنه رأى النبى -صلى الله عليه وسلم- رفع يديه حين دخل فى الصلاة كبر – وصف همام حيال أذنيه
রাসূল স.কে নামায শুরু করার সময় উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠাতে দেখেছি। হুমাম হাত তোলার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, কান বরাবর তুলেছেন।(মুসলিম শরীফ :১/১৭৩)

৫নং দলিল-
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাতে আছে-
حدثنا هشيم ، قال : أخبرنا شيخ لنا ، قال : سمعت عطاء ؛ سئل عن المرأة كيف ترفع يديها في الصلاة ؟ قال : حذو ثدييها.(اسناده صحيح ان كان المراد ب”شيخ لنا” هو ابن جريج وان كان شيخ مجهول لكن يؤيده رواية ابن جريج عن عطاء فاسناده حسن.
হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ র.কে জিজ্ঞেস করা হলো, মহিলারা নামাযে হাত কতটুকু উঠাবে ? তিনি বললেন, বুক পর্যন্ত উঠাবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪২১,হাদীসটির সনদ হাসান)

৬নং দলিল-
হযরত আবু মাইসারা রা. বলেন-
كان أصحابنا إذا افتتحوا الصلاة رفعوا أيديهم إلى آذانهم
আমাদের সাথীগণ যখন নামায শুরু করতেন তখন উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪০৮)

৭ নং দলিল-
মদীনা বাসীর ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী র. বলেন-
ترفع يديها حذو منكبيها.
মহিলারা উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠাবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪২১)

উল্লিখিত ১,২,৩,৪ ও ৬ নং হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পুরুষ হাত কান পর্যন্ত উঠাবে। আর ১,৫ ও ৭ নং হাদীস দ্বারা মহিলাদের বুক পর্যন্ত হাত উঠানো প্রমাণিত হলো। এছাড়াও অনেক হাদীস রয়েছে, যেগুলোতে পুরুষ ও মহিলা সাহাবীদের আমল পেশ করা হয়েছে যে, মহিলারা বুক পর্যন্ত হাত উঠাতেন। আর পুরুষ কান পর্যন্ত উঠাতেন।
উল্লেখ্য, হাত উঠানোর ক্ষেত্রে রাসূল স. থেকে তিন ধরণের আমল পাওয়া যায়:
(ক) কান পর্যন্ত
(খ) কানের লতি পর্যন্ত
(গ) কাঁধ পর্যন্ত
হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ যেহেতু এক হাদীসে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার স্থলে সকল হাদীস থেকে সারনির্জাস আহরণ করেন। তাই তারা বলেন যে, এমন ভাবে হাত উঠাতে হবে যাতে করে হাতের আঙ্গুল কান পর্যন্ত, বৃদ্ধাঙ্গুল কানের লতি বরাবর এবং হাতের তালু কাঁধ বরাবর থাকে।

দ্বিতীয় পার্থক্য- হাত শরীরের সাথে মিলাবে কি না ?
হাত উঠানোর সময় পুরুষ হাত শরীরের সাথে মিলাবে না। পক্ষান্তরে মহিলা হাত উঠানোর সময় হাত শরীরের সাথে মিলিয়ে রাখবে।

১নং দলিল-
ইবনে জুরাইজ র. বলেন-
حدثنا محمد بن بكر ، عن ابن جريج ، قال : قلت لعطاء : تشير المرأة بيديها بالتكبير كالرجل ؟ قال : لا ترفع بذلك يديها كالرجل ، وأشار فخفض يديه جدا ، وجمعهما إليه جدا ، وقال : إن للمرأة هيئة ليست للرجل ، وإن تركت ذلك فلا حرج.
আমি আতা ইবনে আবী রাবাহ কে জিজ্ঞেস করলাম মহিলা কি তাকবীরের সময় পুরুষের ন্যায় হাত তুলবে ? তিনি বললেন, না। পুরুষের মত হাত উঠাবে না। এই বলে তিনি (মহিলাদের হাত তোলার ভঙ্গি দেখালেন এবং) তার উভয় হাত (পুরুষ অপেক্ষা) অনেক নিচু রেখে শরীরের সাথে একেবারে মিলিয়ে রাখলেন। অতপর বললেন, নিশ্চই মহিলাদের (নামাযের) পদ্ধতি পুরুষের মত নয়; বরং ভিন্ন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক:৩/৩৯, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৪২১,হাদীসটি হাসান)
এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, মহিলা হাত উঠানোর সময় হাত বুকের সাথে মিলিয়ে রাখবে। আর পুরুষ বুকের সাথে মিলাবে না। এও বলা হয়েছে যে, মহিলার নামাযের পদ্ধতি পুরুষের মত নয়; বরং উভয়ের পদ্ধতিতে ব্যাপক ব্যাবধান রয়েছে।

তৃতীয় পার্থক্য- হাতের আঙ্গুল কেমন রাখবে ?
পুরুষ হাত উঠানোর সময় আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিক রাখবে। আর মহিলারা আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে রাখবে।
দলিল-
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাতে আছে-
حدثنا أبو عبد الرحمن المقرئ ، عن سعيد بن أبي أيوب ، عن يزيد بن أبي حبيب ، عن بكير بن عبد الله بن الأشج ، عن ابن عباس ؛ أنه سئل عن صلاة المرأة ؟ فقال : تجتمع وتحتفز.
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা.কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, মহিলারা কীভাবে নামায আদায় করবে ? তিনি বললেন, খুব জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায আদায় করবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ২/৫০৫,হাদীসটি সহীহ)

উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে যে, মহিলারা অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায আদায় করবে এবং এটাই তাদের নামায আদায় করার মূলনীতি। সুতরাং তারা হাত উঠানোর সময়ও আঙ্গুলগুলো শরীরের সাথে মিলিয়ে রাখবে।
এখানে দুই নং পার্থক্যের হাদীসটিও দ্রষ্টব্য যে, মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক নয়; বরং ভিন্ন। অতএব, মহিলা আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে রাখবে। আর পুরুষ সাভাবিক অবস্থায় রাখবে।

চতুর্থ পার্থক্য
যদি ওযর না থাকে, তাহলে পুরুষ উভয় হাত চাদর থেকে বের করবে (যদি চাদর গায়ে থাকে) পক্ষান্তরে মহিলা ওড়নার ভিতর থেকে হাত বের করবেনা; বরং ওড়নার ভিতরেই রাখবে।
দলিল-
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত-
عن عبد الله : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال المرأة عورة (فإذا خرجت استشرفها الشيطان) (قال أبو عيسى هذا حديث حسن غريب)
রাসূল স. ইরশাদ করেন, মহিলা জাতি হলো সতর। (তিরমিযি:১/২২২, হাদীসটি হাসান গরীব)
স্মর্তব্য, বর্ণিত হাদীসে যেহেতু মহিলাদেরকে সতর বলা হয়েছে, কাজেই তারা নামাযের মধ্যে পুরুষের ন্যায় হাত আঁচল থেকে বের করবে না। করলে সতরের বিপরীত হবে। শরীয়ত নামাযের ক্ষেত্রে মহিলাদের সতরের দিকটি খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছে যে, মহিলা এমনভাবে নামায পড়বে যা তার সতরের জন্য অধিক উপযোগী। যেমন, রাসূল স. তাদের নামাযের জন্য ঘরের অন্দর মহলকে উত্তম বলেছেন।
রাসূল স. ইরশাদ করেন-
صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَاগ্ধ (سنن ابي داود: ১/৮৪،رقم: ৫৭০ شاملة)
মহিলাদের ঘরের নামায বারান্দার নামাযের চাইতে উত্তম এবং অন্দর মহলের নামায ঘরের নামাযের চেয়ে উত্তম।
আর নামায আদায়ের ক্ষেত্রে বলেছেন, كأسترمايكون لها অর্থাৎ এমনভাবে নামায পড়বে যা সতরের জন্য অধিক উপযোগী। (সুনানে কুবরা:২/২২৩)
উপরন্তু এ বক্তব্য হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ র.-এর বাণী ও মতামত দ্বারাও সমর্থিত। তিনি বলেন,
تجتمع المرأة يديها في قيامها ما استطاعت.
অর্থাৎ মহিলাগণ দাড়ানো অবস্থায় হাতদ্বয় যথাসম্ভব মিলিয়ে রাখবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক:৩/১৩৭)
অনুরূপভাবে কুরআন সুন্নাহর ব্যাখ্যা ও তার আমলী দৃষ্টান্তের সংরক্ষণকারী ফিকহে ইসলামী থেকেও একথা প্রমাণিত হয়-
আল্লামা শামী র. বলেন, ولا تخرج يديها من كميها.
অর্থাৎ মহিলারা আঁচলের ভেতর থেকে হাত বের করবে না। (২/২২১)
তাহতাভী গ্রন্থে আছে-
والمرأة تخالف الرجل في مسائل ….منها: انها لاتخرج كفيها من كميها عند التكبير لانه استر له.
অর্থাৎ কিছু মাসআলার ক্ষেত্রে মহিলাদের বিষয়টা পুরুষদের থেকে ভিন্ন। তার মধ্যে একটি হলো, মহিলারা তাকবীরের সময় হাতদ্বয় আস্তিন (জামার হাতা) থেকে বের করবে না। কেননা, এতে পর্দা অধিক রক্ষা হয়। (পৃ:২৫৯)

হাত বাঁধার ক্ষেত্রে দুটি পার্থক্য
প্রথম পার্থক্য
মহিলারা হাত বুকের উপর বাঁধবে। কেননা, রাসূল স. মহিলাদেরকে সতর বলেছেন। আর নাভির নিচে হাত বাঁধার তূলনায় বুকের উপর হাত বাঁধা সতরের জন্য অধিক উপযোগী। পক্ষান্তরে পুরুষ নাভির নিচে হাত বাঁধবে। কেননা নাভির নিচে হাত বেঁধে দাড়ানো বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ।
১ম দলিল-
ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত-
رأيت النبي صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة.(اسناده صحيح: آثار السنن: ص৯০)

আমি রাসূল স.কে দেখেছি, তিনি নামাযের মধ্যে ডান হাতকে বাম হাতের পিঠের উপর রেখে নাভির নিচে বাঁধতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৩/৩২০,হাদীসটি সহীহ)

২য় দলিল-
হযরত আলী রা. বলেন-
السنة وضع الكف في الصلوة تحت السرة. (ابوداود: رقم: ৭৫৬)
নামাযের মধ্যে হাতের উপর হাত রেখে নাভির নিচে বাঁধা সুন্নাত। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৩/৩২৪)

৩য় দলিল-
হযরত ইবরাহিম নাখয়ী র. বলেন-
يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة. (اسناده حسن: آثار السنن: ص৯১)
নামাযের মধ্যে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নিচে বাঁধবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৩/৩২২,হাদীসটি হাসান)

৪র্থ দলিল-
হাজ্জাজ ইবনে হাসসান র. বলেন-
سمعت أبا مجلز ، أو سألته ، قال : قلت : كيف أصنع ؟ قال : يضع باطن كف يمينه على ظاهر كف شماله، ويجعلها أسفل من السرة. (اسناده صحيح: آثار السنن: ص৯১)

আমি আবু মিজলাযকে বলতে শুনেছি (অথবা আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি) যে, নামাযের মধ্যে হাত কীভাবে রাখবো ? তিনি বললেন, ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রেখে উভয় হাত নাভির নিচে বাঁধবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৩/৩২৩,হাদীসটি সহীহ)

উপরোক্ত হাদীসসমূহে রাসূল স.-এর আমল, সাহাবী ও তাবেয়ীদের বর্ণনা পেশ করা হলো। এ হাদীসসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পুরুষ নাভির নিচে হাত বাঁধবে। (আর মহিলাদের ক্ষেত্রে হাত তোলার ৪র্থ পার্থক্যের দলিলসমূহ প্রযোজ্য) মহিলাদেরকে রাসূল স. সতর বলেছেন এবং নামাযের ক্ষেত্রে মহিলাদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তারা জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায পড়বে। এমনভাবে নামায পড়বে যা তাদের সতরের অধিক উপযোগী। আর বুকের উপর হাত বাঁধা তাদের সতরের জন্য অধিক উপযোগী। তাই মহিলাদের জন্য বুকের উপর হাত বাঁধা উত্তম। আর রাসূলের যুগ থেকে এ পর্যন্ত এভাবেই আমল হয়ে আসছে যে, পুরুষ নাভির নিচে হাত বাঁধে। আর মহিলা বুকের উপর হাত বাঁধে।

দ্বিতীয় পার্থক্য-
হাত বাঁধার সময় পুরুষ ডান হাতের কনিষ্ঠ ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা বাম হাতের কব্জিকে ধরবে। আর বাকি তিন আঙ্গুল বিছিয়ে দিবে। পক্ষান্তরে মহিলা শুধু ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রাখবে। কেননা, পুরুষ নাভির নিচে হাত বেঁধে যেভাবে শক্ত করে ধরতে পারে, বুকের উপর হাত রেখে সেভাবে ধরতে গেলে সহজে ধরা যায়না; বরং কিছু কৃত্রিমতা ও কষ্ট অনুভব হয়। এতে নামাযের একাগ্রতার মধ্যে বিঘœতা সৃষ্টি হয় যা একাগ্রতা পরিপন্থী। হাত কিভাবে বাঁধবে এ বিষয়ে রাসূল থেকে দু‘ধরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। (শামী-২/১৮৭)
১. শুধুমাত্র ডান হাতের তালু বাম হাতের পিঠের উপর রাখা।
২. কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা বাম হাতের কব্জি ধরা।
তাই ফক্বীহগণ বলেন যে, উক্ত পদ্ধতিতে আমল করলে উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে যাবে।

রুকুর মধ্যে পাঁচটি পার্থক্য
প্রথম পার্থক্য
রুকুর মধ্যে পুরুষ পিঠ বিছিয়ে মাথা, কোমর ও পিঠ একসমান রাখবে। পক্ষান্তরে মহিলারা পুরুষের ন্যায় পিঠ বিছাবে না; বরং হাত শরীরের সাথে মিশিয়ে হাঁটু পর্যন্ত পৌছে পরিমাণ ঝুঁকবে।

দ্বিতীয় পার্থক্য
পুরুষ উভয় পায়ের গোড়ালির মাঝে ফাঁকা রাখবে। আর মহিলারা পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখবে।

তৃতীয় পার্থক্য
পুরুষ বাহুদ্বয় পাজরের সাথে মিলাবে না। কিন্তু মহিলারা মিলিয়ে রাখবে।

চতুর্থ রার্থক্য
পুরুষ উভয় হাত হাঁটুর উপর রেখে শক্ত করে ধরবে। আর মহিলা উভয় হাত হাঁটুর উপর স্বাভাবিকভাবে রাখবে।

পঞ্চম পার্থক্য
মহিলা হাতের আঙ্গুলসমূহ মিলিয়ে রাখবে আর পুরুষ আঙ্গুল ফাঁকা করে হাঁটু শক্ত করে ধরবে।

পুরুষের রুকুর পদ্ধতির দলিলসমূহ
১ম দলিল-
হযরত আয়েশা রা. বলেন-
كان رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يستفتح الصلاة بالتكبير والقراءة ب (الحمد لله رب العالمين) وكان إذا ركع لم يشخص رأسه ولم يصوبه ولكن بين ذلك.(صحيح مسلم: رقم: ১১৩৮)
রাসূল স. যখন রুকু করতেন মাথা একেবারে ঝুকাতেন না। আবার উঁচুও রাখতেন না; বরং উভয়ের মাঝামাঝি রাখতেন।

২য় দলিল-
সালেম র. থেকে বর্ণিত-

عَنْ سَالِمٍ الْبَرَّادِ، قَالَ: أَتَيْنَا عُقْبَةَ بْنَ عَمْرٍو الْأَنْصَارِيَّ أَبَا مَسْعُودٍ، فَقُلْنَا لَهُ: حَدِّثْنَا عَنْ صَلَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ” فَقَامَ بَيْنَ أَيْدِينَا فِي الْمَسْجِدِ، فَكَبَّرَ، فَلَمَّا رَكَعَ وَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى رُكْبَتَيْهِ وَجَعَلَ أَصَابِعَهُ أَسْفَلَ مِنْ ذَلِكَ، وَجَافَى بَيْنَ مِرْفَقَيْهِ حَتَّى اسْتَقَرَّ كُلُّ شَيْءٍ مِنْهُ،…… ثُمَّ قَالَ: هَكَذَا رَأَيْنَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي ” (سنن ابي داود: ১/১২৬)
حديث صحيح: هامش عون المعبود لعصام الصبابطي: ২/২৩৫)

তিনি বলেন, আমরা আবু মাসউদ রা.-এর নিকট গিয়ে বললাম যে, আমাদেরকে রাসূলের নামায সম্পর্কে বর্ণনা দিন। তখন তিনি আমাদের সামনে মসজিদে দাড়ালেন এবং (নামাযের) তাকবীর বললেন। আর এমনভাবে রুকু করলেন যে, উভয় হাত হাঁটুর উপর ছিলো। আর আঙ্গুলগুলো হাঁটুর নিচে ছিলো। বাহু পাজর থেকে পৃথক ছিলো। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্থির হওয়া পর্যন্ত এভাবে ছিলেন। এরপর বললেন, আমরা রাসূলকে এভাবেই নামায পড়তে দেখেছি। (আবু দাউদ: ১/১২৬ হাদীসটি সহীহ )

৩য় দলিল-
হযরত আলী রা. বলেন-
إذا ركعت فضع كفيك على ركبتيك ،وابسط ظهرك ،ولا تقنع رأسك ،ولا تصوبه،ولا تمتد،ولا تقبض

যখন রুকু করবে তখন উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখবে এবং পিঠ বিছিয়ে দিবে। আর মাথা উঁচু-নিচু করবে না একেবারে ছড়িয়েও রাখবেনা আবার গুটিয়েও রাখবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৪৩৮)

৪র্থ দলিল-
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন-
اتق الحنوة في الركوع ، والحدبة.
রুকুতে মাথা ঝুঁকিয়ে পিঠকে ধনুকের মতো করা থেকে বিরত থাকবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৪৫৪)

উপরোক্ত হাদীসসমূহ থেকে পুরুষের রুকুর পদ্ধতি সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, পুরুষ রুকুতে পিঠ বিছিয়ে দিয়ে মাথা, পিঠ ও কোমর সমান রাখবে এবং উভয় হাত দ্বারা হাঁটুকে মজবুত করে ধরবে। আর হাতের আঙ্গুলগুলো এবং উভয় পায়ের মাঝে ফাঁকা রাখবে।

মহিলাদের রুকুর পদ্ধতির দলিল
৫ম দলিল-
হযরত মালেক র. থেকে বর্ণিত-
عن مالك تضع فخذها اليمنى على اليسرى وتنضم قدر طاقتها ولا تفرج في ركوع ولا سجود ولا جلوس بخلاف الرجل
মহিলারা রুকু, সিজদা ও বসা অবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী জড়সড় হয়ে থাকবে। পুরুষ তার বিপরীত (পুরুষ খোলা-মেলাভাবে নামায পড়বে।) (আয-যখীরা : ২/১৯৩)

৬ষ্ঠ দলিল-
হযরত বুকাইর বিন আব্দুল্লাহ বিন আশাজ সূত্রে বর্ণিত-
عن بكير بن عبد الله بن الأشج ، عن ابن عباس ؛ أنه سئل عن صلاة المرأة ؟ فقال : تجتمع وتحتفز. (اسناده صحيح ورجاله ثقات)
ইবনে আব্বাস রা.কে মহিলাদের নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, মহিলারা জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায পড়বে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৫ হাদীসটি সহীহ )

উপরোক্ত হাদীসসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মহিলারা জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে পড়বে। কোনো অবস্থাতেই ফাঁকা বা খোলা-মেলাভাবে নামায পড়বে না। তাই তারা রুকুতেও উভয় হাত পাজরের সাথে মিলিয়ে হাঁটুর উপর রাখবে। আর এই জন্য যতটুকু ঝুঁকতে হয়, রুকুতে ততটুকুই ঝুঁকবে। এর অতিরিক্ত ঝুঁকবে না। হাতের আঙ্গুলগুলো এবং উভয় পায়ের গোড়ালি মিলিয়ে রাখবে।

সিজদার মধ্যে চারটি পার্থক্য
প্রথম পার্থক্য-
পুরুষ শুধুমাত্র হাতের তালু যমিনে রেখে হাতের বাকী অংশ যমিন থেকে পৃথক রাখবে। কিন্তু মহিলা পুরো হাত যমিনে বিছিয়ে দিবে।

১ম দলিল-
হযরত বারা রা. থেকে বর্ণিত-
عن البراء قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- ্র إذا سجدت فضع كفيك وارفع مرفقيك
রাসূল স. ইরশাদ করেন, যখন তুমি সিজদা করবে উভয় হাতের তালু যমিনে রাখবে। আর কনুই যমিন থেকে পৃথক রাখবে। (মুসলিম শরিফ : ১/১৯৪)

২য় দলিল-
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত-
عن أنس أن النبى صلى الله عليه وسلم قال اعتدلوا فى السجود ولا يفترش أحدكم ذراعيه افتراش الكلب

রাসূল স. ইরশাদ করেন, তোমরা ঠিকমতো সিজদা করো এবং তোমাদের কেউ হাতকে যমিনের উপর কুকুরের মতো বিছিয়ে দিয়ো না। (মুসলিম : ১/১৯৩)

৩য় দলিল-
ইয়াযিদ বিন আবি হাবীব রা. সূত্রে বর্ণিত-
عن يزيد بن أبي حبيب أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – مر على امرأتين تصليان فقال اذا سجدتما فضما بعض اللحم الى الأرض فإن المرأة ليست في ذلك كالرجل
একবার রাসূল সা. নামাযরত দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; তখন বললেন, যখন সেজদা করবে তখন শরীর যমিনের সাথে মিলিয়ে রাখবে। কেননা মহিলারা এক্ষেত্রে পুরুষের মতো নয়। (কিতাবুল মারাসিল : পৃ.৮ হা.৮০)
হাদিসটি সকল ইমামের উসূল অনুুুুযায়ী দলিল যোগ্য। (আওনুল বারী : ১/৫২০)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমীর ইয়ামানী সুবুলুস সালাম শরহু বুলুগিল মারাম (খ.১ পৃ.৩৫৬) গ্রন্থে উক্ত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন এবং তা দ্বারা মহিলা পুরুষের নামাযের সিজদার মধ্যে পার্থক্য প্রমাণ করেছেন।
উল্লেখ্য, আওনুল বারী ও সুবুলুস সালামের লিখক আহলে হাদিসদের শীর্ষস্থানীয় আলেম। উল্লিখিত দুটি গ্রন্থকে নিজেদের গ্রন্থ বলে মনে করেন।
উপরোক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, মহিলাগণ উভয় হাত যমিনের উপর বিছিয়ে দিবে। আর পুরুষগণ শুধুমাত্র হাতের তালু যমিনে রেখে বাকী অংশ যমিন থেকে পৃথক রাখবে।

দ্বিতীয় পার্থক্য-
পুরুষগণ পেট উরু থেকে পৃথক রাখবে। তবে মহিলারা পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে।

১ম দলিল-
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাতে আছে-
عن مجاهد ؛ أنه كان يكره أن يضع الرجل بطنه على فخذيه إذا سجد كما تصنع المرأة. (اسناده حسن،وليث بن ابي سليم وان كان فيه ضعف يسير من قبل حفظه لكن روي عنه شعبة والثوري واحتج به مسلم.
হযরত মুজাহিদ র. পুরুষদের জন্য সিজদার মধ্যে মহিলাদের মতো পেটকে উরুর সাথে মিলিয়ে রাখা মাকরুহ মনে করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৫,হাদীসটি হাসান)

২য় দলিল-
হযরত ইবরাহিম নাখয়ী র. বলেন-
كانت تؤمر المرأة أن تضع ذراعها وبطنها على فخذيها إذا سجدت ولا تتجافى كما يتجافى الرجل لكي لا ترفع عجيزته
মহিলাদেরকে আদেশ করা হতো, তারা যেন সিজদা অবস্থায় হাত ও পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। পুরুষের মতো অঙ্গ-প্রতঙ্গ ছড়িয়ে না রাখে। যাতে কোমর উঁচু হয়ে না থাকে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ১/১৩৭, হাদিসটির সনদ সহীহ।)

৩য় দলিল-
হযরত ইবরাহিম নাখয়ী র. বলেন-
إذا سجدت المرأة فلتضم فخذيها ، ولتضع بطنها عليهما
মহিলারা যখন সিজদা করবে, তখন উভয় উরু মিলিয়ে তার উপর পেট রাখবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৫)

৪র্থ দলিল-
হযরত আলী রা. বলেন-
عن علي قال إذا سجدت المرأة فلتحتفز ولتلصق فخذيها ببطنها. (اسناده جيد والصواب في الحارث التوثيق)
মহিলারা যখন সিজদা করবে, অঙ্গ-প্রতঙ্গ মিলিয়ে রাখবে। উভয় উরু পেটের সাথে মিলিয়ে রাখবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক :৩/৫০, হাদিসটি সহিহ)

৫ম দলিল-
হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত-
عن عبد الله بن عمر قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- :্র إذا جلست المرأة فى الصلاة وضعت فخذها على فخذها الأخرى ، وإذا سجدت ألصقت بطنها فى فخذيها كأستر ما يكون له. (اسناده حسن: إعلاء السنن: ص৭৭৮)
রাসূল স. বলেছেন, মহিলারা নামাযের মধ্যে উরুর উপর উরু রেখে বসবে। আর সিজদা অবস্থায় পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে। যা তাদের সতরের জন্য অধিক উপযোগী। (সুনানে কুবরা, বাইহাকী : ২/২২৩, হাদিসটি হাসান।)

উপরোক্ত হাদীসসমূহ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মহিলা পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে। তবে পুরুষ পৃথক রাখবে।
বিশেষ করে দ্বিতীয় হাদিসে ইবরাহিম নাখয়ীর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহিলাদের নামায আদায়ের পদ্ধতি ভিন্ন এবং সে যুগে ওই পদ্ধতি অনুযায়ীই তাদেরকে নামায শিক্ষা দেওয়া হতো। আর كانت শব্দ দ্বারা এ কথাও বোঝা যাচ্ছে যে, এই ধারা পূর্ব থেকে চলে এসেছে। অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই এই তালিমের ব্যাপক প্রচলন ছিলো এবং স্বভাবত সে অনুযায়ী মহিলা ও পুরুষ সাহাবীগণ নামায আদায় করতেন।

তৃতীয় পার্থক্য-
পুরুষ বাহু পাজর থেকে পৃথক রাখবে, পক্ষান্তরে নারীরা বাহু পাজরের সাথে মিলিয়ে রাখবে।

১ম দলিল-
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত-
عن عبد الله بن مالك ابن بحينة أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- كان إذا صلى فرج بين يديه حتى يبدو بياض إبطيه
রাসূল স. যখন নামায পড়তেন (সিজদার মধ্যে) উভয় হাত এতটুকু ফাঁকা রাখতেন যে, তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেতো। (মুসলিম শরিফ:১/১৯৪)

২য় দলিল-
হযরত মাইমুনা রা. থেকে বর্ণিত-
عن ميمونة قالت: كان النبي (ص) اذا سجد لو شائت بهمة ان تمر بين يديه لمرت.
তিনি বলেন রাসূল স. এভাবে সিজদা করতেন যে, যদি ছাগলের বাচ্চা নিচ দিয়ে যেতে চায় তাহলে যেতে পারত। (মুসলিম শরিফ:১/১৯৪)

৩য় দলিল-
হযরত হাসান বসরী র. বলেন-
المرأة تضطم في السجود. (اسناده صحيح ورجاله ثقات)
মহিলারা সিজদার মধ্যে জড়সড় হয়ে এক অঙ্গ অপর অঙ্গের সাথে মিলিয়ে রাখবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৫,হাদীসটি সহীহ)

৪র্থ দলিল-
হযরত বুকাইর বিন আব্দুল্লাহ বিন আশাজ সূত্রে বর্ণিত-
عن بكير بن عبد الله بن الأشج ، عن ابن عباس ؛ أنه سئل عن صلاة المرأة ؟ فقال : تجتمع وتحتفز. (اسناده صحيح ورجاله ثقات)
ইবনে আব্বাস রা.কে মহিলাদের নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, মহিলারা জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামায পড়বে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৫ হাদীসটি সহীহ )

চতুর্থ পার্থক্য-
পুরুষ পায়ের পাতা দাঁড় করে উঁচু হয়ে সিজদা করবে। পক্ষান্তরে মহিলারা উভয় পা ডান দিক দিয়ে বের করে মাটিতে বিছিয়ে নিচু হয়ে সিজদা দিবে।

১ম দলিল-
হযরত মা’মার সূত্রে বর্ণিত-
عن معمر عن الحسن وقتادة قالا إذا سجدت المرأة فإنها تنضم ما استطاعت ولا تتجافى لكي لا ترفع عجيزتها.(اسناده صحيح ورجاله ثقات)
হযরত হাসান বসরী ও কাতাদাহ র. বলেন, মহিলা যখন সিজদা করবে, তখন সে যথা সম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফাঁকা রেখে সিজদা করবেনা। যাতে কোমর উচুঁ হয়ে না থাকে। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক:৩/৪৯,হাদীসটি সহীহ)

২য় দলিল-
আবু ইসহাক র. বলেন-
وصف لنا البراء بن عازب فوضع يديه واعتمد على ركبتيه ورفع عجيزته وقال هكذا كان رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يسجد. (في اسناده مقال: هامش عون المعبود)

আমাদেরকে বারা ইবনে আযেব রা, রাসূল স.-এর নামাযের বর্ণনা দিতে গিয়ে উভয় হাত যমিনের উপর রাখলেন এবং উভয় হাঁটুর উপর ভর দিয়ে কোমর উঁচু করলেন। অতপর বললেন, রাসূল স. এভাবেই সিজদা করতেন। (আবু দাউদ:১/১৩০)

৩য় দলিল-
আবুল বুখতারী রা. থেকে বর্ণিত-
عَنْ أَبِي الْبَخْتَرِيِّ، قَالَ: ্রإِذَا سَجَدْتَ فَانْصِبْ قَدَمَيْكَগ্ধ (مصنف ابن ابي شيبة: ২/৪৮৪)
যখন তুমি সিজদা করবে তখন উভয় পা কে বিছিয়ে রাখো। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক:২/৪৮৪)

বসার ক্ষেত্রে চারটি পার্থক্য
১. পুরুষ বাম পা বিছিয়ে দিবে আর ডান পা দাঁড় করে রাখবে। পক্ষান্তরে মহিলা উভয় পা ডান দিকে বের করে দিবে।
২. পুরুষ উভয় উরু স্বাভাবিক রাখবে কিন্তু মহিলারা উভয় উরু মিলিয়ে রাখবে।
৩. পুরুষ বাম পায়ের উপর বসবে আর মহিলা নিতম্বের উপর বসবে।
৪. পুরুষ উরুর উপর হাত রেখে আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিক রাখবে, পক্ষান্তরে মহিলা মিলিয়ে রাখবে।

১ম দলিল-
হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত-
عن عبد الله بن عمر قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- :্র إذا جلست المرأة فى الصلاة وضعت فخذها على فخذها الأخرى ، وإذا سجدت ألصقت بطنها فى فخذيها كأستر ما يكون لها. (اسناده حسن: إعلاء السنن: ص৭৭৮)
রাসূল স. ইরশাদ করেন, মহিলারা যখন বসবে তখন এক উরু অপর উরুর উপর রাখবে। আর সিজদার সময় পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে। যা তাদের সতরের জন্য অধিক উপযোগী। (সুনানে কুবরা,বাইহাকী:২/২২৩.হাদীসটি হাসান)

২য় দলিল-
খালেদ ইবনে লাজলাজ র. বলেন-
كن النساء يؤمرن أن يتربعن إذا جلسن في الصلاة ، ولا يجلسن جلوس الرجال على أوراكهن ، يتقي ذلك على المرأة ، مخافة أن يكون منها الشيء.فهذه اقوال الصحابة والتابعين صلاة المرأة مما لا مجال فيه للراي والاجتهاد فهي في حكم المرفوع.

মহিলাদেরকে আদেশ করা হতো, যেন নামাযে দুই পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের উপর বসে। তারা যেন পুরুষদের মত না বসে। সতরের কোনো কিছু প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মহিলাদেরকে এমনটি করতে হয়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ২/৫০৬,হাদীসটি মারফুর হুকুমে)

৩য় দলিল-
ই’লাউস সুনান গ্রন্থে আছে-
عن ابن عمر انه سئل كيف كان النساء يصلين علي عهد رسول الله صلي الله عليه وسلم ؟ قال: كن يتربعن ثم امرن أن يحتفزن …..الخ.(اسناده صحيح: إعلاء السنن: ৩/২৭)
হযরত ইবনে উমর রা. কে জিজ্ঞেস করা হল যে, রাসূলের যুগে মহিলারা কীভাবে নামায পড়তেন ? তিনি বললেন, তারা চারজানু হয়ে বসতেন। অতপর জড়সড় হয়ে বসতে আদেশ দেওয়া হয়। (ই‘লাউস সূনান:৩/২৭,হাদীসটি সহীহ)

৪র্থ দলিল-
হযরত মালেক র. থেকে বর্ণিত-
عن مالك تضع فخذها اليمنى على اليسرى وتنضم قدر طاقتها ولا تفرج في ركوع ولا سجود ولا جلوس بخلاف الرجل
মহিলারা সাধ্যানুযায়ী জড়সড় হয়ে থাকবে। রুকু, সিজদা ও বসা কোনো অবস্থাতেই পুরুষের ন্যায় খোলা-মেলাভাবে বসবে না। (আয যখিরা:২/১৯৩)

৫ম দলিল-
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত-
عن عائشة قالت كان رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يستفتح الصلاة بالتكبير والقراءة ………وكان يفرش رجله اليسرى وينصب رجله اليمنى وكان ينهى عن عقبة الشيطان وينهى أن يفترش الرجل ذراعيه افتراش السبع وكان يختم الصلاة بالتسليم
তিনি বলেন, রাসূল স. তাকবীর বলে নামায শুরু করতেন এবং বাম পা বিছিয়ে দিতেন। আর ডান পা দাঁড় করে রাখতেন। (মুসলিম শরীফ:১/১৯৫)

উপরোল্লিখিত দীর্ঘ আলোচনায় মহিলা পুরুষের নামাযের যে পার্থক্য রয়েছে তা রাসূলের হাদীস, আসারে সাহাবা, তাবেয়ীদের ভাষ্য দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল। তা ছাড়া খাইরুল কুরুন (সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগ) থেকে চলে আসা আমল এর জলন্ত প্রমাণ। চার মাযহাবের ইমামগণও এ ব্যাপারে একমত।

গাইরে মুকাল্লিদ ও জাকির নায়েকের বক্তব্য
আশ্চর্য বিষয় হলো বর্তমানে যারা নিজেদের আহলে হাদীস বলে দাবী করেন, তারা এতগুলো সহীহ ও হাসান হাদীস এবং তা‘আমূল কে বাদ দিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে, মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক। উভয়ের নামাযের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আর বর্তমানে ডা. জাকির নায়েকও সহীহ ও হাসান হাদীস এবং খাইরুল কুরুন থেকে চলে আসা তা‘আমুলের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে লা-মাযহাবীদের মত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

নেতৃস্থানীয় গাইরে মুকাল্লিদ আলেমদের ফাতওয়া
নেতৃত্বস্থানীয় গাইরে মুকাল্লিদ আলেমগণও স্বীকার করেন যে, মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক নয়। সে আলোকে ফাতওয়াও প্রদান করেছেন।
মাওলানা মুহাম্মদ দাউদ গযনবী র. এর পিতা আল্লামা জব্বার গযনবী র. কে প্রশ্ন করা হলো, মহিলাদের নামাযে জড়সড় হয়ে থাকা কি উচিত ?
জবাবে তিনি পার্থক্য সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করে লিখেন, ‘এর উপরই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চার মাযহাব ও অন্যান্যদের মাঝে আমল চলে আসছে।’ এরপর তিনি চার মাযহাবের কিতাবের উদ্ধৃতি প্রদান করার পর লিখেন, ‘মোটকথা মহিলাদের জড়সড় হয়ে নামায পড়ার বিষয়টি হাদীস, চার মাযহাবের ইমামগণ ও অন্যান্যের সর্বসম্মত আমলের আলোকে প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী হাদীসের কিতাবসমূহ ও উম্মতের সর্বসম্মত আমল সম্পর্কে অজ্ঞ।(ফাতাওয়া গযনবিয়া ২৭-২৮; ফাতাওয়ায়ে উলামায়ে আহলে হাদীস ৩/১৪৮-১৪৯; মাজমুআয়ে রাসায়েল মাওলানা আমীন সফদর ১/৩১০-৩১১)
সিহাহ্ সিত্তার অনুবাদক বিশিষ্ট গায়রে মুকাল্লিদ মাও. ওয়াহীদুজ্জামান হায়দারাবাদী বলেন-
“الا ان المرأة ترفع يديها عند التحريم الي ثدييها ولاتخوي في السجود كالرجل بل تنخفض وتلصض وتضم بطنها بفخذيها” (نزل الابرار من فقه النبي المختار: ১/৮৫)
কিন্তু মহিলা তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাত বুক বরাবর উঠাবে এবং পুরুষের মত পেট কে যমিন থেকে উঁচু রাখবে না; বরং নিচু করে পেটকে উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে।
ক্স ইতোপূর্বে এ সম্পর্কে আহলে হাদীসদের সবচেয়ে বড় আলেম নবান সিদ্দীক হাসান খান (মৃত্যু ১৩০৭) রচিত ‘আওনুল বারী’-এর উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে যে, তিনি পার্থক্যের একটি হাদীস সম্পর্কে বলেছেন, ‘হাদীসটি সকল ইমামের উসূল অনুযায়ী দলিল হিসেবে পেশ করার যোগ্য।
ক্স তদ্রƒপ মুহাদ্দিস আমীর ইয়ামানীর ‘সুবুলুস সালামের’ উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি পার্থক্য সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করে তা দ্বারা মহিলা-পুরুষের নামাযের পার্থক্য প্রমাণ করেছেন। (সুবুলুস সালাস : ১/৩৫৬)
গায়রে মুকাল্লিদ ও সালাফি ভাইদের দেখা যায়, তারা তাঁকে নিজেদের লোক মনে করে এবং এই কিতাবকে নিজেদেরই কিতাব মনে করে থাকেন।
ক্স মাওলানা আলী মুহাম্মদ সাঈদ ‘ফাতওয়ায়ে উলামায়ে আহলে হাদীস’-গ্রন্থে এই পার্থক্যের কথা স্বীকার করেছেন। (মাজমুয়ায়ে রাসায়েল : ১/৩০৫)

গায়রে মুকাল্লিদ, জাকির নায়েক ও আলবানীর দাবী
আশ্চর্যের বিষয় হলো, উপরোক্ত দলিলসমূহ এবং নববী যুগ থেকে পর্যায়ক্রমে চলে আসা উম্মাহর সর্বসম্মত আমলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আলবানী সাহেব তার ‘সিফাতুস সালাতে’ ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে, পুরুষ ও মহিলার নামাযের পদ্ধতিগত পার্থক্যের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদিস নেই। অথচ এটিও একটি দাবি। আর তা প্রমাণ করার জন্য উপরোক্ত দলিলগুলো বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য ছিলো। কিন্তু তিনি তা না করে শুধু পার্থক্য সম্বলিত একটি হাদীসকে এ কথা বলে যঈফ আখ্যা দিলেন যে, হাদীসটি মুরসাল। এছাড়া তিনি দলিল সম্পর্কে অন্য কোনো আলোচনাই করেননি। অথচ এ সম্পর্কে অনেকগুলো সহীহ ও হাসান হাদীস পেশ করা হয়েছে। তবে তিনি যে হাদীসটি মুরসাল বলেছেন তা মুরসাল হলেও দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। যেমন, গায়রে মুকাল্লিদের বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস আওনুল বারী ১/৫২০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, এই মুরসাল হাদিসটি সকল ইমামের উসূল ও মূলনীতি অনুযায়ী দলিল হওয়ার যোগ্য।

গায়রে মুকাল্লিদ ও জাকির নায়েকের দলিল ও তার পর্যালোচনা

প্রথম দলিল-
মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক হওয়ার উপর তারা দলিল হিসাবে ইমাম বুখারী র.এর রিজাল বিষয়ক গ্রন্থ ‘তারীখে সগীর’ থেকে নিম্নোক্ত বর্ণনাটি পেশ করেছেন।
عن ام الدرداء انها كانت تجلس في الصلاة جلسة الرجل.
হযরত উম্মে দারদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নামাযে পুরুষের ন্যায় বসতেন।

পর্যালোচনা-
প্রথমত: আশ্চর্য বোধ করছি এ জন্য যে, তারা যে হাদীসটি দলিল হিসাবে পেশ করলেন, তা দ্বারা নামাযে পুরুষ-মহিলার বসার পদ্ধতি ভিন্ন হওয়াই প্রমাণিত হয়। যদি উভয়ের বসার পদ্ধতি এক হতো তাহলে جلسة الرجل. ‘পুরুষের মত বসা’ কথাটি নিরর্থক হয়ে যায়। তার এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, সে যুগে পুরুষ-মহিলার বসার পদ্ধতি এক ছিল না। তথাপিও উম্মে দারদা মহিলা হওয়া সত্বেও পুরুষদের মত বসতেন। এটা একটি ব্যতিক্রম ঘটনা হওয়ায় ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

দ্বিতীয়ত: কেউ কেউ উম্মে দারদাকে সাহাবীয়া বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু বিশুদ্ধ মতানুযায়ী উম্মে দারদা দ্বারা হযরত খুজায়মাহ র.-ই উদ্দেশ্য (৮০ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়) এবং তিনি তাবেয়ী ছিলেন। সাহাবী ছিলেন না। কারণ, উম্মে দারদার কর্মকে যিনি বর্ণনা করেছেন তিনি হলেন হযরত মাকহুল র.। আর তিনি উম্মে দারদা নামে কোনো সাহাবীয়াকে পাননি; বরং তাবেয়ীয়া উম্মে দারদাকে পেয়েছেন। (ফাতহুল বারী:২/৩৯৫)
আর যদি নামাযের পদ্ধতি প্রমাণের ক্ষেত্রে একজন তাবেয়ী মহিলার আমল দলিল হয়ে থাকে, তাহলে ইতোপূর্বে বিখ্যাত একাধিক তাবেয়ী ইমানগণের বক্তব্য ও কর্ম বিস্তারিত পেশ করে একথা প্রমাণ করা হয়েছে যে, তাবেয়ী ইমামগণের তালীম ও শিক্ষানুযায়ী রুকু, সিজদা ও বৈঠকসহ বহু ক্ষেত্রে মহিলাদের নামাযের পদ্ধতি পুরুষ থেকে ভিন্ন ছিলো। এ ক্ষেত্রে শুধু একজন তাবেয়ী মহিলার ব্যক্তিগত আমলকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিষয়টি যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বিশেষ করে যখন ঠিক এই বর্ণনার মধ্যেই এ কথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে ওই মহিলা অন্য সাহাবী ও তাবেয়ী মহিলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

দ্বিতীয় দলিল ও পর্যালোচনা:
“পুরুষ-মহিলার অভিন্ন নামায পদ্ধতি” বিষয়ক রায়ের সমর্থন পেশ করতে গিয়ে দ্বিতীয় যে কাজটি আলবাণী সাহেব করেছেন তা হল, ইবরাহীম নাখয়ী র.-এর নামে একটি কথা প্রচার করেছেন যে, তিনি বলেছেন, تفعل المرأة في الصلوة كما يفعل الرجل. ‘মহিলা পুরুষের মতই নামায আদায় করবে’। ‘মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা’-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন। অথচ এ গ্রন্থে কোথাও এই কথাটি নেই। আল্লাহ ভাল জানেন এই ভুল উদ্ধৃতি তিনি কিভাবে লিখে দিলেন ?
অথচ ইতোপূর্বে একাধিক সহীহ সনদের উদ্ধৃতিসহ ইবরাহীম নাখয়ী র.-এর বিভিন্ন বক্তব্য পেশ করা হয়েছে। যেগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার নামাযের পার্থক্যের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তৃতীয় দলিল-
রাসূল স. ইরশাদ করেন- ’’ صلوا كما رأتموني أصلي‘‘
‘তোমরা এভাবে নামায পড় যেমন আমাকে নামায পড়তে দেখছ’। (বুখারী শরীফ)

পর্যালোচনা-
প্রথমত: তারা হাদীসের প্রেক্ষাপট না বুঝেই এই হাদীস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যে, এখানে পুরুষ-মহিলা কাউকে নির্দিষ্ট করেননি।
অথচ রাসূল স. এ হুকুমটি মালেক ইবনে হুয়াইরিস রা.কে দিয়েছিলেন। যখন তিনি রাসূল স.-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ বিশ দিন কাটিয়ে স্বীয় গোত্রের নিকট ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন বিস্তারিত হুকুম বলার সময় ছিলো না। তাই রাসূল স. মূলনীতি স্বরূপ এমন হুকুম দিয়ে ছিলেন। আর সে কাফেলার সকলই ছিলেন পুরুষ। সুতরাং বুঝা গেলো যে, হুকুমটি শুধু পুরুষের জন্য।

দ্বিতীয়ত: যদি মেনে নেয়া হয় যে, এই হাদীসে কাউকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। তার পরও তাদের দাবী প্রমাণিত হয়না। কেননা, যদিও এহাদীসে কাউকে নির্দিষ্ট করা হয়নি কিন্তু উপরোল্লিখিত হাদীস সম্ভার এই পার্থক্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক নয়; বরং উভয়ের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য আছে।

উপসংহার
উপরোক্ত দীর্ঘ আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, মহিলা-পুরুষের গঠনমূলক যেমন পার্থক্য রয়েছ্ েতেমনি ইবাদতের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। যা দলিল দ্বারা সর্বসম্মতক্রমে প্রমাণিত। তবে পার্থক্য সম্বলিত ইবাদত নামাযের ক্ষেত্রে বর্তমান আহলে হাদীস ও ডা.জাকির নায়েক দাবী করেন যে, নামাযের মাঝে উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ তারা এ ব্যাপারে কোনো দলিল পেশ করতে পারেননি। আর বলে বেড়াচ্ছেন যে, এ সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদীস নেই। অথচ উক্ত আলোচনায় পার্থক্য সম্বলিত অসংখ্য হাদীস থেকে প্রায় অর্ধ শত হাদীস ও তায়ামূল পেশ কারা হয়েছে। যা সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, উভয়ের মাঝে নামাযের পদ্ধতিগত পার্থক্য আছে।
বর্তমান আহলে হাদীস ও জাকির নায়েক দু‘একটি হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে মহিলা-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি এক বলে মুসলিম উম্মাহকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।
অথচ আহলে হাদীসের নেতৃস্থানীয় আলেমগণ মহিলা-পুরুষের নামাযের পার্থক্যের কথা স্বীকার করেছেন। তদানুযায়ী ফাতওয়াও দিয়েছেন এবং বলেছেন, এর অস্বীকারকারী হাদীসের কিতাবসমূহ ও উম্মতের সর্বসম্মত আমল সম্পর্কে বে-খবর ও অজ্ঞ।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে এ বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন এবং কুরআন-হাদীসের সহীহ বুঝ দান করে তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

اللهم ارنا الحق حقا وارزقنا اتباعه، وارنا الباطل باطلا وارزقنا اجتنابه.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *