পূর্বসূরি মনীষীদের ব্যতিক্রমধর্মী ঈদ’- মাহফুজ আহমাদ

Shortlink:

ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের নিদর্শনগুলোর অন্যতম। খুশির ঈদ আমরা কীভাবে উদযাপন করব, সে বিষয়ে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা। এখানে আমি সে বিষয়ে আলোচনা করছি না। আমি বরং ঈদ পালনে পূর্বসূরিদের কিছু অভিব্যক্তি, ঘটনা এবং শিক্ষার প্রতি বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। কোনোরকম সংযোজন ছাড়াই আমি হুবহু কিছু বিষয় উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।

প্রকৃত ঈদ
হাসান বসরি (রহ.) বলেন, যেদিন নিজেকে আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারবে, তোমার জন্য সেদিনই ঈদের দিন। বস্তুত মোমিন বান্দা যে দিনটি আপন মাওলার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে অতিবাহিত করল, সে দিনটি তার জন্য মহা আনন্দের দিন। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইবনে রজব হাম্বলি, ১/২৭৮, দারু ইবনে হাজম, প্রথম সংস্করণ ১৪২৪ হি.)।

দৃষ্টি সংযত রাখা
ওয়াকি (রহ.) বলেন, ঈদের দিন আমরা মুহাদ্দিস সুফিয়ান সাওরি (রহ.) এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের সম্বোধন করে বললেন, যে বিষয় দিয়ে আমরা ঈদের দিনটি শুরু করি, তা হলো নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখা। (আল ওয়ারা; ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৬৩, কুয়েত, প্রথম সংস্করণ ১৪০৮ হি.)।
আবু হাকিম বলেন, হাসসান ইবনে আবি সিনান ঈদের নামাজ শেষে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তার স্ত্রী অগত্যা বলে উঠলেন, আজ ক’জন সুন্দরীর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ? প্রত্যুত্তরে হাসসান বললেন, দূর যা! ঘর থেকে বের হওয়া থেকে নিয়ে তোমার কাছে ফিরে আসা পর্যন্ত আমার দৃষ্টি পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির দিকেই ছিল, চোখ তুলে কোনোদিকে তাকাইনি। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৪)।

পরদেশে ঈদ
হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের প-িত আবুল মুতাররিফ আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান আল কানাজিয়ি আল কুরতুবি (রহ.) বলেন, একবার ঈদের সময় আমি মিশরে ছিলাম। নামাজ শেষে সবাই যার যার নীড়ে চলে গেল আর আমি নীলনদ অভিমুখে রওনা হলাম। খাওয়ার মতো আমার কাছে কিছু ছিল না, শুধু একটি থলেতে কিছু তুরমুস (গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত গুল্মবিশেষ) অবশিষ্ট ছিল। নদীর পাড়ে বসে আমি এগুলো খেতে লাগলাম। খাচ্ছি, ছোলাগুলো নিচের দিকে নিক্ষেপ করছি আর মনে মনে ভাবছি, দেখ তো! আজ ঈদের এই দিনে পুরো মিশরে আমার থেকে দুরবস্থায় আর কি কেউ আছে? এসব ভাবতে ভাবতে যখন মাথা তুলে নিচের দিকে তাকালাম, দেখতে পেলাম একজন আমার নিক্ষেপ করা ছোলাগুলো উঠিয়ে মুখে দিচ্ছে! আমার বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। আমি হৃদয় থেকে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। (আল মুগরিব; ইবনে সাঈদ আল মাগরিবি : ১/১৭১, দারুল মাআরিফ, কায়রো, তৃতীয় সংস্করণ ১৯৫৫ ঈ.)।

নামের সঙ্গে ঈদ
মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত মহান একজন ফকিহের নামের সঙ্গে ঈদ শব্দটি যুক্ত আছে। তিনি হলেন ইমাম ইবনু দাকিকিল ঈদ (রহ.)। এটি মূলত বড় বড় কয়েকজন জ্ঞান তাপসের পারিবারিক নাম। সর্বপ্রথম যিনি এই উপনামে পরিচিত হয়েছিলেন, তিনি হলেন ইমাম ওয়াহব ইবনে মুতি আল কোশাইরি আল মানফালুতি (রহ.)। তিনি ছিলেন খুব সুন্দর এবং শুভ্র দাড়ির অধিকারী। একবার তিনি সাদা একটি রুমাল পরে যখন ঈদগাহে গেলেন, তাকে দেখে লোকরা বলতে লাগল, আপনি তো ঈদের (মিষ্টান্ন তৈরির) ‘দাকিক’ বা আটার মতো (শুভ্র ও সুন্দর) হয়ে গেলেন! পরে এই দাকিকিল ঈদ উপনামটি তার এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল। তবে এই নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন তার নাতি প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে ওয়াহব আল কোশাইরি (রহ.)। বস্তুত হাদিস, ফিকহ ও ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থে সাধারাণভাবে ‘ইবনে দাকিকিল ঈদ’ বলে তাকেই বোঝানো হয়। (জায়লুত তাকয়িদ; মুহাম্মাদ আল ফাসি : ১/৩৫৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ ১৪১০ হি.)।

ঈদ ও কেয়ামত
আল্লামা ইবনুল জাওজি (রহ.) কতইনা সুন্দর লিখেছেন, ঈদের দিনে লোকদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এটাকে কেয়ামতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কেননা লোকরা ঈদের দিন ভোর সকালে ঘুম থেকে জেগে ঈদগাহের দিকে ছুটতে থাকে; তেমনি কেয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে সবাই হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। ঈদের দিন কারও পোশাক ও গাড়ি থাকে খুব উন্নতমানের, কারও থাকে মাঝারি মানের আবার কারও থাকে একেবারে নিম্নমানের; তেমনি কেয়ামতের দিন মানুষের স্তর হবে ভিন্ন ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে দিন দয়াময়ের কাছে পরহেজগারদের অতিথিরূপে সমবেত করব।’ (সূরা মরিয়ম : ৮৫)। অর্থাৎ আরোহী অবস্থায়। তারপর আল্লাহ বলেন, ‘এবং অপরাধীদের পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।’ (সূরা মরিয়ম : ৮৬)। অর্থাৎ তৃষ্ণার্ত অবস্থায়। এক বর্ণনায় রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে লোকদের সমবেত করা হবে, কেউ আরোহী অবস্থায়, কেউ হেঁটে আবার কেউ উপুড় অবস্থায়।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৪২৪)।
ঈদের দিন ভিড়ের কারণে মানুষ পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়; তেমনি কেয়ামতের দিনে জালেমদের মানুষ পা দিয়ে পিষ্ট করবে। ঈদের দিন কোনো মানুষ থাকে ধনী এবং দানকারী; তেমনি কেয়ামতের দিন দুনিয়ার দানশীলরা ওখানেও দানশীল প্রমাণিত হবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ থাকবে ভিক্ষুক ও (নেকির) মুখাপেক্ষী। ঈদের দিন লোকরা নামাজ শেষে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঘরে আসে, ফুর্তি করে, অন্যদের জানায় যে, এরা সব তার বন্ধু; তেমনি কেয়ামত দিবসে মানুষ নিজের আমলের পুরস্কার পেয়ে পুলকিত হয়ে নিজ জান্নাতে ফিরবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ খালি হাতে শূন্য ঘরে ফিরবে। সুতরাং বুদ্ধিমানদের জন্য উচিত হলো এসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। (সায়দুল খাতির; ইবনুল জাওজি, পৃ. ৪৮০-৪৮১, দারুল কলম, দামেস্ক, প্রথম সংস্করণ ১৪২৫ হি.)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *