বর্তমান বিশ্বে বা আমাদের দেশে ইসলামের নামে যেসব সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে এগুলো ইসলামসম্মত নয়, সত্যিকার জিহাদের ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যেই একটি শান্তিপূর্ণ দেশে জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করা হচ্ছে- শায়খুল হাদিস মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ

Shortlink:

বিশিষ্ট ইসলামি গবেষক ও শায়খুল হাদিস মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ বলেছেন, তরুণদের যে অংশটি ইসলামের শিক্ষা পায়নি কিন্তু ইসলামকে জানতে ও মানতে আগ্রহী হচ্ছে তাদেরকেই টার্গেট করে মগজ ধোলাই করে বিপথগামী করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে বা আমাদের দেশে ইসলামের নামে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকা- হচ্ছে এগুলো ইসলামসম্মত নয়। যারা এসব করছে তা তাদের চিন্তাধারাপ্রসূত কিংবা অন্য কোনো ইসলামবিদ্বেষী শক্তির বানানো ধারণা। ইসলামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের কোনো সুযোগ নেই। সন্ত্রাসকে লালন করা এবং সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার কোনো ইতিহাস ইসলামে নেই। ইসলামের প্রথম যুগে ছিল মজলুম হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা-কে সহ্য করা এবং শেষের দিকের ইতিহাস হলো সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হওয়ার কারণে সন্ত্রাসকে দমন করার ইতিহাস। বর্তমানে যা চলছে এটা কোনোভাবেই জিহাদ নয়। যখন একটি দেশ দলবদ্ধভাবে জবরদস্তি একটি নিরীহ দুর্বল দেশের ওপর হামলা করে, অন্যায়ভাবে তাদের নারী-পুরুষ নিরপরাধ লোককে হত্যা করবে, মাটিকে রক্তরঞ্জিত করবে তখনই ইসলামে রাসূলের মাদানি যুগের মতোই চূড়ান্ত জিহাদের বিষয় আসতে পারে। সেটা হলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। সেই পরিস্থিতি তো বাংলাদেশে হয়নি।

তিনি বলেন, এখন যা চলছে এটা ইসলামের নামে কিছু অপকর্ম করে বিশ্বের বুকে ইসলামকে একটি সন্ত্রাসী ধর্ম আখ্যায়িত করার অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। ইহুদি-মুশরিকরা যুগে যুগে বিভিন্ন নামে ইসলামে নানা অঘটন ঘটিয়েছে উল্লেখ করে মুফতি মিজান বলেন, যদি কেউ ইসলামের নামে অপকর্ম করে, জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস করে তাহলে আমার ধারণা এদের পেছনে কোনো ইহুদি চক্রান্ত আছে। মুসলমানদের মেরে ফেলে দুর্বল করা এবং বিশ্বে নিজেদের নেতৃত্ব দেয়ার কৌশল তারা অবলম্বন করেছে। যেখানে সম্ভব হচ্ছে সেখানে সরাসরি তারা যুদ্ধ করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যে দেশে যুদ্ধের কোনো ইস্যু নেই সেই দেশে মুসলমানদের নষ্ট করার জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। সত্যিকার জিহাদের ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যেই একটি শান্তিপূর্ণ দেশে জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করা হচ্ছে এমনটি হওয়া বিচিত্র নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে যেই তৎপরতা দেখা দিয়েছে তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে আরো ভয়াবহ রক্তপাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি। তার মতে, এ বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো সরকার ও জনগণ সবাইকে ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সত্যিকারের ইসলাম কাকে বলে সেটা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর জন্য সহযোগিতা সরকারকে করতে হবে। দেশে একটি হক্কানী ওলামা কমিটি গঠন করে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা প্রচারের ব্যবস্থা করা উচিত। এ সন্ত্রাসী ঘটনা কে বা কারা ঘটাচ্ছে তা উদঘাটন করতে হবে। তবে অসত্যকে সত্য বানিয়ে কিছু করতে গেলে দেশের অবস্থা শেষ হয়ে যাবে। কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা প্রত্যেক শ্রেণীর লোকদের উপলব্ধি করাতে হবেÑএটাই হবে একটা মৌলিক চিকিৎসা।

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ রাজধানীর শেখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও শায়খুল হাদিস, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ১৭ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা কমিটির অন্যতম সদস্য। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সাব-কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জঙ্গিবাদ ইস্যুতে নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

তার সাক্ষাৎকারটি নি¤œরূপ :

নয়া দিগন্ত : দেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতার অভিযোগ উঠছে। এর সাথে জড়িতরা ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী, ইসলামকে ব্যবহার করে উগ্রপন্থা, চরমপন্থা অবলম্বনের কোনো অবকাশ আছে কি ?

মুফতি মিজান : আমরা কুরআন-হাদিসের মধ্যে ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ নামে একটি পরিভাষা দেখতে পাই। এর অর্থ হলো দুনিয়ায়-সমাজে বিশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারাই মূলত সন্ত্রাসী। তাদের কঠোর শাস্তি প্রদানের বিধান দেয়া হয়েছে কুরআনে। আবার কুরআন-হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মকে বিশ্বনবী সা:সহ নবীদের ওপর অবতীর্ণ করেছেন শান্তিশৃঙ্খলার সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যক্তি গঠন করার জন্য। ইসলাম শব্দের অর্থই হচ্ছেÑ শান্তি, শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শান্তি ও শৃঙ্খলা। আমরা কুরআন-হাদিসের দিকে তাকালে দেখতে পাই আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন বিশ্বকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অন্যায় অপরাধ থেকে মুক্ত করে সমাজ, জাতি ও ব্যক্তির মধ্যে শান্তির পরিবেশ কায়েম করার জন্য।

আল কুরআনের সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে জমিনে ফ্যাসাদ বা সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কয়েক ধরনের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তবে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরকারকগণ বলেছেন, ফাসাদ ফিল আরদ বা সন্ত্রাসবাদ দুই রকমের। একটি হলো, দেশের মধ্যে সন্ত্রাস চালিয়ে বিশৃঙ্খলা চালিয়ে নিরাপত্তা বিঘিœত করা। এটাকে জাতীয় সন্ত্রাস বলা যায়। আরেকটা হলো, নিজ দেশ থেকে দলবদ্ধভাবে অন্য দেশে গিয়ে অন্যায়ভাবে হামলা বা আক্রমণ পরিচালনা করা। এটাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস বলা যায়। উভয় ধরনের সন্ত্রাসকেই ফাসাদ ফিল আরদ বলা হয়। কুরআনের উল্লিখিত আয়াতে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীর যে চার ধরনের শাস্তির উল্লেখ আছে সেগুলো জাতীয়ভাবে সন্ত্রাসের শাস্তি। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলামের সূচনালগ্নে রাসূল সা: মক্কায় সাহাবীদেরকে নিয়ে ১৩ বছর ছিলেন। তখন তিনি এক আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়েছেন। এ কাজের অপরাধে সেই যুগের ইসলামবিদ্বেষী আবু লাহাব, আবু জেহেল ইসলামের নবী এবং সাহাবায়ে কেরামের ওপরে মক্কায় সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছিল। নবীর ওপর হামলা, পথে কাঁটা বিছানো, উটের নাড়িভুঁড়ি মাথার ওপর দিয়ে চেপে হত্যার চেষ্টা, সাহাবীদের ওপর একতরফা নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং কয়েকজন শহীদও হয়েছেন। তারপরও তখন কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:কে ধৈর্যধারণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং দাওয়াত অব্যাহত রাখতে বলেছেন। তা ছিল মক্কায় নবী ও মুসলমানদের ওপর জাতীয় সন্ত্রাস। কিন্তু তখন নবী সা: ও মুসলমানরা ধৈর্য ধারণ করেছেন। ১৩ বছর পর সাহাবীদের নিয়ে নবী সা: যখন মদিনা চলে গেলেন তখন ইহুদিরা ছাড়া প্রায় সব মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করলেন। তখন সেখানে কোনো রকমের বিরোধ ছিল না। ইহুদিদের সাথেও সন্ধি হয়ে গিয়েছিল। সেখানে শান্তির সমাজ কায়েম হয়েছিল। কিন্তু মক্কার সেই সন্ত্রাসীরা আরো কিছু সন্ত্রাসীকে একত্র করে দলবদ্ধভাবে মদিনার ওপর হামলা করে। সেটা ছিল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বলা হলো, আপনি আপনার কাজ করছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে কিন্তু এখন অন্য দেশ থেকে এসে আপনার ওপর সন্ত্রাসী হামলা করছে। ফলে এখন আপনি চুপ থাকতে পারবেন না, মোকাােবলা করতে হবে। তখন আত্মরক্ষামূলক জিহাদ বা কেতালের নির্দেশ এলো। তাহলে বোঝা যায়, ইসলামে যে জিহাদ তা সন্ত্রাস দমনের একটা ব্যবস্থা। তবে সেটা একটি কঠিন ব্যবস্থা। সেটার জন্য শর্ত আছে যে, মুসলমানদের একজন আমির হতে হবে। সেই আমিরের নেতৃত্বে চলতে হবে এবং সব মুসলমান ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, মোকাবেলা করার কিছু না কিছু সামর্থ্যও থাকতে হবে। রাসূলের ২৩ বছর জীবনের এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকেই পরিষ্কার, ইসলামে সন্ত্রাসকে লালন করার ইতিহাস নেই। সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার কোনো ইতিহাস নেই। ইসলামের প্রথম যুগে ছিল মজলুম হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা- সহ্য করা এবং শেষের দিকে হলো সন্ত্রাসকে জিহাদের মাধ্যমে দমন করার ইতিহাস। তাই আল্লাহ তায়ালা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসকে দমন করার জন্য জিহাদ ফরজ করেছেন। আর জাতীয় সন্ত্রাস দমনের জন্য আল্লাহ চারটি শাস্তির বিধান দিয়েছেন যা কুরআনের ওই আয়াতে উল্লেখ আছে।

সুতরাং বর্তমান বিশ্বে বা আমাদের দেশে সন্ত্রাসী কর্মকা- যেগুলো হচ্ছে এগুলো যদি ইসলামের নাম ভাঙিয়ে কেউ করে তাহলে আমি বলব এটা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মদিনার ইসলাম নয়। তাদের নিজস্ব চিন্তাধারার কোনো ইসলাম। অথবা অন্য কোনো ইসলামবিদ্বেষী বা অমুসলিমদের বানানো ইসলাম। সত্যিকার যে ইসলাম কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে নবী সা: নিয়ে এসেছেন সেই ইসলামে কিন্তু ইসলামের নামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নেই, জিহাদ আছে। কিন্তু এখন জিহাদের নামে যে সন্ত্রাসী কাজ চলছে এগুলো জিহাদ নয়। জিহাদ চলছিল আফগানিস্তানে, জিহাদ চলছে ফিলিস্তিনে, জিহাদ চলছিল ইরাকে, বিভিন্ন দেশে। যখন একটি দেশ দলবদ্ধভাবে জবরদস্তি একটি নিরীহ দুর্বল দেশের ওপর হামলা করে, অন্যায়ভাবে তাদের নারী-পুরুষ নিরপরাধ লোককে হত্যা করবে, মাটিকে রক্তে রঞ্জিত করবে তখনই ইসলামে মাদানি যুগের মতো জিহাদ ফরজ। এটা আত্মরক্ষামূলক। কিন্তু সেই পরিস্থিতি তো এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়নি।

এখানে জিহাদ করার মতো পরিবেশ আসেনি। ইসলামের নামে কিছু অপকর্ম করে ইসলামের বদনাম করা, নবীর বদনাম করা, বিশ্বের বুকে ইসলামকে একটি সন্ত্রাসী ধর্ম আখ্যায়িত করার অপকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

নয়া দিগন্ত : তাহলে এই জঙ্গিবাদী তৎপরতা কেন হচ্ছে এবং কারা এটা করছে বলে আপনি মনে করেন?

মুফতি মিজান : আমরা মনে করি ইবনে সাবাহর খারেজি ইতিহাস থেকে এ পর্যন্ত ইসলামের নামে যত অন্যায় অপরাধ হয়েছে সবগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু সেই খারেজি দল। যারা হজরত আলী ও মুয়াবিয়া দুইজনকেই কাফের ফতোয়া দিয়েছিল। আসলে এরা ছিল ইহুদিদের পরিচালিত মুসলমান। এই দলটিই মুসলমানদের মধ্যে সাহাবীদের যুগে প্রথম রক্তপাত করেছে। ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন নামে কতগুলো কুরআন-সুন্নাহ বিকৃত আদর্শ-মতামত গ্রহণ করা ছোট বা বড় দলকে লালন পালন করত ইসলামের ক্ষতি করার জন্য। তাই যদি কেউ ইসলামের নামে অপকর্ম করে, জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস করে তাহলে আমার ধারণা এদের পেছনে কোনো ইহুদি চক্রান্ত আছে। ওই ইবনে সাবাহর দল আছে। তাদের ইশারা ইঙ্গিতে কিন্তু বিভিন্ন কায়দায় হয়তো তারা মিসগাইড হয়েছে, তাদেরকে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে অথবা তারা জেনে বুঝে অর্থের লোভে হলেও তাদের পক্ষপাতিত্ব করে মুসলিম দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করে পুরো বিশ্বের মধ্যে মুসলমান ও ইসলামকে কলুষিত করার কাজ করছে। ইসলামকে একটি খারাপ ধর্ম, সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ রকমের কোনো শক্তি তাদের পেছনে আছে বলে আমার ধারণা। সত্যিকারের ইসলাম যারা বুঝেছে, কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা বুঝে যারা আলেম হয়েছে এমন মুসলমানের পক্ষে ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকা- করার কোনো সুযোগ নেই। আমি মনে করি, এই সন্ত্রাসের পেছনে বহির্বিশ্বের কোনো শক্তি আছে।

আসলে কুরআনে যেটা বলা হয়েছে, ইহুদি মুশরিকরা হলো ইসলামের শক্র। এরা যুগে যুগে সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা করেছে। মুসলমানদের মেরে ফেলে দুর্বল করা এবং বিশ্বে নিজেদের নেতৃত্ব দেয়ার কৌশল তারা অবলম্বন করেছে। এ ধরনের কর্মকা-ের শিকার আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনসহ অন্য দেশগুলো। সরাসরি তারা যুদ্ধ করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যে দেশে যুদ্ধের কোনো ইস্যু নেই সেই দেশে মুসলমানদের নষ্ট করার জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে ইহুদিরা। সেটা হলো মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোককে বিভ্রান্ত করে ইসলামের নামে তাদের মাধ্যমে এমন কিছু কর্মকা- করানো যেন মুসলমানরা নিজেরাই ইসলামের কর্মকা-কে সন্ত্রাস মনে করে নিজেরাই বন্ধ করে দেয়। সে দেশে তারা যুদ্ধ না করেও যুদ্ধের ফায়দা আদায় করে নেবে। যেই দেশে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, আফগানিস্তান কাশ্মিরের মতো সমস্যা নেই সেখানে তারা এ কৌশলে কাজ করছে। যেখানে সরাসরি তারা করতে পারছে সেখানে তো সরাসরি করছে। আমি কিন্তু আগেই বলেছি, যেখানে সরাসরি তারা করছে সেখানে কিন্তু তাদের মোকাবেলা করা পবিত্র জিহাদ। তারা যেটা করে সেটা সন্ত্রাস তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এটাও তো বিচিত্র নয় যে, সত্যিকার জিহাদের ব্যাপারে ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ইসলামের নামে একটি শান্তির দেশে জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করা হচ্ছে। যাতে মানুষের মধ্যে জিহাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। এই ঘৃণা সৃষ্টি করে সত্যিকারের জিহাদ যেখানে হচ্ছে (যেমন ফিলিস্তিনে) সেই জিহাদকে কলুষিত করে বন্ধ করে ইহুদিতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ বহু উদ্দেশ্য তাদের থাকতে পারে।

নয়া দিগন্ত : তরুণ সম্প্রদায় উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ কী ?

মুফতি মিজান : আমরা মুসলমানরা এখন তিন ধরনের হয়ে গেছি। এক ধরনের মুসলমান কুরআন হাদিসের শিক্ষা-দীক্ষা করে ভালো মুসলমান। কোনো দিন ইহুদিবাদসহ অন্যদের কোনো প্ররোচনায়, ব্রেইন ওয়াশে এদের নড়াতে পারবে না, এরা ইসলামের ওপর অটল। আরেক ভাগ মুসলমান হয়েও ইসলামকে মানে না, বুঝে না, মানতে চায় না এবং ইসলামের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা নামেই মুসলমান। এই দুই প্রকার মুসলমান তাদের টার্গেট না। টার্গেট হলো এই দুইয়ের মধ্যবর্তী এক প্রকার মুসলমান যারা ইসলাম বুঝতেও চায়, মানতেও চায়, কিন্তু ইসলামের পুরো জ্ঞান তাদের নেই। তারা সেই শিক্ষা পায়নি। এমন যুবকশ্রেণী যারা ইংলিশ মিডিয়ামের মেধাবী ছাত্র, এদের মধ্যে যারা ইসলামকে পছন্দ করছে সেই মুহূর্তে তাদের মিসগাইড করাটাই তাদের উদ্দেশ্য। মাদরাসার ছাত্রদের মিসগাইড করতে পারে না, আলেমকে পারে না। তারা তো ইসলামকে বুঝে পারদর্শী হয়ে আছে। যারা ইসলাম মানে না বা মানার চেষ্টাও করে না তাদের তো এমনি্েতই আর কিছু করার দরকার নেই। যারা এই দুয়ের মাঝখানে আছে তারা বেশির ভাগই তরুণ শ্রেণীর। ওই তরুণরা যারা ইসলামকে একটু একটু ভালোবাসতে শুরু করেছে সেই সময়ে ইসলামের একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে তাদের বিপদগামী করা সহজ। আমার ধারণা এই তরুণ শ্রেণীটা এ কারণেই জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে বেশি আসছে। এরা হয়তো চেয়েছিল আমরা সঠিক ইসলাম বুঝি, মুসলমান হই, আল্লাহর খাঁটি বান্দা হই। এখন আল্লাহর খাঁটি বান্দাহ হওয়ার জন্য, আসল ইসলামকে প্র্যাকটিস করার জন্য তারা বড় বড় আলেমদের কাছ থেকে কুরআন হাদিস শিক্ষা না নিয়ে কিছু বই পড়া আরম্ভ করেছে, কিছু মিডিয়া ধরেছে। মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক ধরনের গ্রুপ ইসলামের নামে বহুকিছু প্রচার করছে। এখন কোনটা যে সঠিক, কোনটা বেঠিক তা বিবেচনা করার মতো তাদের অবস্থা নেই। না থাকার কারণে যা তারা ভালো মনে করছে সে দিকে ধাবিত হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে জঙ্গি তৎরপরতার সাথে কারা জড়িত এবং এ পথে গমনকারীদের ভবিষ্যৎ কী বলে আপনি মনে করেন ?

মুফতি মিজান : বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার সাথে কারা জড়িত এটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুসকিল। আমার ধারণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের শক্রদের কোনো সূক্ষ্ম গোপন সংগঠন দ্বারা পরিচালিত কিছু লোক এটা চালাচ্ছে। বেশির ভাগ ছাত্রজনতা যারা এ কাজে লিপ্ত হচ্ছে তারা হয়তো পরিচালক নায়, তারা পরিচালিত। আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের শিকার হচ্ছে। মূল চাবিকাঠি যারা নাড়ছে বহির্বিশ্বের ইসলামবিদ্বেষী চক্রের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। তারা কারা বা কী এটা আমার জানা নেই। তবে মনে হচ্ছে এমন কিছু আমাদের দেশে হচ্ছে। তা ছাড়া আগে বলা হয়েছিল মাদরাসার ছাত্ররা এর সাথে জড়িত। কিন্তু এখন একাধিক ঘটনায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি কোনো কওমি মাদরাসার আলেম বা ছাত্র জড়িত হয়েছে। এখন জাতি বলছে, বলা হচ্ছিল কি, এখন দেখছি কী? তাহলে সত্যিকারের ইসলামের অনুসারী যারা তারা এই জঙ্গি তৎপরতায় নেই। যারাই আছে তারা বিকৃত মস্তিষ্কের লোক, বিকৃত ধর্মকে সঠিক মনে করে কেউ সেদিকে গেছে। এরা হয়তো এটাকে ইসলামের জিহাদ মনে করে এতে জড়িত হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে মুক্তির উপায় কী?

মুফতি মিজান : আমি মনে করি এই বিপদ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো সরকার, আমাদের জনগণ সবাই ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সত্যিকারের ইসলাম কাকে বলে সেটা সম্প্রচারের জন্য, ঘরে ঘরে পৌঁছানোর জন্য সহযোগিতা করতে হবে। দেশে একটি হক্কানি উলামা কমিটি গঠন করে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা প্রচারের ব্যবস্থা করা উচিত। জঙ্গিবাদ যারা করছে তাদের ব্যাপারে কঠিন হওয়া উচিত। তবে সত্য উদঘাটন করতে হবে। অসত্যকে সত্য বানিয়ে কিছু করতে গেলে কিন্তু দেশের ক্ষতি হবে। অন্য দিকে এদেশ বেশির ভাগ মুসলমানের দেশ। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ইসলামের সঠিক বিষয়গুলো আমরা সিলেবাস করে দিই তাহলে তারা কিন্তু ভুল শিক্ষা পাবে না। শিক্ষায় সঠিক কারিকুলাম না থাকায় তারা বাইরে ইসলাম বুঝতে গিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে। সরকার এটাকে এখনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। এটা নিয়ে আন্দোলনও চলছে। বইয়ের মধ্যে আগে ইসলামের যে বিষয়গুলো ছিল সব বাদ দিয়ে হিন্দু ধর্মের আচার আচরণ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। রাসূল সা: সিরাতের কথা, আবু বকর, ওসমানের আদর্শের কথা বাদ দেয়া হয়েছে। পরিবর্তে সেখানে ইসলামবিদ্বেষীদের কথা আনা হচ্ছে যাতে হয়তো আমাদের ছেলেরা নাস্তিক হয়ে যাবে। এ অবস্থায় এদের মোকাবেলা করতে গিয়ে গরম গরম ইসলাম শিখে মানুষ মিসগাইড হতে থাকবে। এগুলো চলতে থাকবে। সঠিক সমাধান হবে না। সঠিক সমাধান হলো আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে কুরআন সুন্নাহ ইসলামের যে সঠিক ব্যাখ্যা তা প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে সংযুক্ত করা। এটা হবে একটা মৌলিক কাজ।

নয়া দিগন্ত : আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটি মসজিদে নজরদারির সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে জুমার খুতবা তৈরি করে বিতরণ করা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মুফতি মিজান : সরকার খোঁজ খবর দিয়ে দেখুক, আমার জানা মতে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যাবে না যে, কোনো মসজিদে খতিবের বক্তব্যের কারণে কেউ বিপদগামী হয়ে সন্ত্রাসী কাজে হাত দিয়েছে। খতিব কিন্তু মিম্বরে বসে হাজার হাজার মুসল্লির সামনে খুতবা দেয়। সব দলের লোক সেখানে থাকে। খতিবরা সব সময় ইসলামের মৌলিক বিষয় যেমন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করার কথাগুলো বলে থাকে। এই সন্ত্রাসী কর্মকা- দমন করার জন্য হঠাৎ করে খতিবদের নজরদারি কেন আমি বুঝলাম না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন যে খুতবা দিয়েছে তা জায়গায় জায়গায় ভুল। এই ভুলে ভরা খুতবা দিয়ে কী লাভ হবে? আমরা এমনিতেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অনেক আগ থেকেই বলে আসছি।

নয়া দিগন্ত : আপনাকে ধন্যবাদ।

মুফতি মিজান : আপনাকেও।

নয়া দিগন্ত থেকে নেয়ামুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ
সন্ত্রাস লালন ও জড়িত হওয়ার ইতিহাস ইসলামে নেই
আমাদের সময়.কম : ২৫/০৭/২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *