সুলতান মাহমুদ গজনবী সোমনাথ অভিযানের কারণ- কাজী হামদুল্লাহ

Shortlink:

সুলতান মাহমুদ গজনবী
সোমনাথ অভিযানের কারণ

লিখেছেন: কাজী হামদুল্লাহ

সুলতান মাহমুদ গজনবীর বিষয়ে একটি মারাত্মক অপবাদ ইতিহাসের প্রথম থেকেই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ অনৈতিক ও ভিত্তিহীন সেই ইতিহাস ভারতের হিন্দুরা খুব উৎসাহের সাথে পঠন-পাঠন ও আত্মস্থ করে থাকে। দুঃখের বিষয় হল, ভারতের মুসলমানদেরও কেউ কেউ সেই বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে অবাক হই যখন দেখি বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের জাতীয় দৈনিকেও এ জাতীয় কথা বলা হয়। গত কয়েকদিন আগে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদকীয় পাতায় তাঁকে বলা হয়েছিল যে, তিনি লুটেরা। সোমনাথ থেকে তিনি ২০০ মণ সোনা লুটপাট করেছিলেন।

কী জঘণ্য মিথ্যাচার! কত বিকৃত ইতিহাস! অথচ সোমনাথ অভিযানের কারণগুলো খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, নিজেদের কৃত অপকর্মসমূহ ঢাকার জন্য সুলতানের উপরে এসব অপবাদ চাপানো হয়েছে।

সুলতান সোমনাথ অভিযানের বিশেষ চারটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে…

#এক. তৎকালীন হিন্দু পুরোহিতরা সোমনাথ মন্দিরে ওদের দেবতা মূর্তির সামনে প্রায়ই নারীদের বলিদান করত। একবার একজন মুসলিম মেয়েকে বলি দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে ধর্ষণ করে। এরপর দেবতার নামে তাকে হত্যা করে। সেই সময় বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিম সুলতান হিসেবে মাহমুদ গজনবীর দিলে আঘাত করে এ ঘটনাটা। একজন অবলা মেয়ের উপর এমন নিষ্ঠুর আচরণে ক্ষুব্ধ হবার অধিকার অবশ্যই আছে মাহমুদ গজনবীর। তাই তিনি দফায় দফায় সোমনাথ হামলা করে তা পদানত করার চেষ্টা করেন।

এখান থেকে বোঝা যায় যে, সোমনাথের পুরোহিতরা ছিল নারীলোভী ও লম্পট। নারীদের ইজ্জত-আব্রু ও জীবন নিয়ে ওরা ছিনিমিনি খেলত। নারীদের ধর্ষণ করত। এসব ধর্ষককে বাঁচাতেই ইতিহাস বিকৃত করে সুলতানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আর ওদিকে পার পেয়ে যায় সমাজের সর্বনিকৃষ্ট অপরাধীরা।
সুতরাং যারা সুলতানের নামে অপবাদ রটাবে, বুঝতে হবে এরা কোন না কোন ধর্ষক বা অপরাধীকে বাঁচাতেই এমন অপকর্মে লিপ্ত।

#দুই. তৎকালীন সোমনাথ মন্দির নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত ছিল। এর একটি হল, সোমনাথের মূর্তি-দেবতাটি স্বীয় অলৌকিক শক্তিতে শূণ্যে ভাসমান, এটা তার দেবতা হবার বিশেষ নমুনা। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ এর বিপরিত। সোমনাথ বিজয়ের পরে সুলতান মাহমুদ গজনবী স্বীয় প্রকৌশলীদের দ্বারা মূর্তি ও তার আশপাশের পরীক্ষা করে দেখেন যে, শুধু লেবেলটাই আসল। বাকি সব মিথ্যে। কেননা প্রকৌশলীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, সোমনাথের মূর্তি ভাসমান বা ঝুলন্ত কিছুই নয়। বরং মূর্তি নিয়ে একটা চরম ধোঁকাবাজি। এই মূর্তি ঝুলে থাকার কারণ, চারদিকের দেয়ালে লাগানো চুম্বকের চতুর্মুখী আকর্ষণ। যেই আকর্ষণে মূর্তিটি মাঝখানে ঝুলে থাকত। আর এটাকেই সাধারণ হিন্দুরা অলোকিক শক্তি মনে করে দেবতার শ্রদ্ধায় নত হত। হিন্দুদের এই অন্ধবিশ্বাস নস্যাৎ করার জন্যও সুলতান মাহমুদ গজনবী বারবার সোমনাথ আক্রমণ করেন।

এ কথা প্রমাণ করে যে, সোমনাথের পুরোহিতরা ছিল চরম ধোঁকাবাজ। জাতির সাথে গাদ্দারি করে হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগের সাথে ওরা প্রতারণা করেছে। সুলতান যখন সোমনাথ বিজয়ের পরে তাদের প্রতারণার মুখোশ খুলে দিয়েছেন, তখন ইজ্জতের লুঙ্গি বাঁচাতে সুলতানের অভিযানকেই তারা ভিন্ন খাতে প্রবহিত করার চেষ্টা করে।

#তিন. সোমনাথ এমন একটি মন্দির ছিল, যেখানে বসে হিন্দু রাজারা উপাসনার পরিবর্তে রাজনৈতিক কূটকৌশলের শলা-পরামর্শ করত। নিজ দেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশের উপরে জুলুম-নিপীড়নের নীলনকশা তৈরি করত। বিশেষ করে ইসলামবিদ্বেষী যত ষড়যন্ত্র সব এখান থেকেই পরিচালিত হত। এ জন্য সুলতান মাহমুদ গজনবী বারবার তাদের এসব গোপন দূর্গে আঘাত করতেন। কেননা ইবাদতগাহকে এরা কলুষিত করে ফেলেছে। সেখানে নোংরা রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। এসব বিভ্রান্তির নিরসন করা সুলতানের জন্য আবশ্যক ছিল।

#চার. সোমনাথ মন্দিরকে ঘিরে হিন্দুদের কনফিডেন্স ছিল আকাশচুম্বী। তারা মনে করত পৃথিবীর কোন শক্তিই সোমনাথ অভিযানে সফল হবে না। তাদের পাথুরে দেবতা হামলাকারীদের পরাজিত করবে। এসব মূক ও অচল দেবতাদের উপরে কেউই সোমনাথে বিজয়ী হতে পারবে না। এই ভিত্তিহীন আত্মবিশ্বাস থেকেই তারা প্রতিনিয়ত সুলতানকে চ্যালেঞ্জ করত। তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অমূলক আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়ার জন্যই সুলতান বারবার সোমনাথ অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছেন।

এখন রইল সোমনাথ থেকে গজনীতে সুলতান কর্তৃক ২০০ মণ সোনা নিয়ে যাবার কথা। যারা এ বিষয়টি দেখিয়ে সুলতানকে লুটেরা বলে, বুঝতে হবে যুদ্ধনীতি সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা একেবারে গভীরে পৌঁছেছে। কেননা প্রতিটি যুদ্ধের পরে বিজয়ী দল মালে গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অধিকারী হয়। এটা সকল যুদ্ধের সাধারণ নিয়ম।

সুতরাং সুলতানের নামে লুটপাটের অপবাদ একটি ঘৃণ্য অপপ্রচার। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র। আমি তো এখানে সোমনাথ অভিযানের মাত্র চারটি কারণ উল্লেখ করলাম। এছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে। অনুসন্ধানীনের জন্য জানার রাস্তা অনেক প্রশস্ত। আসুন সঠিক ইতিহাস জানি এবং অপপ্রচারকে নর্দমায় নিক্ষেপ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *