নামাযে হাত কীভাবে ও কোথায় বাঁধবে

Shortlink:

প্রথম অধ্যায়

নামাযে হাত বাঁধার ব্যাপারে দু‘টি বিষয় বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন।
এক. হাত বাঁধার পদ্ধতি।
দুই. হাত বাঁধার স্থান।

নামাযে হাত বাঁধার পদ্ধতি
প্রথম পদ্ধতি: সুন্নাত হাত বাঁধার সুন্নাত পদ্ধতি হচ্ছে, ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠের উপর রাখা এবং কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা কব্জিকে আকঁড়ে ধরা। অন্য তিন আঙ্গুল বাম হাতের উপর বিছিয়ে রাখা। নিয়মটি রাসূল স.-এর বিভিন্ন হাদীস, সাহাবা ও তাবেয়ীনের আমলী শিক্ষা দ্বারা প্রমাণিত।
যেমন-
প্রথম হাদীস-
আবু দাউদ শরীফে হযরত আসেম ইবনে কুলাইব রা. রাসূল স.-এর নামাযের পদ্ধতির বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন-

عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ، بِإِسْنَادِهِ وَمَعْنَاهُ، قَالَ فِيهِ: ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى ظَهْرِ كَفِّهِ الْيُسْرَى وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ،
“অতঃপর রাসূল স. ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি এবং বাহুর উপর রাখলেন” (আবু দাউদ. ১/১০৫, নাসাঈ. ৮৮৯, মুসান্নাফে আহমদ : ৪/৩১৮, সহীহ ইবনে খুযায়মা: ৪৮০)

আবু দাউদ শরীফের অন্য বর্ণনায় রয়েছে-
قال : فحدثني وائل بن علقمة عن أبى وائل بن حجر قال : صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فكان إذا كبر رفع يديه ، قال : ثم التحف ، ثم أخذ شماله بيمينه (৭২৩)
“হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন, আমি রাসূল স.-এর সাথে নামায পড়েছি। রাসূল স. যখন তাকবীর দিতেন, উভয় হাত উঠাতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর রাসূল স. আচ্ছাদিত হলেন। তারপর ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরলেন”। (হাদীসটি সহীহ)

ইমাম ইবনে খুযাইমা র. উক্ত হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন-
باب وضع بطن الكف اليمني علي الكف اليسري.
অর্থাৎ ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখার অনুচ্ছেদ।

ইমাম দারমী র.ও সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন-
عَنْ عَبْدِ الْجَبَّارِ بْنِ وَائِلٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: ্রرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى قَرِيبًا مِنَ الرُّسْغِগ্ধ [تعليق المحقق] إسناده صحيح
অর্থাৎ ওয়াইল রা. বলেন, আমি রাসূল স. কে ডান হাত বাম হাতের কব্জির কাছা কাছি রাখতে দেখেছি। (সুনানে দারেমী: ১/২৮৩)

দ্বিতীয় হাদীস-
হযরত হুলব নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন-
عن قبيصة بن هلب عن أبيه قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه. .
অর্থাৎ “রাসূল স. আমাদের ইমামতি করতেন। তিনি (নামাযে) ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন” (তিরমিযী: হা: ২৫২, ইবনে মাজা: হা: ৮০৯, ইবনে আবী শাইবা ৩৯৫৫, দারাকুতনী:১/২৮৫)

তৃতীয় হাদীস-
হযরত শাদ্দাদ ইবনে শুরাহবীল র. বলেন-
عن شداد بن شرحبيل قال : ما نسيت فلم أنس أني رأيت رسول الله صلى الله عليه و سلم قائما يده اليمنى على يده اليسرى قابضا عليها يعني في الصلاة رواه البزار والطبراني في الكبير وفيه : عباس بن يونس ولم أجد من ترجمه.
অর্থাৎ আমি ভুলিনি এবং ভুলবো না যে, রাসূল স. কে দণ্ডায়মান তার ডান হাতটি বাম হাতের উপর চেপে ধরে রাখা অবস্থায় দেখলাম । হাদীসটি বাযযার ও তাবরানীতে উদ্ধৃত হয়েছে। (মাজমাউযযাওয়ায়েদ:২/২২৫)

চতুর্থ হাদীস-
হযরত আসিম ইবনে কুলাইব রা. বলেন-
عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ بِإِسْنَادِهِ وَمَعْنَاهُ قَالَ فِيهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى ظَهْرِ كَفِّهِ الْيُسْرَى وَالرُّسْغِ وَالسَّاعِدِ. .
অর্থাৎ রাসূল স. ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠে কব্জি এবং বাহুর উপর রাখতেন। (সুনানে আবু দাউদ:১/১০৫)

পঞ্চম হাদীস-
হযরত গাযওয়া ইবনে জারীর আল-দাব্বী র. নিজ পিতার সূত্রে হযরত আলী রা.-এর আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন-
حدثنا وكيع قال ثنا عبد السلام بن شداد أبو طالوت الجريري عن غزوان بن جرير الضبي عن أبيه قال كان علي إذا قام في الصلاة وضع يمينه على رسغه فلا يزال كذلك. ( مصنف ابن ابي شيبة:৩৪৫) وَوَضَعَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَفَّهُ عَلَى رُسْغِهِ الْأَيْسَرِ . (صحيح البخاري:১১৯৭)

হযরত আলী রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন, তখন তার ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখতেন। আর তিনি সবসময়-ই এমন করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: হা: ৩৯৬১, বুখারী: হা: নং ১১৯৮) (হাদীসটি সহীহ)

৬ষ্ঠ হাদীস-
হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন-
حدثنا عبد الله بن مسلمة عن مالك عن أبي حازم عن سهل بن سعد قال :كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة . (صحيح البخاري: ৭০৭)
অর্থাৎ লোকদের এ আদেশ দেওয়া হতো যে, তারা যেন নামাযে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখে। (সহীহ আল বুখারী:৭০৭)
এখানে ছয়টি হাদীস উদ্ধৃত হলো।
কিছু হাদীসে আরো বুঝা যায়-
ক. রাসূল স. ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন।
অপর কিছু হাদীসে বুঝা যায়-
খ. তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরতেন।
অধিকাংশ হাদীসই প্রমাণ করে –
গ. বাম হাতের কব্জি ডান হাত দিয়ে চেপে ধরতেন।

উল্লেখ্য- শুধু এক হাদীসে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা অন্য হাদীসগুলো পরিত্যাগ করা নবীর উম্মতের কাজ নয় এবং এটা নবীর শিক্ষাও নয়। বর্ণিত সমস্ত হাদীস সমন্বিতরূপে গ্রহণ ও আমল করাই সুন্নাত তরীকা। রাসূল স. ও সাহাবাদের শিক্ষা।
এবার লক্ষ্য করুন, উম্মতের চার মাযহাবের ফকীহগণ বিশেষভাবে হানাফী মাযহাবের আলেমগণ উপরোক্ত হাদীসগুলোর মধ্যে চমৎকারভাবে সমন্বয় করে সবগুলো অনুসারে আমল করেছেন। একেই বলে হাদীস অনুসরণ।

চার মাযহাবের ইমামদের হাদীসগুলোর সমন্বয়ে হাত বাঁধার তরীকা
১. হানাফী ইমামগণ সব হাদীসের সমন্বয় সাধন করে বলেন-

{السنة أن يجمع بين الوضع والقبض جمعا بين ما ورد في الاحاديث المذكورة ، إذ في بعضها ذكر الاخذ، وفي بعضها ذكر وضع اليد، وفي البعض وضع اليد علي الذراع فكيفية الجمع أن يضع الكف اليمني علي الكف اليسري ويحلق الابهام والخنصر علي الرسغ ويبسط الاصابع الثلاث علي الذراع فيصدق أنه وضع اليد علي اليد وعلي الذراع، وأنه اخذ شماله بيمينه.} (منيةالمصلي للحلبي)

অর্থাৎ উল্লেখিত হাদীসগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন কল্পে সুন্নত হলো: হাত রাখা ও হাত বাঁধা দু‘টির উপরই একসঙ্গে আমল করা।
কারণ কিছু হাদীসে-
ক. أخذ ‘আখযা’ অর্থাৎ কব্জি চেপে ধরার কথা এসেছে।
কিছু হাদীসে-
খ. وضع অর্থাৎ একহাত অপর হাতের উপর রাখার কথা এসেছে।
আর কিছু হাদীসে-
গ. বাহুর উপর হাত রাখার কথা এসেছে।
এগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের পদ্ধতি হলো-
ক. ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠের উপর রাখবে।
খ. বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা হালকা বানিয়ে হাতের কব্জি চেপে ধরবে।
গ. আর বাকি তিন আঙ্গুল বাহুর উপর বিছিয়ে দিবে। ফলে হাতের উপর হাত রাখা, বাহুর উপর হাত রাখা এবং ডান হাত দ্বারা বাম হাত চেপে ধরা, সবগুলো হাদীসের মর্মের উপর আমল হয়ে যাবে। (ইমাম হালাবী কর্তৃক প্রণীত মুনইয়াতুল মুসল্লী)

২. ইমাম মালেক র.-এর মাযহাব
ইমাম মালেক র.এর মাযহাবে ফরয নামাযে হাত বাঁধার বিধান নেই। হাত বাঁধার বিধান সুন্নাত ও নফলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এক্ষেত্রে কিভাবে বাঁধবে ? তার বিবরণে আল্লামা উব্বী আল মালেকী র. মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন-
و اختار شيوخنا أن يقبض بكف اليمني علي رسغ اليسري. و أختار بعضهم مع ذالك أن تكون السبابة و الوسطي ممتدين علي الذراع. ( شرح مسلم:২-২৮৬)
আমাদের শায়খগণ ডান হাত দ্বারা বাম হাতের কব্জি চেপে ধরা আসল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ একথাও যোগ করেছেন, শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলি যেন বাহুর উপর থাকে। (শরহে মুসলিম: ২/২৭৮)

৩. শাফেয়ী মাযহাবের বিবরণ সম্পর্কে ইমাম নববী র. “আর রাওজাহ” গ্রন্থে লিখেছে:
السنة وضع اليمني علي اليسري فيفيض بكفه اليمني كوع اليسري وقبض رسغها و ساعدها. (الروضة: ২-৩৩৯)
সুন্নাত হলো: ডান হাত বাম হাতের উপর এমন ভাবে রাখা যে, ডান হাতের তালু দ্বারা বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার হাড়, কব্জির কিছু অংশ এবং বাহুকে চেপে ধরা হয়। (আর রাওজাহ:২/৩৩৯)

৪. হাম্বলী মাযহাবের বিবরণ আলোচনা করতে গিয়ে ইবনে মানসুর আল হাম্বলী র. লিখেন-
ثم يقبض كوع يسراه بيمينه و يجعمها تحت سرته (وكذا في الانصاف للمرداوي و الفروع لابن مفلح)
অর্থাৎ অতপর বাম হাতের কব্জি ডান হাত দ্বারা চেপে ধরবে এবং নাভির নিচে হাত রাখবে। (আর রাওযুল মুরবি:১/১৬৫, মারদাবী আল-ইনসাফ: ২/৪৫ ও ইবনে মুফলিহ: আলফুরু:১/৩৬১)
এ ছিল হাত বাঁধার নিয়ম সংক্রান্ত সবগুলো হাদীসের সমন্বয়ে সুন্নত তরীকার বিশ্লেষণ। যা চার মাযহাবসহ পৃথিবীর অধিকাংশ ফকীহ ও মুহাদ্দিসদের মাযহাব ও সিদ্ধান্ত।

দ্বিতীয় তরীকা
হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কে দ্বিতীয় তরীকা বর্তমান কালের লা-মাযহাবী বন্ধুরা স্থীর করে নিয়েছে। তারা বলেন নামাযে হাত বাঁধার নিয়ম হচ্ছে, বাম হাতের কনুই পর্যন্ত ডান হাত বিছিয়ে দিবে। চেপে ধরবে না এবং বাম হাতের তালুর উপর ডান হাতের তালুও রাখবে না। যেমন: বর্তমানে অনেক মসজিদে নতুন নামাযী ও অনেক আধুনিক শিক্ষিত বন্ধুদের দেখা যায়।
তাদের দলিল হচ্ছে, হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস, যা আমরা উপরে পেশ করেছি-
حدثنا عبد الله بن مسلمة عن مالك عن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة . (صحيح البخاري: ৭০৭)
অর্থাৎ লোকদের এই আদেশ দেয়া হতো যে, তারা যেন নামাযে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখে। (সহীহ বুখারী:১/১০২)

আহলে হাদীস বন্ধুরা শুধু এ হাদীসটির উপর তাদের দৃৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। যার ফলে রাসূল স. ও সাহাবাদের অন্যান্য হাদীসগুলো পরিত্যাগ করে বসে আছে অথচ সবগুলোই নবীর হাদীস, নবীর শিক্ষা। এসবগুলোর সমন্বয় সাধন করেই সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের আমলের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে সঠিক নিয়ম দেখিয়েছেন। এক হাদীসের উপর নিজস্ব মত অনুযায়ী তার মর্ম ব্যাখ্যা করে আমল করা আর অন্যান্য হাদীসগুলো ত্যাগ করা এবং তাদের জানা হাদীসটির সঠিক মর্ম বাদ দেয়ার নাম কি আহলে হাদীস?
দেখুন তাদের জানা উক্ত হাদীসটির সঠিক মর্ম কি? হাদীস বিশারদগণ কি মর্ম বয়ান করেছেন ?

বুখারী শরীফের অন্যতম ব্যাখ্যাকার আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী র. ফাতহুল বারীতে লিখেন-
أبهم موضعه من الذراع وفي حديث وائل عند أبي داود والنسائي ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد وصححه بن خزيمة وغيره وأصله في صحيح مسلم بدون الزيادة والرسغ بضم الراء وسكون السين المهملة بعدها غدا هو المفصل بين الساعد والكف وسيأتي أثر على نحوه في أواخر الصلاة .

অর্থাৎ রাসূল স. কোন জায়গায় হাত রাখতেন? সেটা এই হাদীসে (বুখারীর উক্ত হাদীসে) অস্পষ্ট। তার ব্যাখ্যায় আবু দাউদ ও নাসাঈ শরীফের বর্ণিত ওয়াইল রা. এর হাদীসে (আমাদের আলোচনায় ১ নং হাদীস) (স্পষ্ট করে) বলা হয়েছে যে, “অতপর তিনি তার ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন” হাদীসটিকে ইবনে খুযায়মা র. প্রমুখ সহীহ বলেছেন।
সালাত অধ্যায়ের শেষে হযরত আলী রা. এর অনুরূপ হাদীস ও আমলও উল্লেখ করা হবে। (ফাতহুল বারী:২/২৭৫)

সার কথা : ইবনে হাজার র. বলেছেন, বুখারীর হাদীসে বাহুর উপর হাত রাখার কথা উল্লেখ থাকলেও কিভাবে কোন জায়গায় রেখেছেন তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এর ব্যাখ্যা হযরত ওয়াইল রা. থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীস যা আবু দাউদ ও নাসাঈতে উদ্ধৃত আছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাসূল সা. ডান হাত বাম হাতের তালুর পিঠ, কব্জি এবং বাহুর উপর রাখতেন। যেমনটি পূর্বে চার মাযহাবের ইমামগণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং হযরত আলী রা. এর আমল দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা গেছে।

আহলে হাদীসের অন্যতম ইমাম আল্লামা শাওকানীও এরূপ মন্তব্য করেছেন-

قوله ( على ذراعه اليسرى ) أبهم هنا موضعه من الذراع وقد بينته رواية أحمد وأبي داود في الحديث الذي قبل هذا ….. و المراد انه وضع يده اليمني علي كف يده اليسري و رسغها و ساعدها ولفظ الطبراني وضع يده اليمني علي ظهر اليسري في الصلاة قريبا من الرسغ. ( نيل الاوطار للشوكاني:২/১৮৬)
অর্থাৎ বুখারীর হাদীসে যে, বলা হয়েছে “ বাম বাহুর উপরে” ডান হাত রাখতেন।
আল্লামা শাওকানী আহমদ ও আবু দাউদের বর্ণিত হাদীসটির প্রসঙ্গে বলেন-
এর মর্ম হলো তিনি স. তার ডান হাত বাম হাতের পিঠে, কব্জি ও বাহুর উপর রেখেছেন।
তাবরানী র. এর বর্ণনায় এসেছে “তিনি স. নামাযে তার ডান হাত বাম হাতের পিঠের উপর কব্জির নিকট রেখেছিলেন। (নাইলুল আওতার:২/১৮৭)

সুতরাং এতে পরিস্কারভাবে বুঝা গেল, লা-মাযহাবী বন্ধুগণ হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কে বর্ণিত সব হাদীস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও পরিত্যাগ করেছেন। শুধু একটি হাদীস মানার চেষ্টা করেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়
নাভির উপর বা বুকের উপর হাত বাঁধা প্রসঙ্গে
নামাযে কোথায় হাত বাঁধবে?
এ বিষয়ে দু’ধরনের মত পাওয়া যায়। আমরা এখানে উভয় মতের হাদীসগুলো সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনাসহ পেশ করবো।

প্রথম মত: নাভির উপরেই হাত বাঁধবে। এটাই চার ইমামের মত।
ইমাম আবু হানীফা র. ও ইমাম আহমদ র. উভয়েই নাভির নীচে হাত বাঁধাকে সুন্নত তরীকা বলে মত পোষণ করেছেন।
ইমাম শাফেয়ী র. বুকের নীচে হাত বাঁধাকে উত্তম বলেছেন। বুকের উপরে হাত বাধার কথা কেউ বলেননি।
ইমাম মালেক যেহেতু বাঁধার পক্ষে না, তাই এ ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই।

নাভির নিচে হাত বাঁধার দলিল
১ম হাদীস: হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর র. বলেন-
حدثنا وكيع عن موسى بن عمير عن علقمة بن وائل بن حجر عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم وضع يمينه على شماله في الصلاة (مصنف ابن ابي شيبة ৩৯০৯ )
অর্থাৎ হযরত আলকামা রা. তার পিতা হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূল স.-কে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে হাত রাখতে দেখেছি। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: হা:৩৯৫৯)
হাদীসটি সহীহ নির্ভরযোগ্য।
এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হাফেজ কাসিম ইবনে কুতলুবুগা রাহ.-র বর্ণনা ।
তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার আবু তৈয়্যব সিন্ধী র. ও আল্লামা আবিদ সিন্ধী র.-সহ অনেকে হাদীসটি সূত্রের দিক থেকে শক্তিশালী আখ্যা দিয়েছেন। এর সনদে কোন দুর্বল বর্ণনাকারী নেই। (তাজাল্লিয়াতে সফদর:৪/৬৩)
উল্লেখ্য, এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারী কুফার বাসিন্দা। আর কুফার ওলামা ও উম্মতের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা ছিল নাভির নিচে হাত বাধা। সুতরাং এ হাদীসটি তাওয়াতুরে আমলী দ্বারাও শক্তিশালী। মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বার অধিকাংশ সত্যায়িত পান্ডুলিপি যথা:
শাইখ কাসিম কুতলুবগা র., শায়খ মুহাম্মদ আকরম নসরপুরী র., শায়খ আব্দুল কাদির মুফতীয়ে মক্কা-মুকাররমা প্রমুখ-এ (تحت السرة) নাভির নিচে শব্দটি বিদ্যমান আছে। উপরন্তু শায়খ মুহাম্মদ হায়্যাত সিন্ধী র. এর শিষ্য মোল্লা কারিম সিন্ধী র. লিখেন-
فهذه الزيادة في اكثر النسخ الصحيحة ورأيت بغيني في نسخة صحيحة عليها الامارات الصحيحة. (در الغرة: ص৪)
অধিকাংশ সহীহ পান্ডুলিপিতে শব্দটি নাভির নীচে বিদ্যমান আছে। আমি নিজ চোখে সহীহ নোসখায় তা দেখেছি। যেখানে সত্যায়নের অনেক আলামত উপস্থিত রয়েছে।
সুতরাং যারা বলে মুসান্নাফের কোন কপিতে শব্দটি নেই, তাদের কথা ভিত্তিহীন।

২য় দলিল
হযরত আলী রা. বলেন-
عَنْ أَبِى جُحَيْفَةَ أَنَّ عَلِيًّا – رضى الله عنه – قَالَ السُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ. وفيه عبد الرحمن ابن اسحاق الواسطي وهو ضعيف . (ولكن الحديث السابق الصحيح يشهد له، قال المزي: هذاالحديث في رواية ابن الاعرابي وابن دامة وغير واحد عن ابي داود ولم يذكره ابوالقاسم .(تحفة الاشراف ৪৫৭/৭)
অর্থাৎ সুন্নাত হলো, এক হাতের তালু অপর হাতের তালুর উপর রেখে নাভির নিচে হাত বাঁধা। [দ্র:আবু দাউদ হা: ৭৫৬,মুসানাদে আহমদ:১/১১০ হা:৮৭৫, মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হা: ৩৯৬৬, দারা কুতনী:১/২৮৬]

এর সনদে আব্দুর রহমান আল ওয়াসেতী রয়েছেন তিনি যয়ীফ। তবে প্রথম সহীহ হাদীসটি এর সমর্থন করছে। তাই-ই প্রমাণযোগ্য।

৩য় দলিল:
অনুরূপ একটি হাদীস আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
اخذ الاكف علي الاكف في الصلاة تحت السرة. أخرجه أبوداود وفيه عبد الرحمن المذكور.
অর্থ: হাতের তালু অপর হাতের তালুর উপর রেখে নাভির নীচে রাখতে হবে।
(আবু দাউদ হা: ৭৫৮)
এতে পূর্বোক্ত বর্ণনাকারী আব্দুর রহমান আল ওয়াসিতী রয়েছে, যিনি যঈফ। প্রথম হাদীসটি এ হাদীসকে সমর্থন দিচ্ছেÑতাই এটা প্রমাণযোগ্য।

৪র্থ দলিল
হযরত আনাস রা. বলেন-
ثلاث من اخلاق النبوة : تعجيل الافطار وتاخير السحور ووضع اليد اليمني علي اليسري في الصلاة تحت السرة. (أخرجه ابن حزم في المحلي تعليقا : ২/৩০ والجوهر النيرة . باب وضع اليدين علي الصدر: ২/৩২)
অর্থাৎ তিনটি কাজ নববী চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত। ইফতারে বিলম্ব না করা, সাহরী শেষ সময়ে খাওয়া এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে হাত রাখা। (আলমুহাল্লা লিইবনে হাযম:৩/৩০, আল জাওহারুন নাকী:২/৩২)

৫ম দলিল:
হাজ্জাজ ইবনে হাস্সান হযরত আবু মিজলায র. এর ফাতওয়া নকল করেন-
حدثنا يزيد بن هارون قال : أخبرنا حجاج بن حسان قال :سمعت أبا مجلز أو سألته قال :قلت كيف يصنع قال : يضع باطن كف يمينه على ظاهركف شماله ويجعلها أسفل من السرة .(مصنف ابن ابي شيبة: ৪২৭)

অর্থাৎ আমি আবু মিজলায র. কে বলতে শুনেছি অথবা আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে হাত বাঁধবো? তিনি বলেন, ডান হাতের তালু বাম হাতের তালুর পিঠে রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। (দ্র: মুসান্নাফে ইবেন আবী শায়বা:হা:৩৯৬৩)
হযরত মিজলায র. বিশিষ্ট তাবেয়ী এবং হাদীসটির সনদ সহীহ।

৬ষ্ঠ দলিল
বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইবরাহিম নাখয়ী র. বলেন-
عن إبراهيم قال : يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة. (مصنف ابن ابي شيبة : ১/৩৯০ (৩৯৫৯) قال العلامة عوامة هذا اسناد صحيح. قال الامام القاسم بن قطلوبغا هذا اسناد جيد (صحيح) (تعليق ابن ابي شيبة ৩/৩২০) قال اسحاق (شيخ البخاري) تحت السرة أقوي في الحديث وأقرب إلي التواضع. (لاوسط : ৩/২৪ح১৬৮৭)
অর্থ: নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নীচে বাঁধবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: হা: ৩৯৬০Ñএর সনদ হাসান)
উপরোক্ত ছয়টি হাদীসের মধ্যে হযরত ওয়াইল (১ম হাদীস) আবু মিজলাসের হাদীস (৫নং) দুটি হাদীস তাবেয়ীর বর্ণনায় হলেও হাসানের পর্যায়ে হওয়ায় আমল ও প্রমাণযোগ্য। অন্যান্য হাদীসগুলোর মধ্যে হযরত আলী রা. এর হাদীস সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হলেও সহীহ হাদীস তার সমর্থনে থাকায় তা মারফুয়ে হুকমী। এসব হাদীস প্রমাণ বহন করে যে, হাত বাঁধার সুন্নাত তরীকা হলো, নাভির নীচে বাঁধা।

বুকের উপর হাত রাখার উপর হাদীসগুলো প্রসঙ্গ
২য় মত: বুকের উপর হাত বাঁধা। মতটি বর্তমান প্রচলিত আহলে হাদীসদের।

বুকের উপর হাত রাখার ব্যাপারে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে।
১.সহীহ ইবনে খুযাইমাতে হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত –
أخبرنا أبو طاهر نا أبو بكر نا أبو موسى نا مؤمل نا سفيان عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال صليت مع رسول الله صلى الله عليه و سلم ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره : (صحيح ابن خزيمة :১/২৭২)
অর্থ: হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. বলেন, আমি হযরত রাসুলে কারীম স.-এর সাথে নামায আদায় করলাম। তিনি (রাসূল স.) তার ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রাখলেন। (ইবনে খুযাইমা ১/২৭২,হাদীস ৪৭৯)

সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- এ হাদীসে বুকের উপর হাত বাঁধা (علي الصدر) এর কথা একমাত্র এ বর্ণনাকারীর বর্ণনায় এসেছে। তাকে ইমাম বুখারী র. মুনকারুল হাদীস তথা তার হাদীস অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইমাম আবু যুরআ বলেন, তিনি শেষ বয়সে অনেক ভুল হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাই হাদীসটি যয়ীফ, প্রমাণযোগ্য নয়। তাছাড়া হাদীসটি অন্যান্য সনদে বুকের উপরের স্থলে নাভীর নীচের কথা এসেছে। বিস্তারিত দেখুন, পরিশিষ্ট-১।

২. মুসনাদে আহমদে হযরত হুলব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
رأيت النبي صلي الله عليه وسلم يضع يده علي صدره . (مسند لاحمد: ৫/২২৬)
আমি নবী রাসূল স.কে বুকের উপর হাত রাখতে দেখেছি। (মুসনাদে আহমাদ ৫/২২৬)

সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- এ হাদীসে সিমাক ইবনে হারব নামক বর্ণনাকারী আছেন। তাকে অনেকে যয়ীফ বলেছেন।
ইমাম নাসাঈ র. বলেন, মৌলিক কোনো বিষয়ে তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। দেখুন পরিশিষ্ট-২।

৩. বাইহাকী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
ضع يدك اليمني علي الشمال عند النهر .(السني الكبري للبيهقي : ২/৩১)
তোমার ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের কাছা কাছি রাখ। (সুনানে কুবরা বায়হাকী ২/৩১)

সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- এ হাদীসটিতে ইয়াহইয়া, আমর এবং রাওহ নামক তিনজন বর্ণনাকারী আছেন। তারা সকলেই অত্যান্ত যয়ীফ। তাদের বর্ণিত হাদীস মোটেই প্রমাণযোগ্য নয়। বিস্তারিত দেখুন পরিশিষ্ট-৩।

৪. মারাসীলে আবু দাউদে হযরত তাউস র. বলেন-
كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يضع يده اليمني علي يده اليسري ثم يشبك بينهما علي صدره وهو في الصلاة. (مراسل ابوداود ص ৬)
রাসূল স. নামাযে তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন। এরপর হাত বুকের উপর বাঁধতেন। (মারাসিলে আবু দাউদ পৃষ্ঠা : ৬)

সংক্ষিপ্ত মন্তব্য- এ হাদীসটি মুরসাল। আহলে হাদীসদের মতে হাদীসে মুরসাল প্রমাণযোগ্যই না। উপরন্তু ইমাম নীমভী র. একে যয়ীফ বলেছেন। তাই তা প্রমাণযোগ্য নয়। (দেখুন পরিশিষ্ট-৪)

পরিশিষ্ট-১
হাদীসে ওয়াইলের পর্যালোচনা
হাদীসটির সনদ হচ্ছে,
عن مأمل عن سفيان عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل ابن حجر (صحيح ابن خزيمة ১/২৪২)
এ হাদীসটি সহীহ নয়; যার বহু কারণ রয়েছে।

ক. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযী র. اعلام الموقعين ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন গ্রন্থে লিখেছেন, এ হাদীসে علي الصدر বুকের উপর শব্দটি মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈল ছাড়া অন্য কেউ বর্ণনা করেননি। আর মুয়াম্মালের ব্যাপারে ইমাম বুখারী র. মন্তব্য করেছেন, তিনি منكر الحديث। তার বর্ণনাসমূহ অগ্রহণযোগ্য। দ্র: তাহযীব।
তিনি একথাও বলেছেন, আমি যাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলবো। তার সূত্রে হাদীস বর্ণনা করা বৈধ হবে না। (মীযানুল ইতেদাল-১/৫)
তাছাড়া ইবনে সা‘দ র. আবু যুরআ আবু হাতেম র. ইমাম দারাকুতনী প্রমুখ তাকে كثير الغلط “অত্যাধিক ভুলের শিকার” আখ্যা দিয়েছেন।
ইবনে মাঈন বলেছেন, মুয়াম্মালের বর্ণনা সুফিয়ান সূত্রে প্রমাণযোগ্য নয়।
অবশেষে ইবনে হাজার আসকালানী র. সিদ্ধান্ত মূলক মন্তব্য হচ্ছে- সুফিয়ান থেকে মুয়াম্মালের বর্ণনায় দুর্বলতা আছে। (ফাতহুল বারী:৯/২৮৮)

খ. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা গ্রন্থে এ হাদীসটির বিবরণে علي الصدر বুকের উপর এর স্থলে تحت السرة নাভির নিচে শব্দটি এসেছে। সুতরাং এটা লা-মাযহাবীদের নয়; বরং চার মাযহাবেরই দলিল।

গ. হযরত ওয়াইলের উপরোক্ত হাদীসটি মুসনাদে বাযযারেও উল্লেখ আছে। সেখানে علي الصدر বুকের উপর এর স্থলে عند صدره বুকের কাছে শব্দটি বর্র্ণিত হয়েছে। এ হাদীসটির সূত্র সম্পর্কে হাফেজ যাহাবী র. বলেন, এ সনদে মুহাম্মদ ইবেন হুজর নামে একজন বর্ণনাকারী আছেন, তার অনেক মুনকার (অগ্রহণযোগ্য) হাদীস রয়েছে।

ঘ. উক্ত হাদীসটি মুয়াম্মাল ছাড়া অনেকে রেওয়ায়েত করেছেন। তাদের বর্ণনায় علي الصدر বুকের উপর শব্দটি উল্লেখই নেই। যেমন মুসনাদে আহমদে আব্দুল্লাহ বিন ওয়ালীদ থেকে (৪/৩১৮) নাসাঈতে যাযিদাহ থেকে, আবু দাউদে বিশর ইবনে মুফায্যাল থেকে (১/১১২) ইবনে মাজায় বিশরও আব্দুল্লাহ ইবনে ইদ্রিস থেকে (৫৯) মুসনাদে আহমদ। আব্দুল ওয়াহিদ (৪/৩১৬) যুহায়র ইবনে মুআবীয়া (৪/৩১৮) (৪/৩১৮) এবং শুরা থেকে (৪/৩১৯) বায়হাকীতে খালিদ ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে (২/১৩১)। এবং শুরা থেকে (৪/৩১৯)। বায়হাকীতে খালিদ ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে ২/১৩১।। (তাজাল্লিয়াতে সফদর: ৪/৫৫)

সার কথা :
علي الصدر বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসটি সহীহ নয়। আর যে সব সুত্রে সহীহ বলা যেতে পারে সেখানে علي الصدر বুকের উপর শব্দটি উল্লেখ নেই।

পরিশিষ্ট-২
দ্বিতীয় দলিলের হাদীসে هُلْب এর পর্যালোচনা

ক. দ্বিতীয় দলিলে হযরত হুলব هُلْب থেতে বর্ণিত হাদীস শুধু سماك সিমাক ইবনে হারব বর্ণনাকারীর সূত্রে পাওয়া যায়। অনেক মুহাদ্দিস তাকে যয়ীফ বলেছেন। স্বয়ং তারই শাগরিদ সুফিয়ানও তাকে যয়ীফ বলেছেন।
ইমাম নাসায়ী বলেন, اذا تفرد باصل لم يكن حجة .
তিনি যদি কোনো মৌলিক বিষয়ে একা বর্ণনা করেন, তবে তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হবে না।

খ. উক্ত হাদীসের সনদে রয়েছেন হযরত সুফিয়ান সাওরী র.। তিনি তার অন্যতম বর্ণনাকারী। অথচ তার মাযহাব হচ্ছে, নাভীর নিচে হাত বাঁধা। বর্ণনাকারী নিজেই এ হাদীসের মর্মের উপর আমল করছেন না।

ইমাম নববী র. শরহে মুসলিমে উল্লেখ করেন-
وقال ابو حنيفة وسفيان الثوري واسحاق بن راهويه وابواسحاق المروزيد من اصحابنا يجعلها تحت السرة. (১/৭৩)
অর্থাৎ ইমাম আবু হানীফা, সুফিয়ান সাওরী, ইসহাক ইবনে রাহওয়াহ এবং আমাদের ইমাম আবু ইসহাক মিরওয়াবী তারা সকলেই দু’হাত নাভীর নিচে বাঁধার মত পোষণ করেছেন। (১/৭৩)

গ. উক্ত হাদীসের সনদটি নিম্নরূপ-
رأيت النبي صلى الله عليه وسلم ينصرف عن يمينه وعن يساره ورأيته قال يضع هذه على صدره وصف يحيى اليمنى على اليسرى فوق المفصل.(مسند احمد ৫/২৬৬)
এ হাদীসে বুকে হাত বাঁধার কথা আছে, কিন্তু এ হাদীসটি আরো বিভিন্ন কিতাবে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং মুসনাদে আহমাদেও একাধিক সূত্রে এসেছে কোথাও علي الصدر (বুকের উপর) শব্দটি উল্লেখ নেই । যেমন, মুসনাদে আহমাদ সুফিয়ান থেকে ইমাম ওয়াকি র. বর্ণনা করছেন। (৫/২৪৬)
ইমাম দারা কুতনী সুফিয়ান থেকে আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী বর্ণনা করছেন। (১/১০৭) তিরমিযী ও ইবনে মাজাতে সিমাক থেকে সুফিয়ানের স্থলে আবুল আহওয়াস র. বর্ণনা করেছেন । (তিরমিযী -১/৩৪ , ইবনে মাজাহ -৫৯)
এসব সনদে বর্ণিত হাদীসটিতে علي الصدر বুকের উপর শব্দটি নেই।

ঘ. যে একটি মাত্র সনদে علي الصدر বুকের উপর কথাটি উল্লেখ আছে, তার প্রথম বর্ণনাকারীই হচ্ছেন ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ। তিনি ইমাম আহমাদের যুগের বর্ণনাকারী। এ নামে তিন জন ব্যক্তি আছেন। তিন জনই যয়ীফ বর্ণনাকারী।
চার নম্বর বর্ণনাকারী ‘কাবীসা’, তাকে অনেক মুহাদ্দিস ‘মাজহুল’ তথা অজ্ঞাত বলেছেন।
২নং বর্ণনাকারী সুফিয়ানের তো মাযহাবই নাভির নিচে হাত বাঁধা যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
৩নং বর্ণনাকারী সিমাক। তাকেও অনেকে যয়ীফ বলেছেন।

সার কথা, এ হাদীসটি নিতান্তই যয়ীফ। কোন ক্রমেই তা প্রমাণযোগ্য হতে পারে না। এ কারণে আল্লামা নীমভী র. বলেছেন-
ويقع في قلبي أن هذا تصحيف من الكاتب والصحيح يضع هذه علي هذه فيناسبه قوله ووصف يحي اليمني علي اليسري فوق المفصل ويوافقه سائر الروايات. (الاثارالسنن : ৭৮)
অর্থাৎ আমার মনে হয়Ñঅনুলেখকের ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে। সঠিক বর্ণনা হচ্ছে, علي صدره ‘বুকের উপর’-এর স্থলে علي هذه ‘এর উপর’। (অর্থাৎ তিনি এই হাতটি অপর হাতের উপর রেখেছেন) এতে বর্ণনাটি পরের কথার সঙ্গেও মিলে যায়। কারণ পরে বলা হয়েছে, ইয়াহইয়া বর্ণনাটি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, (রাসূল স. ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখেছিলেন। আর এটি তখন অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ হয়। [দ্র: ৮৭]

উপরন্তু উক্ত হাদীসটি ‘হাইছামির’ ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ এবং ‘কানযুল উম্মালে’, ইমাম সুয়ুতীর জামেউল জাওয়ামিয়ীতে উদ্ধৃত হয়েছে। কোথাও علي صدره বুকের উপরে কথাটি উল্লেখ নেই।
বুঝা গেলো, .هذه علي هذه একহাত অপর হাতের উপরেই রেখেছেন। এ বর্ণনাটি সঠিক। অনুলেখক ভুল করে هذه এর স্থলে صدره লিখে দিয়েছেন।
সার কথা, বহুবিদ কারণে হাদীসটি অত্যন্ত যয়ীফ ও প্রমাণযোগ্য নয়।

পরিশিষ্ট-৩
তৃতীয় দলিল পর্যালোচনা
ইবনে আব্বাস রা. থেকে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, তার বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনে কেরামের কঠিন মন্তব্য রয়েছে যেমন-

এক. একজন বর্ণনাকারী ইয়হইয়া ইবনে আবু তালিব ।
মুসা ইবনে হারুণ বলেন, أشهد أنه مكذب আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, সে মিথ্যাবাদী। ইমাম আবু দাউদ তার বর্ণনাগুলোকে পরিত্যক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। (মীযানুল ইতিদাল:৩/২৬৩)

দুই. অপর বর্ণনাকারীর নাম “আমর”।
তার সম্পর্কে ইবনে আদী র. বলেছেন منكر الحديث তার বর্ণনাগুলো মুনকার তথা অগ্রহণযোগ্য। (আল জাওহারুন নাকী:২/৩০)

তিন. আরেকজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন ‘রাওহা ইবনে মুসায়্যাব’।
তার সম্পর্কে ইবনে হিব্বান বলেন- يروي الموضوعات ولا تحل الرواية عنه.
সে মনগড়া হাদীস বর্ণনা করে। সুতরাং তার কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করা বৈধ হবে না।
আবু হাতিম রাযী র. বলেন ليس بالقوي সে শক্তিশালী নয়।
ইবনে আদী র. বলেছেন احاديثه غير محفوظة তার হাদীস সংরক্ষিত নয়। (তাহযীবুত তাহযীব)
সুতরাং এ হাদীসটি দুর্বল, যা কোনক্রমেই প্রমাণযোগ্য হতে পারে না।

পরিশিষ্ট-৪
চার নং হাদীসে তাউস এর পর্যালোচনা
এ বর্ণনাটি মুরসাল। লা-মাযহাবী বন্ধুগণ মুরসালকে যয়ীফ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু এখানে মুরসাল দিয়েই দলিল পেশ করলেন। কারণ তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য অন্য কোনো দলিল নেই।
তবে যদি সহীহ সনদে হতো তাহলে কথা ছিলো না; কিন্তু আল্লামা নীমভী র. তাউসের এ মুরসালকে যয়ীফ বলে আখ্যা দিয়েছেন। [মাআরিফুস সুনান:২/৪৪০]
তদুপরি এর সনদে সুলায়মান ইবনে মুসা নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন, যার সম্পর্কে ইমাম বুখারী র. বলেছেন, عنده مناكير তার বর্ণনায় অনেক আপত্তিকর বিষয় রয়েছে।
ইমাম নাসায়ী র. বলেছেন ليس بالقوي তিনি মজবুত বর্ণনাকারী নন। [দ্র: আল কাশিফ]

আসল কথা, বুকের উপর হাত বাঁধার একটি হাদীসও সহীহ ও গ্রহণযোগ্য নয়। সে কারণে চার মাযহাবের কোন ইমাম কিংবা অন্যান্য কোন ইমাম এ মতের পক্ষে যাননি। লা-মাযহাবীদের এ নিয়মটি সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিসদের বিপরীত। বুকের উপর হাত বাঁধার প্রচলন নব আবি®কৃত। ইমাম তিরমিযী র. এর যুগ পর্যন্ত এ প্রথার অস্তিত্বও ছিল না। হাত কোথায় বাঁধবে এ নিয়ে তিনি সকলের সব মতই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিরমিযীতে বুকের উপর হাত বাঁধার কোনো মত উল্লেখ নেই।
ইমাম তিরমিযী বলেন-

وَالعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ أَهْلِ العِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالتَّابِعِينَ، وَمَنْ بَعْدَهُمْ، يَرَوْنَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاَةِ، وَرَأَى بَعْضُهُمْ أَنْ يَضَعَهُمَا فَوْقَ السُّرَّةِ. وَرَأَى بَعْضُهُمْ: أَنْ يَضَعَهُمَا تَحْتَ السُّرَّةِ، وَكُلُّ ذَلِكَ وَاسِعٌ عِنْدَهُمْ.(سنن الترمذي: ১/৩৩৬)
অর্থাৎ এ হাদীসের উপর সাহাবী তাবেয়ী ও পরবর্তী যুগের ফুকাহা এবং উলামাদের আমল ছিল। তারা মনে করতেন ‘নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখবে। তাদের কেউ কেউ মনে করতেন, নাভির উপরে হাত রাখবে।
আর কেউ কেউ মনে করতেন, নাভির নিচে হাত রাখবে। তাদের দৃষ্টিতে প্রত্যেকটিরই অবকাশ আছে।
দেখুন, ইমাম তিরমিযী র. সাহাবা থেকে তার যুগ পর্যন্ত উলামাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একভাগের মত ছিল নাভির উপরে হাত বাঁধা। আরেক ভাগের মত ছিল নাভির নিচে হাত বাঁধা। উভয়টির অবকাশ আছে বলে তারা মনে করতেন। কিন্তু বুকের উপর হাত বাঁধার কোনো মত/দল তিনি উল্লেখ করেননি।
এতেই প্রমাণিত, বুকের উপর হাত বাঁধার মত কোনো আসলাফ ব্যক্ত করেন নি।

সারকথা
নাভির নিচে বা উপরে হাত বাধা রাসূল স., সাহাবায়ে কিরাম ও সর্ব যুগের ফকীহ-মুহাদ্দিস তথা সমগ্র উম্মতের আমল। এটাই সুন্নাত। দুটি সহীহ হাদীস, একটি হাসান বর্ণনা, বহু যয়ীফ তবে সহীহ এর সমর্থনে আমলযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
কিন্তু বুকের উপর হাত বাঁধার উপর একটি সহীহ হাদীসও নেই। এমন ভিত্তিহীন অত্যন্ত যয়ীফ হাদীসের উপর আমল করেই লা-মাযহাবী বন্ধুরা আজ ফিৎনা ছড়াচ্ছেন। যার উপর ভিত্তি করে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আমলকে পরিত্যাগ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *