খুতবার ভাষা আরবী হওয়াই সুন্নাহ লিখক- ‍সাইফুর রহমান

Shortlink:

খুতবা সংক্রান্ত বিষয় গুলোর মধ্যে যে সমস্ত পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করা হবে তার HIGHLIGHTS দেখুন !!!
.
.
১// খুতবা শুনা ওয়াজিব হওয়া মর্মে কোন দলিল আছে কি?
.
২// স্থানীয় ভাষায় খুৎবা প্রদানঃ একটি দালীলিক পর্যালোচনা !
.
৩// আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় জুমআর খুতবা দেয়া বিদআত !
.
৪// জুমআর মূল খুতবার আগে বাংলায় প্রচলিত বয়ান করা কি বিদআত?
.
৫// ঈদের খুৎবা নামাযের পর হয়, জুমার খুৎবা নামাযের পূর্বে কেন?
.
৬// খুতবা দেয়ার সময় সুন্নত পড়াঃ আসলেই সহীহ হাদীসের বিরুদ্ধে লাল বাতি জ্বালানো হয়?
.
৭// খুতবা চলাকালীন সময়ে তাহইয়াতুল মসজিদ, কথা বলা ইত্যাদি নিষেধের দলিল !
.
৮// দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার দলিল !
.
৯// দুই খুতবার মাঝে বসার দলিল !
.
১০// ঈদের নামাযের পর দুই খুতবা দেয়ার দলিল !
.
১১// ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়া সুন্নাত !
.
.
এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক !
.
.
খুতবা শুনা ওয়াজিব হওয়া মর্মে কোন দলিল আছে কি?
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
খুৎবা শুনা আবশ্যক হওয়া মর্মে অনেক প্রমাণ আছে। এর মাঝে দু’টি উপস্থাপন করছি। হাদীসের গ্রন্থগুলোর সালাত অধ্যায় ভাল করে অধ্যয়ন করলে আপনি আরো প্রমাণ নিজেই বের করে নিতে পারবেন।
.
أن أبا هريرة أخبره أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إذا قلت لصاحبك يوم الجمعة أنصت والإمام يخطب فقد لغوت (صحيح البخارى-كتاب الجمعة، باب الإنصات يوم الجمعة والإمام يخطب، رقم الحديث-892
.
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন-রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যখন তুমি তোমার পাশের জনকে জুমআর দিন বল-চুপ থাক এমতাবস্থায় যে, ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছে, তাহলে তুমি অযথা কাজ করলে। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৮৯২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৫}
.
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: دَخَلَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ الْمَسْجِدَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ، فَجَلَسَ إِلَى جَنْبِهِ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ أَوْ كَلَّمَهُ بِشَيْءٍ فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ أُبَيٌّ، فَظَنَّ ابْنُ مَسْعُودٍ أَنَّهَا مَوْجِدَةٌ، فَلَمَّا انْفَتَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ صَلَاتِهِ، قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ: يَا أُبَيُّ، مَا مَنَعَكَ أَنْ تَرُدَّ عَلَيَّ؟ قَالَ: إِنَّكَ لَمْ تَحْضُرْ مَعَنَا الْجُمُعَةَ، قَالَ: لِمَ؟ قَالَ: تَكَلَّمْتَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ، فَقَامَ ابْنُ مَسْعُودٍ فَدَخَلَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَدَقَ أُبَيٌّ أَطِعْ أُبَيًّا»
.
হযরত জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রাঃ মসজিদে প্রবেশ করলেন এমতাবস্থায় যে, রাসুল সাঃ খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন তিনি হযরত উবাই বিন কাব রাঃ এর পাশে এসে বসলেন। বসে উবাইকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন বা কোন বিষয়ে কথা বললেন। কিন্তু উবাই তার কথার কোন প্রতিউত্তর করলেন না। তখন ইবনে মাসঊদ রাঃ মনে করলেন তিনি হয়তো তার উপর রাগাম্বিত। তারপর যখন রাসূল সাঃ নামায শেষ করে চলে গেলেন। তখন ইবনে মাসঊদ বললেন, হে উবাই! আমার কথা জবাব দিতে তোমাকে বাঁধা দিল কে? তিনি বললেন, তুমি আমাদের সাথে জুমআর নামাযে উপস্থিত হওনি। ইবনে মাসঊদ রাঃ বললেন, তো? উবাই রাঃ বললেন, তুমি কথা বলছিলে আর রাসূল সাঃ তো তখন খুতবা দিচ্ছিলেন। [তাই কথার জবাব দেইনি]
.
একথা শুনে আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ দাড়িয়ে গেলেন। ছুটে গেলেন রাসূল সাঃ এর কাছে। জানালেন পুরো বিষয়টি। তখন রাসূল সাঃ বললেন, উবাই ঠিক কথাই বলেছে। তুমি এ বিষয়ে উবাই এর কথাকে মেনে নাও। [মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-১৭৯৯]
.
এ হাদীসটি সহীহ।
.
এছাড়া আরো অনেক হাদীস আছে, যা প্রমাণ করে ইমামের খুতবাদানকালে কথা বলা, নামায পড়া নিষিদ্ধ। অর্থাৎ সে সময় কথা না বলে খুতবা মনযোগ সহকারে শুনতে হয়।
:
:
স্থানীয় ভাষায় খুৎবা প্রদানঃ একটি দালীলিক পর্যালোচনা
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় খুতবা প্রদান করা বিদ’আত ও মাকরূহে তাহরীমি। কারণ তা রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন এবং গোটা মুসলিম উম্মাহর সর্বযুগে সর্বসম্মত আমলের পরিপন্থী। জুমু’আর নামাযের আগে নবী করিম (সা.) দুটি খুতবা দিতেন। দুই খুতবার মাঝখানে অল্প সময় বসতেন। (মুসলিম শরীফ, ১/২৮৩, হাদীস-১৪২৬) রাসূল (সা.)-এর উভয় খুতবা সর্বদাই আরবী ভাষায় হতো।
.
অতএব, দুই খুতবা আরবী ভাষায় হওয়া সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। জুমু’আর দিন খুতবার আগে স্থানীয় ভাষায় যে দ্বীনি আলোচনা করা হয়, তা খুতবায়ে মাসনুনাহ বলে গণ্য হবে না। কিছু কিছু মানুষ এই দ্বীনি আলোচনাকেও জুমু’আর খুতবা মনে করেন। তাঁদের ধারণা সঠিক নয়। খুতবা আরবী ভাষাতেই হতে হবে, তার প্রমাণসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
.
খুতবা আরবী ভাষায় দেওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবেতাবেঈনসহ আজ পর্যন্ত উম্মতের ধারাবাহিক আমল। অতএব তার বিপরীত আমল করা বিদ’আত ও মাকরূহে তাহরীমি তথা নাজায়েয।
.
উপমহাদেশের বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহ.) তাঁর রচিত মুয়াত্তায়ে মালেকের ব্যাখ্যা গ্রন্থ মুসাফফায় উল্লেখ করেনঃ
.
لما لا حظنا خطبة النبى صلى الله عليه وسلم وخلفائه رضى الله عنهم وهلم جرا فنجد فيها وجوذ اشياء، منها الحمد والشهادتان والصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم والامر بالتقوى وتلاوة آية والدعاء للسملمين والمسلمات وكون الخطبة عربية
.
অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা.), খুলাফায়ে রাশেদীন, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন এবং পরবর্তী যুগের ফুকাহায়ে কেরাম ও উলামায়ে দ্বীনের খুতবাসমূহ লক্ষ করলে দেখা যায় যে তাঁদের খুতবায় নিম্নের বিষয়গুলো ছিল।
যথা :
আল্লাহ তাআলার হামদ, শাহাদাতাইন (অর্থাৎ তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা) রাসূল (সা.)-এর প্রতি দরূদ, তাকওয়ার আদেশ, পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত, মুসলমানদের জন্য দু’আ। তাঁরা সকলেই আরবী ভাষায় খুতবা দিতেন। গোটা মুসলিম বিশ্বের বহু অঞ্চলের ভাষা আরবী নয়, তবুও সর্বত্র আরবী ভাষায়ই খুতবা দেওয়া হতো। (মুসাফফা, ১/১৫৪)
.
সুতরাং রাসূল স., খুলাফায়ে রাশেদীন, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনের খুতবার উপর ভিত্তিকরে ফুকাহায়ে কিরাম বলেন- খুতবাতে নিম্নের বিষয়গুলো থাকা সুন্নাত।
যথা:
.
১. হামদ ২.সানা ৩.শাহাদাতাইন ৪.রাসূল স. এর উপর দরুদ ৫.তাকওয়ার আদেশ মূলক কুরআনের আয়াত ৬.আরবী ভাষায় ওয়াজ নসীহত ৭.দুই খুতবার মাঝে বসা ৮.দ্বিতীয় খুতবায় পুনরায় হামদ, সানা, শাহাদাতাইন ও দরুদ পাঠ করা। ৯.সকল মুসলমানদের জন্য দুআ করা। ১০.উভয় খুতবা নামাযের তূলনায় সংক্ষিপ্ত হওয়া ইত্যাদি।
.
ফিক্হ ও ফাতওয়ার গ্রন্থ থেকে উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রমাণ
.
আল্লামা কাসানী র. বলেন-
.
ينبغي أن يخطب خطبة خفيفة يفتتح فيها بحمد الله تعالى ويثني عليه ويتشهد ويصلي على النبي ويعظ ويذكر ويقرأ سورة ثم يجلس جلسة خفيفة ثم يقوم فيخطب خطبة أخرى يحمد الله تعالى ويثني عليه ويصلي على النبي ويدعو للمؤمنين والمؤمنات . (بدائع الصنائع: ১/৫৯১)
.
আল্লামা শামী র. বলেন-
.
قوله ( ويبدأ ) أي قبل الخطبة الأولى بالتعوذ سرا ثم بحمد الله تعالى والثناء عليه والشهادتين والصلاة على النبي والعظة والتذكير والقراءة قال في التجنيس والثانية كالأولى إلا أنه يدعو للمسلمين مكان الوعظ. (رد المحتار : ৩/২১)

وكذا في البحر الرائق: ১/২৫৮ ، فتح القدير : ২/৫৭ ،الفتاوي الهندية : ১/১৪৬-৪৭ ،حاشية الطحطاوي علي مراقي الفلاح : ص৫১৫.
.
খুতবার পরিমাণ:-
.
আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে সূরা জুমার ৯ম আয়াতে খুতবাকে ‘যিকির’ বলেছেন। এই যিকির নামক খুতবার পরিমাণ কতটুকু তা নিয়ে ইমাম আবু হানিফা র., ইমাম আবু ইউসফ র. ও ইমাম মুহাম্মদ র. এর মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে।
.
ইমাম আবু হানিফা র. বলেন, খুতবাতে শুধু যিকির পাওয়া যাওয়াই শর্ত। অর্থাৎ কেউ যদি খুতবাতে শুধু যিকির করে অর্থাৎ শুধু আলহামদু লিল্লাহ বা সুবহানাল্লাহ বলে খুতবা শেষ করে, তাহলে তার নামায সহীহ হয়ে যাবে। তবে এটা মাকরূহ।
.
ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ র. বলেন, খুতবাতে লম্বা আলোচনা তথা: আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা, সানা, শাহাদাতাইন, রাসূল স. এর উপর দরুদ ইত্যাদি থাকা জরুরী। যার উপর খুতবা শব্দের প্রয়োগ করা যায়। তাঁরা আরো বলেন, খুতবা কমপক্ষে তাশাহহুদ পরিমাণ দীর্ঘ হওয়া জরুরী ।
.
আল্লামা শামী র. বলেন-
.
وكفت تحميدة أو تهليلة أو تسبيحة ) للخطبة المفروضة مع الكراهة وقالا لا بد من ذكر طويل وأقله قدر التشهد الواجب. (الدر المختار : ৩/২০)
.
অর্থ: ইমাম আবু হানিফা র.-এর মতে শুধু আলহামদু লিল্লাহ বা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বা সুবাহানাল্লাহ বলার দ্বারাই খুতবার ফরযিয়্যাত আদায় হয়ে যাবে। তবে এটা মাকরূহ। আর ইমাম আবু ইউসুফ র. ও ইমাম মুহাম্মদ র. বলেন, খুতবা তাশাহহুদ পরিমাণ দীর্ঘ হওয়া জরুরী।
.
আল্লামা কাসানী র. বলেন-
.
وصح الاقتصار في الخطبة علي ذكرخالص لله تعالي نحو تسبيحة أو تحميدة أو تهليلة او تكبيرة مع الكراهة لترك السنة عند الامام وقالا: لابد من ذكر طويل يسمي خطبة واقله قدر التشهد. (حاشية الطحطاوي: ص৫১৩، وكذا في البدائع: ১/৫৯০)
.
এমন মনে করা ঠিক নয় যে, রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের যুগে অনারবী ভাষায় খুতবা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ যামানায় দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,
.
وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا
.
অর্থ : ‘আর আপনি দেখবেন লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে।’ (সূরা নাছর, আয়াত-২)
.
উক্ত আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে বিভিন্ন ভাষার মানুষ নামায আদায় করত। খুতবা ছাড়া দ্বীনি শিক্ষার অন্য কোনো মাধ্যমও তেমন ছিল না। তার পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্য ভাষায় খুতবা অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি। তদ্রƒপ সাহাবীগণের যুগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সম্পর্কে বুখারী শরীফ ১/১৩ তে বর্ণিত আছে, তিনি নিজের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য দোভাষী ব্যবহার করতেন। তবুও তিনি স্থানীয় ভাষায় খুতবা দেওয়া বা খুতবার অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি। খুতবাকে দুই রাক’আত নামাযের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। তাই নামাযে যেমন ক্বেরাত আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় আদায় করা যায় না, খুতবাও আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় দেওয়া যাবে না।
.
আল্লামা আবু বকর ইবনে শাইবা (রহ.) উল্লেখ করেন,
.
عن عمر بن الخطاب أنه قال: إنما جعلت الخطبة مكان الركعتين
.
অর্থ: হযরত উমর (রা.) বলেন, জুমু’আর খুতবাকে দুই রাক’আত নামাযের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, হাদীস-৫৩২৪)
.
অন্যত্র হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে,
.
عن عمر بن الخطاب قال: كانت الجمعة اربعا فجعلت ركعتين من أجل الخطبة
.
অর্থ: হযরত উমর (রা.) বলেন, জুমু’আর নামায চার রাক’আত ছিল। এরপর খুতবার কারণে দুই রাক’আত করা হয়েছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, হাদীস-৫৩৩১)
.
ইমাম বায়হাকী (রহ.) আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থে ৫৭০৩ নং হাদীসে উল্লেখ করেন,
.
كانت الجمعة اربعا فجعلت الخطبة مكان الركعتين
.
অর্থ : জুমু’আর নামায চার রাক’আত ছিল। খুতবাকে দুই রাক’আতের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।
.
পবিত্র কোরআনে খুতবাকে যিকর বলা হয়েছে।
.
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন.
.
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (৯)
.
অর্থ : হে মুমিনগণ, যখন জুমু’আর দিনে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনগণ লিখেছেন, এখানে ‘যিকর’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘খুতবা’। এ ব্যাপারে নিম্নে কয়েকটি তাফসীরের উদ্ধৃতি পেশ করা হলো :
.
১। তাফসীরে রুহুল মাআনী, খ- ১৩, পৃষ্ঠা ৭০২-এ উল্লেখ আছে,
.
والمراد بذكر الله الخطبة الصلاة
.
অর্থ: আল্লাহর যিকর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, খুতবা ও নামায।
.
২। ইমাম রাযী (রহ.) আত-তাফসীরুল কাবীর গ্রন্থে লেখেন, (খ- ৯, পৃষ্ঠা ৩০)
.
الذكر هو الخطبة عند الأكثر من اهل التفسير
.
অর্থ : অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকট যিকর দ্বারা খুতবা উদ্দেশ্য।
.
৩। আহকামুল কোরআন খ-৩, পৃষ্ঠা ৫৯৬-এ বর্ণিত আছে,
.
ويدل على ان المراد بالذكر ههنا الخطبة، ان الخطبة هى اللتى تلى النداء، وقد امر بالسعى اليه
.
অর্থ : যিকর থেকে যে খুতবাই উদ্দেশ্য, তার প্রমাণ আল্লাহ তা’আলা বলেন, আযান হলে যিকিরের দিকে আসো। আর আযানের সাথে সাথে খুতবাই প্রদান করা হয়।
.
৪। তাফসীরে ইবনে কাসীরে খ- ৯, পৃষ্ঠা ৪৫৬-এ উল্লেখ আছে,
.
فان المراد من ذكر الله الخطبة
.
অর্থ : আল্লাহর যিকর দ্বারা খুতবাই উদ্দেশ্য। হাদীস শরীফেও খুতবাকে ‘যিকর’ বলা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
.
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنِ اغْتَسَلَ يَوْمَ الجُمُعَةِ غُسْلَ الجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً، وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الخَامِسَةِ، فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ حَضَرَتِ المَلاَئِكَةُ يَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ
.
অর্থ : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জুমু’আর দিন জানাবাতের গোসল করে সর্বপ্রথম রওনা হলো, সে যেন একটি উট কোরবানী করল। দ্বিতীয় পর্যায়ে যে ব্যক্তি উপস্থিত হলো, সে যেন একটি গরু কোরবানী করলো। তৃতীয় নম্বরে যে উপস্থিত হলো, সে যেন একটি বকরি কোরবানী করল। চতুর্থ নম্বরে যে ব্যক্তি উপস্থিত হলো, সে যেন একটি মুরগি সদকা করল। পঞ্চম নম্বরে যে উপস্থিত হলো, সে যেন একটি ডিম সদকা করল। এরপর যখন ইমাম (খুতবার) জন্য বের হয়ে আসেন, ফেরেশতারা উপস্থিত হন, তাঁরা মন দিয়ে যিকর (খুতবা) শ্রবণ করেন।
(বুখারী শরীফ, ১/১২৭, হাদীস-৮৩২, মুসলিম শরীফ, হাদীস-১৪০৩, তিরমিযী শরীফ, হাদীস-৪৫৯, নাসায়ী শরীফ, হাদীস-১৩৭১, আবু দাউদ শরীফ, হাদীস-২৯৭)
.
ফুকাহায়ে কেরামও খুতবাকে যিকর বলেন।
.
যেমন শামছুল আইম্মা সারাখছী (রহ.) বলেন
.
ولنا ان الخطبة ذكر
.
অর্থ : আমাদের নিকট খুতবা একটি বিশেষ যিকর। (আল-মাবসুত, ২/৪২) যখন এ কথা প্রমাণিত যে, খুতবা একটি বিশেষ যিকর, আর যিকর আরবী ভাষাতেই হতে হয়, তাই খুতবাও আরবীতেই হতে হবে। ‘খুতবা নামাযের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ কারণেই হাদীস শরীফে খুতবার জন্য এমন কিছু শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, যা শুধু নামাযের জন্য প্রযোজ্য।
.
যেমন :
.
ক) নামাযের জন্য যেমন ওয়াক্ত নির্ধারিত রয়েছে, খুতবার জন্যও ঠিক ওই ওয়াক্তই নির্ধারিত। ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বে বা পরে খুতবা দিলে তা সহীহ হয় না।
.
খ) জুমু’আর নামাযে যেমন ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত রয়েছে, জুমু’আর খুতবার জন্যও তদ্রƒপ ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত রয়েছে।
.
গ) নামাযের জন্য যেমন পবিত্রতা শর্ত, তদ্রƒপ খুতবার জন্যও পবিত্রতা জরুরি। ওজুবিহীন খুতবা দেওয়া মাকরূহ। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে নাজায়েয।
.
ঘ) নামাযের পূর্বে ইকামত দিতে হয়, তদ্রƒপ খুতবার পূর্বে আযান দিতে হয়।
.
ঙ) নামাযের মধ্যে সালাম-কালাম করা যায় না । খুতবাতে ও সালাম-কালাম করা যায় না। নামাযে কারো হাঁচির উত্তর দেওয়া যায় না, সালামের জবাবও দেওয়া যায় না। তেমনিভাবে খুতবাতেও কারো হাঁচি ও সালামের জবাব দেওয়া যায় না।
.
চ) নামায যেমন দাঁড়িয়ে পড়া হয়, খুতবাও তেমনি দাঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হাদীস শরীফে আরো উল্লেখ আছে, ইমাম সাহেব যখন খুতবা দেওয়ার জন্য হুজরা থেকে বের হবেন, তখন কোনো নামায ও কথাবার্তা বলা নিষেধ। (আবু দাউদ শরীফ, ১১১২)
.
অন্যত্র বর্ণিত আছে, জুমু’আর দিন ইমামের খুতবা প্রদানকালে যদি কেউ অন্যকে বলে, চুপ করো, তবে সেটাও অন্যায় হবে।
(নাসায়ী শরীফ, হাদীস – ১৪০১, আবু দাউদ, হাদীস-১১১২)
.
যেহেতু খুবতা নামাযের মতো, অতএব নামাযে যেমন আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করা জায়েয নেই, তদ্রƒপ খুতবার মধ্যেও আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করা জায়েয হবে না। খুতবা ইসলামের একটা প্রতীক। অর্থাৎ আযান, ইকামত, নামায, তাকবীর এগুলো যেমন ইসলামের প্রতীক, তেমনি খুতবাও একটি প্রতীক। আযান-ইকামত যেমন অন্য ভাষায় দেওয়া যায় না, তেমনি খুতবাও অন্য ভাষায় দেওয়া যাবে না। ‘আরবী ভাষা মুসলমানদের ধর্মীয় ভাষা। এ ভাষা শিক্ষা করা ফরজে কেফায়া। কারণ কোরআন-হাদীস বোঝা আমাদের কর্তব্য । কোরআন-হাদীস বোঝার জন্য আরবী জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এই আরবী শেখার প্রতি উৎসাহিত করার জন্য আরবীতে খুতবা দেওয়া হয়। একজন আরবী না জানা ব্যক্তির সামনে যখন প্রতি সপ্তাহে আরবীতে খুতবা দেওয়া হবে, তখন তার সামনে নিজের অক্ষমতা বারবার স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। যা তাকে আরবী শিখতে উৎসাহিত করবে।
.
আরবী ভাষায় খুতবা জরুরি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, পুরো মুসলিম উম্মাহর মাঝে তাওহীদ ও ঐক্যের প্রতীক হলো খুতবা। মুসলমান পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, প্রতি জুমু’আয় আরবী ভাষার খুতবা তাদের মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ করবে। সব জায়গায় যদি নিজ নিজ মাতৃভাষায় খুতবা হতে থাকে, তাহলে কোনো এলাকায় আগন্তুক ব্যক্তি অন্যান্য বিষয়ের মত ইবাদতেও নিজেকে একজন অপরিচিত ভাবতে থাকবে। ‘খুতবা আরবীতে হওয়ার আরেকটি হিকমত হলো, ভাষার প্রভাব সর্বত্র বিরাজমান। শাইখুল ইসলাম আল্লামা হাফেয ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর কিতাব ‘ইকতেযা-উস-সিরাতিল মুসতাকীম’ ১/৪২৪-এ উল্লেখ করেন,
.
واعلم ان اعتياد اللغة يؤثر فى العقل والخلق، والدين تأثير قويا بينا
.
অর্থ: জেনে রাখা উচিত যে, কোনো বিশেষ ভাষায় অভ্যস্ত হওয়া চিন্তাচেতনা, আখলাক-চরিত্র ও দ্বীন-ধর্মের মধ্যে শক্তিশালী ও স্পষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এ জন্য রাজা-বাদশাহগণ তাঁদের দেশে নিজ নিজ ভাষার প্রচলন করার চেষ্টা করেন। আর সে কারণেই যেসব এলাকা সাহাবীদের হাতে বিজিত হয়েছে, সেগুলো আজ মামালেকে আরাবিয়া তথা আরব দেশ বলে গণ্য হয়ে আসছে। কেননা, সেসব দেশে যখন সব বিষয়ে আরবী ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তখন সবাইকে বাধ্য হয়েই আরবী ভাষা শিখতে হয়েছে। সাহাবীদের পরে যেসব এলাকা বিজিত হয়েছে, সেগুলো আরব দেশ বলে গণ্য হয়নি। সাহাবীগণ তাঁদের শত বছরের ইতিহাসে কোনো দিন আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেননি। সাহাবীদের যুগে বহু অনারব দেশ বিজয় হয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্বে এসেছিল, যেগুলোর অনেক স্থানেই ভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। তখন দ্বীনের তাবলীগ ও মাসলা-মাসায়েলের তালীম দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থানীয় ভাষায় জুমু’আর খুতবা প্রদানের প্রয়োজন ছিল বেশি।
.
কেননা, খুতবা ছাড়া মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা-দীক্ষার জন্য কোনো কিতাবাদী রচিত হয়েছিল না। তখন বেশ কিছু সাহাবী ও তাবেয়ী অনারবী বিভিন্ন ভাষায় অত্যন্ত দক্ষও ছিলেন। তবুও তাঁরা আরবী ভাষাতেই খুতবা প্রদান করতেন। এমনকি হযরত সালমান ফারসী (রা.) তাঁর মাতৃভাষা ফারসী হওয়া সত্ত্বেও পারস্যের এক যুদ্ধে সেনাপতি থাকাকালে সেখানকার ফারসী ভাষাভাষী লোকদের সাথে আরবীতে কথা বলেছেন। দোভাষী তার অনুবাদ করেছে। একপর্যায়ে দোভাষীর অনুবাদ যথার্থ না হওয়ার আশংকায় হযরত সালমান ফারসী (রা.) নিজেই কোরআন শরীফের একটি বাক্যের ফারসী অনুবাদ করেন ।
( তিরমিযী শরীফ, হাদীস-১৫৪৮)
.
এ হাদীস দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবীগণ শুধুমাত্র জুমু’আর খুতবাই নয়, বরং যে সকল স্থানে বিপক্ষের নিকট মুসলমানদের মর্যাদা প্রকাশের বিষয় জড়িত ছিল, সেখানে আরবী ভাষাই ব্যবহার করতেন।
.
সারকথা, রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবেতাবেঈনের যামানা হতে আজ পর্যন্ত উম্মতের ধারাবাহিক আমল হলো আরবী ভাষায় খুতবা প্রদান করা। তাঁরা কখনো আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেননি। সুতরাং আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেওয়া বা আরবীতে খুতবা পাঠ করে নামাযের পূর্বে অন্য ভাষায় তার অনুবাদ করা বিদ’আত ও নাজায়েয।
যেমন নিম্নক্ত কিতাব গুলোতে উল্লেখ আছে,
.
ولا شك فى ان الخطبة بغير العربية خلاف السنة المتوارثة من النبى والصحابة، فيكون مكروها تحريما
.
অর্থ: অনারবী ভাষায় খুতবা দেওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের ধারাবাহিক সুন্নাত আমলের পরিপন্থী। অতএব, তা মাকরূহে তাহরীমি হবে। (উমদাতুর রিআয়া, ১/২০০, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ১২/৩৫৮, আহসানুল ফাতাওয়া, ৪/১৫০, জাওয়াহিরুল ফিক্বহ, ১/৩৫২)
.
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
.
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ، فَهُوَ رَدٌّ
.
অর্থ: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মে নেই এমন বিষয় ধর্মীয় বিষয় বলে আবিষ্কার করে, তা পরিত্যাজ্য।
(বুখারী শরীফ, হাদীস-২৪৯৯, মুসলিম শরীফ, হাদীস-৩২৪২, ইবনে মাযাহ শরীফ, হাদীস-১৪, আবু দাউদ শরীফ, হাদীস-৩৯৯০)
.
হযরত ইরবায বিন সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,
.
مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ (২) بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ “
.
অর্থ : তোমাদের মাঝে আমার পর যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতভেদ দেখবে। তখন তোমাদের ওপর আমার এবং আমা র হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা জরুরি। সেটিকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে রাখবে। আর সাবধান থাকবে, নব উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয় থেকে। কেননা, ধর্ম বিষয়ে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদ’আত। আর প্রতিটি বিদ’আতই গোমরাহী। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস-১৬৫২১)
.
খুতবার পূর্বে বয়ানের শরয়ী হুকুমঃ
.
প্রথম আযানের পূর্বে বা পরে এবং ছানী আযানের অবশ্যই পূর্বে ওয়াজ-নসীহত করা বৈধ। হযরত সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে তা প্রমাণিত আছে।
.
عَاصِمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى جَانِبِ الْمِنْبَرِ فَيَطْرَحُ أَعْقَابَ نَعْلَيْهِ فِي ذِرَاعَيْهِ ثُمَّ يَقْبِضُ عَلَى رُمَّانَةِ الْمِنْبَرِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَقُولُ فِي بَعْضِ ذَلِكَ: وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فَإِذَا سَمِعَ حَرَكَةَ بَابِ الْمَقْصُورَةِ بِخُرُوجِ الْإِمَامِ جَلَسَ. هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ
.
অর্থ : আসেম (রহ.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, জুমু’আর দিন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জুতা খুলে মিম্বরের পাশে দাঁড়িয়ে মিম্বর ধরে বলতেন, আবুল কাসেম (সা.) বলেন, মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেন, সাদেক মাসদুক (সা.) বলেন, ধ্বংস আরবদের জন্য, ওই ফিতনার কারণে, যা নিকটবর্তী…। এরপর যখন ইমাম সাহেবের বের হবার আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি বসে যেতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/১৯০, হাদীস-৩৩৮)
.
عَنْ أَبِي الزَّاهِرِيَّةِ، قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا مَعَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُسْرٍ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَمَا زَالَ يُحَدِّثُنَا حَتَّى خَرَجَ الْإِمَامُ
.
হযরত আবদুল্লাহ বিন বুছর (রা.) জুমু’আর দিন প্রথমে ওয়াজ করতেন। যখন খতীব খুতবার জন্য আগমন করতেন, তখন তিনি ওয়াজ বন্ধ করতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/২৮৮, হাদীস-১০১২)
.
হযরত তামীম দারী (রা.) হযরত উমর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে খুতবার পূর্বে ওয়াজ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, ৩১/৩৩১, হাদীস-১৫১৫৭)
.
কিন্তু সাহাবীগণ কেউ জুমু’আর পূর্বের এ বয়ানকে খুতবা বা খুতবার অংশ গণ্য করতেন না। বরং এরপর দুটি খুতবা দেওয়া হতো।
.
উসুলে ফিকাহ্-এর আলোকেঃ
.
উসুল ফিকাহ্-এর মূলনীতির আলোকে আরবি ভাষায় খোৎবা অকাট্য ও অলঙ্ঘনীয় সুন্নাত। কেনান মহানবী (সা.) খোলাফায়ে রাশেদীন, অন্যান্য সাহাবা, তাবেঈন- তবে তাবেঈন সকল মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফুকাহায়ে কিরাম র. ধারাবাহিকভাবে আরবী ভাষাতেই খুতবা দিয়ে আসছেন। কাজেই আরবী ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় খুতবা দেয়া শরীয়ত পরিপন্থী ও বিদআত বলে বিবেচিত হবে। (আহসানুল ফাতওয়া: ৪/১৫৪)
.
অর্থাৎ গোটা ইসলামের সোনালী যুগ থেকে সর্বাদা আরবি ভাষায় খোৎবা দান করা হতো বিধায়, এটি সুন্নাতে নববী, সুন্নাতে খোলাফায়ে রাশেদীন, সুন্নতে আইম্যায়ে মুজতাহেদীন , সুন্নাতে মুতাওয়াতেরা (নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিক সুন্নাত) ও সুন্নাতে মুতাওয়ারেছাহ (বা যুগপরম্পরা সুন্নাত)।সূতরাং এর বিপরীত চিন্তাভাবনা হবে বেদআত।
.
ইতিহাসের আলোকেঃ
.
আমরা ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে , সাহাবা, তাবেঈন এবং অপরাপর ইসলামের সিপাহশালার ও শাসকগণ অনেক অরানব রাষ্ট্র জয় করেছিলেন অনারব দেশসমূহে শ্রোতাদের প্রয়োজন কোথাও অনারবি ভাষায় খোৎবা দান করেছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।যেমন সপ্তম শতকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আগত সাহাবা প্রতিনিধি দল, অতঃপর মেঘনার মোহনা থেকে সুদূর কক্সবাজার পর্যন্ত ব্যাপক বিচরণকারী আরব বণিক তথা দ্বীন প্রচারক দলসমূহ এবং বাংলার গ্রেট ধর্মপ্রচারক বায়েজিদ বোস্তামী, শাহ জালাল, নূর কুতুব ও খানজাহান আলী (রহ.)সহ অগণিত অলি-দরবেশ বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। তারা এখানকার মাতৃভাষায় দাওয়াহ কর্ম পরিচালনা করেছিলেন বলে ডক্টর এবনে গোলাম ছমদ, ডক্টর এনামুল হক ও আবদুল মান্নান তালিব প্রমুখ অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু কোনো প্রচারকর্মী সমসাময়িক নব-মুসলিমদের কাছে বাংলায় খোৎবা দান করেছিলেন বলে আদৌ প্রমাণ নেই।
.
খোৎবা ও বক্ততার মধ্যে প্রার্থক্যঃ
.
খোৎবা জিকির, না ভাষণ এ বিষয়ে মুফতি শফি (রহ.) বলেন, (ক) খোৎবার আসল উদ্দেশ্য হল জিকির, যা বিশেষ একটি ইবাদত। কিন্তু গৌণভাবে ওয়াজ-উপদেশ ও হয়ে যায় । কেননা,,
.
(১) খোৎবায় দুটি ফরজ এবং পনেরটি সুন্নাত রয়েছে (আলমগীরি-১/১৪৬), যা সাধারন কোন ওয়াজ বা বক্ততায় নেই।
.
(২) জুমার খোৎবা হচ্ছে চার রাকাত বিশিষ্ট জোহরের ফরযের বাকি দুই রাকাত নামাজ (বাহার- ১/১০৮),
.
(৩) খোৎবার মাঝখানে কথা বলা যাবে না (মবছুত লিচ ছুরুখছী-২/২৬), কিন্তু বক্তিতার মাঝ খানে কথা বলতে দোষ নেই
.
(৪) জুমার নামাজ ছহী হওয়ার খোৎবা শর্তবিশেষ (ফতহুল ক্বদীর) ও
.
(৫) খোৎবার সময় নামাজ পড়া, কথা বলা, তাসবিহ-তাহলিল করা, সালাম দেয়া, এবং অন্যায় কাজে মৌখিক নিষেধ করা সবকিছুই নিষিদ্ধ (হেদায়া, বাহার)।
.
তবে অন্যায় কাজের বাধা খতিবের জন্য প্রযোজ্য। অথচ ওয়াজ-বক্তৃতায় এগুলো নিষিদ্ধ নয়। আর না ওয়াজের জন্য কিছু ফরজ ও সুন্নাত রয়েছে। না ওয়াজ জুমার জন্য শর্তস্বরূপ। কাজে এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, খোৎবা প্রচলিত ওয়াজ-বক্তৃতা নয়। বরং জিকিরের অর্তভূক্ত।
.
এই বিশেষ জিকির যা ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে করেন আর শ্রোতামন্লীড না বুঝলেও তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন।
.
(5) নবী করিম (সা.)-এর খোৎবায় রোম, পারস্যসহ বিভিন্ন অনারব দেশের লোক শরিক হতো। তখন সাহাবীদের মধ্যে অনুবাদকর্মে সক্ষম ব্যক্তি অনেক বিদ্যমান ছিলেন। খোৎবা প্রচলিত ওয়াজ-বক্তৃতা হলে রাসূল (সা.) নিঃসন্দেহে অনুবাদের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু খোৎবার ব্যাপারে তা করেছিলেন বলে ইতিহাসে কোথাও প্রমাণ নেই। নবী করিম (সা.)-এর পরে সাহাবীরা বাঁধ ভাঙা জোয়ারের ন্যায় অনারব দেশসমূহে ঢুকে পড়েন এবং বিজিত এলাকায় সর্বত্র জুমা ও ঈদ কায়েম করেন। প্রাদেশিক গভর্নরগণ রাষ্ট্রীয় কাজে দোভাষী ব্যবহার করতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) দাওয়াহ কর্মের জন্যে বেতনধারী একজন দোভাষী রেখেছিলেন (বোখারী অফুদ অধ্যায়)। কিন্তু তারা অনারবি ভাষায় কখনো খোৎবা দেননি। আর না কেউ খোৎবার কাজে কোনো দোভাষীকে ব্যবহার করেছিলেন। কাজেই বোঝা গেল খোৎবা নামাজের ক্বেরাত, তাসবীহ, তাশাহুদ ইত্যাদির ন্যায় জিকির বিশেষ, বক্ততা নয়, নামাজে সুরা কেরাতের যেমন অর্থ না বুঝা সত্বেও আরবীর বিকল্প নেই তেমনি খোতবাও, তবে আরবী না বুঝাটা আমাদের দূর্বলতা, আর আমাদের ব্যক্তি স্বার্থে শরিয়তের হুকম রদ বদল হবেনা এটা ই সত্য।
.
খুতবার ভাষা নিয়ে ইমামগণের মতামতঃ
.
খুতবার ভাষা কি হবে?
.
এ ব্যাপারে যদি আমরা চার মাযহাবের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাই যে, চার মাযহাব মতে জুমআর খুতবা আরবীতে দেয়া আবশ্যক।
.
মালেকী মাযহাবঃ
.
মালেকী মাযহাবে জুমআ সহীহ হওয়ার জন্য সর্ববস্থায় উভয় খুতবা আরবী ভাষায় দেয়া শর্ত। যদি উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ আরবীতে খুতবা দিতে সক্ষম না হয়, তাহলে তারা অন্যান্য দিনের ন্যায় জুমআর দিনও যোহর নামায পড়বে। জুমআ পড়বে না।
.
মাওসুআ গ্রন্থে রয়েছে-
.
ذَهَبَ الْمَالِكِيَّةُ : إِلَى أَنَّهُ لاَ بُدَّ أَنْ تَكُونَ الْخُطْبَةُ بِاللُّغَةِ الْعَرَبِيَّةِ ، فَوُقُوعُهَا بِغَيْرِ الْعَرَبِيَّةِ لَغْوٌ ، فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي الْجَمَاعَةِ مَنْ يَعْرِفُ الْعَرَبِيَّةَ وَالْخَطِيبُ يَعْرِفُهَا وَجَبَتْ ، فَإِنْ لَمْ يَعْرِفِ الْخَطِيبُ الْعَرَبِيَّةَ لَمْ تَجِبْ ، وَلاَ بُدَّ أَنْ تَكُونَ جَهْرًا فَإِسْرَارُهَا كَعَدِمِهَا وَتُعَادُ جَهْرًا ، وَلاَ بُدَّ أَنْ تَكُونَ لَهَا بَالٌ. (الموسوعة الفقهية الكويت: ১৯/১৮০) وكذا في (كتاب الفقه علي المذاهب الاربعة: ১/৩৬৯، حاشية الدسوقي: ১/৩৮৭، حاشية شرح منح الجليل: ১/২৬০، جواهر الاكليل: ১/৯৫)
.
শাফেয়ী মাযহাবঃ
.
নামাযে তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় আরবী ভাষায় খুতবা দেয়াও শর্ত। হ্যাঁ, উপস্থিত লোকদের কেউ যদি আরবী ভাষায় খুতবা দিতে না পারে এবং সময় স্বল্পতার কারণে আরবী খুতবা শিখতে না পারে, তাহলে উপস্থিত লোকদের কোন একজন স্বীয় ভাষায় খুতবা দিতে পারবে। আর যদি খুতবা শিক্ষা করা সম্ভব হয় তাহলে সবার উপর আরবী ভাষায় খুতবা শিক্ষা করা ওয়াজিব। যদি সুযোগ থাকা সত্তেও কেউ শিক্ষা না করে, তবে সবাই গুনাহগার সাব্যস্ত হবে। এমতাবস্থায় তাদের জুমআর নামায সহীহ হবে না; বরং যোহরের নামায আদায় করবে।
.
নিহায়াতুল মুহতাজ গ্রন্থে আছে-
.
ويشترط كونها اي الخطبة عربية لاتباع السلف والخلف ولانها ذكر مفروض فاشترط فيه ذلك كتكبيرة الاحرام. (نهاية المحتاج الي شرح المنهاج: ২/৩০৪، كتاب الفقه علي مذاهب الاربعة: ১/৩৬৯، زاد المحتاج: ১/৩২৭، اعانة الطالبين علي حل الفاظ فتح المعين: ২/ ৬৮)
.
হাম্বলী মাযহাবঃ
.
হাম্বলী মাযহাবে আরবী ভাষায় খুতবা দিতে সক্ষম হলে অনারবীতে খুতবা দেয়ার অনুমতি নেই। যেমন, নামাযে অনারবীতে কেরাত পড়ার অনুমতি নেই। তবে উপস্থিত মুসল্লিদের কেউ যদি আরবী ভাষায় খুতবা দিতে সক্ষম না হয়, তাহলে অন্য ভাষায় খুতবা দিলে সহীহ হয়ে যাবে।
.
الحنابلة قالوا : لا تصح الخطبة بغير العربية ان كانوا قادرا عليها فان عجز عن الاتيان بها اتي بغيرها مما يحسنه. (كتاب الفقه علي مذاهب الاربعة: ১/৩৬৯)

ولا تصح الخطبة بغير العربية مع القدرة عليها بالعربية. (كشف القناع عن متن الاقناع: ২/৩৬، كباب الفروع: ২/১১৩)
.
হানাফী মাযহাবঃ
.
হানাফী মাযহাব মতে আরবী ভাষায় খুতবা দিতে সক্ষম হলে অনারবী ভাষায় খুতবা দেয়া বা আরবী ভাষায় খুতবা পাঠ করে বাংলা বা অন্য কোন ভাষায় তরজমা করা মাকরুহে তাহরীমী ও না জায়েয।
.
وصح شروعه مع كراهة التحريم بتسبيح وتهليل وتحميد كما صح لوشرع بغير عربية. الدر المختار: ২/১৮২-১৮৩)

وعلي هذا الخلاف الخطبة وجميع اذكار الصلوة. (الدر المختار: ২/১৮৩، البحر الرائق: ১/৫৩৫)

ماذكر في التحفة والذخيرة والنهاية من ان الاصح انه يكره الافتتاح بغير الله اكبر عند ابي حنيفة (رح) فالمراد به الكراهة التحريم. (البحر الرائق: ১/৫৩৪، وفيه ايضا: وقالا لايجوز الا عند العجز وبه قالت الثلاثة. (البحر الرائق: ১/৫৩৫) وكذا (حاشية ابن عابدين: ২/১৮২، المبسوط للسرخسي: ১/১৩৬، الهداية: في هامشه: ১/১০১، حاشيةالطحطاوي: ص২৮০، المحيط البرهاني: ২৩৩، تاتار خانية: ২/৫২، عمدة الرعاية: ১/২০০، كفاية المفتي: ৩/২১৭، فتاوي محمودية: ১২/৩৬৮)
.
একটি সন্দেহ ও তার নিরসনঃ
.
সন্দেহ:
.
কেউ কেউ বলেন, মাতৃ ভাষায় খুতবা দিতে হবে। তাদের ভাষ্য হচ্ছে- খুতবা শুধু একটি বয়ান বা বক্তৃতার নাম। আর বয়ান ও বক্তৃতা দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে শ্রোতারা তা বুঝা এবং উপদেশ গ্রহণ করা। যদি আরবী ভাষায় খুতবা দেয়া হয়, তাহলে অনারবী শ্রোতারা তা থেকে কীভাবে উপকৃত হবে ? তাই মাতৃ ভাষায় খুতবা দিতে হবে। আরবী ভাষায় খুতবা দেয়া যাবে না।
.
নিরসন:
.
তাদের এই ধারণাটি সঠিক নয়। কেননা, খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয়; বরং খুতবা হলো জুমআর নামাযের সংশ্লিষ্ট একটি ইবাদত, যা দুই রাকাত নামাযের স্থলাভিষিক্ত। খুতবা যে শুধু বক্তৃতার নাম নয়; বরং একটি বিশেষ ইবাদত এর স্বপক্ষে নিম্ন কয়েকটি প্রমাণ উল্লেখ করা হলো:
.
১. বক্তৃতাকে আরবীতে ‘তাযকীর’ বলা হয়, অথচ কুরআন ও হাদীসে খুতবাকে ‘যিকির’ বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-
.
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ (سورة الجمعة: ৯)
.
অর্থ: হে মুমিনগণ ! জুমআর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও। (সূরা: জুমআ: ৯) এখানে যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জুমআ।
.
২. সকল ফুকাহায়ে কিরাম জুমআর নামায সহীহ হওয়ার জন্য খুতবাকে শর্ত বলেছেন-
.
ويشترط لصحتها سبعة اشياء الرابع: الخطبة فيه. (الدر المختار: ৩/১৯)

وكونها شرطا لانعقاد الجمعة . (بدائع الصنائع: ১/৫৮৯) ( وكذا في فتح القدير: ২/৫৫) (حاشيةالطحطاوي: ص৫১৩)
.
যদি খুতবা দ্বারা ওয়াজ করাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে এটাকে জুমআর নামায সহীহ হওয়ার পূর্বশর্ত বলা অর্থহীন।
.
৩. জুমআর খুতবা জুমআর নামাযের ওয়াক্তে হওয়া শর্ত। যেমনটি ফুকাহায়ে কিরাম লিখেন-
.
فلو خطب قبله وصلي فيه لم تصح. (الدر الختار: ৩/১৯)
.
অর্থ: যদি জুমআর নামাযের ওয়াক্ত আসার পূর্বে খুতবা দেয়া হয়। আর ওয়াক্ত আসার পর নামায পড়ে তাহলে জুমআ সঠিক হবে না। (বাদায়ে: ২/২৫৬, হিন্দিয়া: ১/১৬৮)
.
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যদি খুতবা দ্বারা উদ্দেশ্য ওয়াজ বা বক্তৃতা হতো, তাহলে জুমআর নামাযের ওয়াক্ত হওয়া শর্ত করা হতো না; বরং যে কোন সময় কিছু ওয়াজ নসিহত করাই যথেষ্ট হতো। সময় নির্ধারণই প্রমাণ বহন করে এটি একটি ইবাদত। শুধুমাত্র ওয়াজ বা নসিহত নয়।
.
৪. জুমআর নামায সহীহ হওয়ার জন্য খুতবা পাঠ করা শর্ত। আর খুতবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। তবে যদি উপস্থিত মুসল্লিদের সকলেই বধীর বা ঘুমন্ত থাকে এবং তাদের সামনে খুতবা দেয়া হয়, তাহলেও তা জুমআ আদায়ের জন্য যথেষ্ট হবে। যেমন,
.
আল্লামা শামী র. বলেন-
.
كونها قبلها بحضرة جماعة ينعقد الجمعة بهم ولو كانوا صما او نياما. (حاشية ابن عابدين: ৩/১৯، البحر الرائق: ২/১৫৭)
.
অর্থ: জুমআ বিশুদ্ধ হতে কম পক্ষে তিন জন লোকের সম্মুখে নামাযের পূর্বে খুতবা দেয়া শর্ত। যদিও মুসল্লিগণ বধীর বা ঘুমন্ত হোক। যদি খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতা-ই হতো তাহলে বধীর ও ঘুমন্ত লোকদের সামনে খুতবা দেয়ার কি অর্থ?
.
৫. খুতবা দেয়ার পর যদি খতীব সাহেব কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তাতে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয়ে যায়, তাহলে পূনরায় খুতবা দিতে হবে। যদিও শ্রোতা প্রথম বারের শ্রোতারা-ই হোক না কেন ।
.
ولو خطب ثم رجع الي بيته فتغدي او جامع واغتسل ثم جاء استقبل الجمعة وكذا في المحيط. (البحر الرائق: ২/২৫৮)
.
যদি খুতবা দ্বারা ওয়াজ বা নসিহত করাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে একবার খুতবা দেয়ার পর বিলম্ব হওয়ার কারণে পূর্বের শ্রোতাদের সামনে পূনরায় খুতবা দেয়ার কি অর্থ ?
.
৬. খুতবা শুধু ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয়। এর বড় প্রমাণ হলো, ইমাম আবু হানিফা র.-এর মতে শুধু আলহামদু লিল্লাহ বা সুবহানাল্লাহ পড়ার দ্বারা খুতবা আদায় হয়ে যায়।
.
واذا خطب بتسبيحة واحدة او بتهليل وبتحميد اجزائه لقول ابي حنيفة رح. (المبسوط: ২/৪৭)
.
অথচ ‘সুবহানাল্লাহ’ বা ‘আলহামদু লিল্লাহ’ কে কেউ ওয়াজ বা বক্তৃতা বলে না।
.
উপরোক্ত প্রমাণগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝে আসে যে, খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতার নাম নয়; বরং একটি বিশেষ ইবাদত বা যিকির। তবে খুতবা নামক ইবাদতে আরবী ভাষায় ওয়াজ, নসিহত থাকা একটি স্বতন্ত্র সুন্নাত।
.
সুতরাং যখন প্রমাণিত হলো, খুতবার উদ্দেশ্য ওয়াজ নসিহত নয়; বরং ইবাদত। তাই অনারবী শ্রোতাদের সামনে আরবী ভাষায় খুতবা দেয়ার দ্বারা কি ফায়দা ? এ ধরণের প্রশ্নের কোন অবকাশ নেই। যদি কেউ এমন প্রশ্ন করে, তাহলে সর্ব প্রথম নামায ও কুরআনের ব্যাপারে করতে হয়। যখন কুরআন বা নামাযের ব্যাপারে এই ধরণের প্রশ্ন নেই। তাহলে খুতবার ব্যাপারে প্রশ্ন করাও অনর্থক।
.
খুতবা ও নামাযের মাঝে যে সব বিষয়ে মিল রয়েছে।
.
১. নামযের সময় নির্ধারিত; খুতবার সময় ও নির্ধারিত।
.
২. নামায বিনা ওযরে দাড়িয়ে পড়তে হয়; খুতবাও দাড়িয়ে দিতে হয়।
.
৩. নামাযের পূর্বে ইকামত আছে, তেমনি খুতবার পূর্বে আযান আছে।
.
৪. নামাযের মধ্যে যেমন সালাম কালাম করা যায় না, তেমনি ভাবে খুতবাতেও সালাম কালাম করা যায় না।
.
৫. নামায ও খুতবার বিষয়বস্তু মৌলিকভাবে এক। নামাযে যেমন, সূরা ফাতেহা পড়া হয় যাতে আল্লাহ তাআলার হামদ আছে, এমনিভাবে খুতবাতেও আল্লাহ তাআলার হামদ থাকতে হয়।
.
৬. খুতবাতে রাসূল স. এর উপর দরুদ পাঠ করা হয়। নামাযেও রাসূল স. এর উপর দরুদ পাঠ করা হয়।
.
৭. খুতবাতে আল্লাহ তাআলার তাওহীদ ও রাসূল স. এর রিসালাতের সাক্ষ্য আছে, নামাযেও তাশাহহুদ আছে।
.
৮. খুতবায় কুরআনের তিলাওয়াত আছে, নামাযেও কুরআনের তিলাওয়াত করতে হয়।
.
৯. খুতবায় মুসলমানদের জন্য দুআ করা হয়, নামাযেও সালামের পূর্বে দুআ আছে।
.
১০. ইমাম আবু হানিফা র.ও মুহাম্মদ র. বলেন, খুতবা নামাযের স্থলাভিষিক্ত। খুতবাতে কারো হাঁচির উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা যাবে না। কারো সালামের উত্তর দেয়া যাবে না। (যেমনিভাবে নামাযে কারো হাঁচি ও সালামের উত্তর দেয়া যায় না।)
.
উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা খুতবা ও নামাযের সাদৃশ্যতা সুস্পষ্টভাবে বুঝে আসে। সুতরাং নামাযের তাকবীর, কেরাত, তাসবীহ, দুআ ইত্যাদি যেভাবে আরবী ভাষায় পড়া আবশ্যক, অন্য ভাষায় পড়া বা তরজমা করা জায়েয নেই। তদ্রুপ খুতবা আরবী ভাষায় পড়া আবশ্যক।
.
লা-মাযহাবীদের কিছু যুক্তি ও তার জবাব স্থানীয় ভাষায় খুতবা প্রদানের ব্যাপারে লা-মাযহাবীদের নিকট কোরআন-সুন্নাহ হতে কোনোই দলিল নেই। এ ক্ষেত্রে কোরআন ও সহীহ হাদীস ত্যাগ করে তারা কিছু খোড়া যুক্তির আশ্রয় নিয়ে থাকে। আমরা তা উল্লেখ করে জবাব প্রদান করছি।
.
যুক্তি-১ :
.
খুতবা আরবী শব্দ। তার অর্থ বক্তৃতা বা ভাষণ। বক্তৃতা বা ভাষণ যেমন যেকোনো ভাষায় দেওয়া যায়, তদ্রƒপ খুতবাও যেকোনো ভাষায় দেওয়া যাবে।
.
আমাদের জবাব :
.
যুক্তিটি সঠিক নয়। কারণ, শরীয়তের পরিভাষাগুলো শাব্দিক অর্থে বিবেচিত হয় না। বরং শরীয়তে তাকে যে অর্থের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই অর্থেই ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন ‘সালাত’ আরবী শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ নিতম্ব দোলানো, দু’আ করা ইত্যাদি। শাব্দিক অর্থে সালাত আদায় করা গেলে দিনে পাঁচবার নিতম্ব দোলালে বা দু’আ করলেই চলত। কিন্তু এমন কথা কোনো পাগলও বলবে না। বরং শরয়ী অর্থ অনুযায়ী দিনে পাঁচবার নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়মে সালাত আদায় করতে হয়। তদ্রƒপ জুমু’আর খুতবাও শাব্দিক অর্থে শুধু ভাষণ দিলে হবে না। বরং শরয়ী নিয়মে জুমু’আর পূর্বে আরবী ভাষায় দিতে হবে।
.
যুক্তি-২ :
.
ওয়াজ বা ভাষণের নাম খুতবা। আর ওয়াজ-নসিহত বা ভাষণ শ্রোতাদের ভাষায় প্রদান করা উচিত।
.
আমাদের জবাব :
.
উক্ত যুক্তিটির দুটি জবাব নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
.
১.
.
খুতবাকে ওয়াজ বা বক্তৃতা বলা ভুল। কারণ :
.
ক)
.
ওয়াজ বা বক্তৃতাকে আরবীতে ‘তাযকীর ’ বলা হয় । অথচ কোরআন-সুন্নায় খুতবাকে ‘যিকর’ বলা হয়েছে।
(সূরা জুমআহ, আয়াত – ৯ , বুখারী শরী ফ , হাদীস-৩০১, মুসলিম শরীফ, হাদীস-৮৫০, নাসায়ী শরীফ, হাদীস-১৩৮৬, ইবনে মাযাহ শরীফ, হাদীস-১০৯২)
.
খ) ফুকাহায়ে কেরাম খুতবাকে দুই রাক’আত নামাযের স্থলাভিষিক্ত বলেছেন। (বাহরুর রায়েক, ২/১০৮)
.
গ) খুতবার জন্য যোহরের ওয়াক্ত হওয়া শর্ত। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/২৫৬, আলমগীরি, ১/১৬৮)
.
যদি খুতবা ওয়াজ বা বক্তৃতার নামই হতো, তাহলে জুমু’আর ওয়াক্ত হওয়ার শর্ত হতো না।
.
ঘ) খুতবা সহীহ হওয়ার জন্য শুধু পাঠ করা শর্ত। কেউ শোনা জরুরি নয়। এমনকি কয়েকজন বধির কিংবা ঘুমন্ত ব্যক্তির সামনে খুতবা পাঠ করা হলেও জুমু’আ সহীহ হবে। (শামী, ৩/১৯০, বাহরুর রায়েক, ২/১৫৭)
.
খুতবা যদি ওয়াজ বা বক্তৃতাই হতো, তাহলে বধির বা ঘুমন্ত ব্যক্তির সামনে খুতবা দিলে সহীহ হতো না।
.
ঙ) জুমু’আ সহীহ হওয়ার জন্য খুতবাকে শর্ত বলা হয়েছে। (দুররে মুখতার, ৩/১৯, ফাতহুল কাদীর, ২/৫৫)
.
খুতবা যদি ওয়াজ বা বক্তৃতা হতো, তাহলে নামায সহীহ হবার জন্য তাকে শর্ত বলা যুক্তিহীন।
.
চ) খুতবা দেওয়ার পর খতীব যদি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে যান, আর নামায ও খুতবার মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান হয়, তাহলে পুনরায় খুতবা দিতে হয়। যদিও শ্রোতা প্রথমবারের ব্যক্তিরাই হোক না কেন। (বাহরুর রায়েক, ২/২৫৮)
.
যদি খুতবা শুধু ভাষণই হতো, তাহলে একই ভাষণ পূর্বের শ্রোতাদের সামনে আবার বলার কোনোই দরকার ছিল না।
.
ছ) খুতবা শ্রবণ করা এবং চুপ থাকা ওয়াজিব। যবানে দরূদ শরীফ পড়া, তাসবীহ পাঠ করা, তাকবীর বলা অথবা সালামের উত্তর দেওয়া অবৈধ। খুতবা যদি শুধু ভাষণই হতো, তাহলে সালামের জবাব দেওয়া বা যিকর-আযকার থেকে নিষেধ করা হতো না।
.
২.
.
কোরআন শরীফকে অনেক আয়াতে ওয়াজ বা নসীহত বলা হয়েছে। (সূরা ইউনুস, আয়াত-৫৭, সূরা ছাদ, আয়াত-৮৭, সূরা কলম, আয় াত – ৫ ২, সূরা তাকবীর , আয়াত-২৭)
.
তাহলে খুতবার মতো কোরআনকেও নামাযের মধ্যে স্থানীয় ভাষায় পাঠ করা জায়েয হওয়া উচিত।
.
কারণ, আরবী তেলাওয়াত শ্রোতারা অনেকেই বোঝে না। কোনো সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন ব্যক্তি কি তা বৈধ বলবে? তেমনিভাবে আযানের মধ্যে حى على الصلاة না বলে ‘নামাযের দিকে আসো’ বলা উচিত।
.
ফজরের আযানে الصلاة خير من النوم না বলে ‘নামায ঘুম হতে উত্তম’ বলা উচিত।
.
কারণ, শ্রোতারা আরবী ভাষায় এ সমস্ত আহ্বান বুঝতে পারে না। অথচ এমন কথা কেউ বলে না।
.
যুক্তি-৩ :
.
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরবী ভাষায় খুতবা দেননি। বরং মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের মাতৃভাষা আরবী ছিল, এ জন্য তাঁরা আরবী ভাষায় খুতবা দিতেন।
.
আমাদের জবাব :
.
এরূপ যুক্তি মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত। কারণ, উক্ত যুক্তিটি নামায, তেলাওয়াত, আযান ও ইকামতের ব্যাপারেও পেশ করা যেতে পারে। তাহলে কি ওই সব ইবাদতগুলোও রাসূলুল্লাহ (সা.) মাতৃভাষায় আদায় করেছেন বলে যুক্তি দেখিয়ে অন্যরা মাতৃভাষায় আদায় করলে সহীহ হবে? আসলে তাদের এসব যুক্তি ইবাদত নিয়ে খেল-তামাশার অন্তর্ভুক্ত। কোনো ধরনের ইবাদতই আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় গ্রহণযোগ্য নয়। খুতবাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
.
যুক্তি-৪ :
.
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নামাযে ফারসী ভাষায় ক্বেরাত পাঠকে বৈধ বলেছেন। অতএব, আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেওয়াও বৈধ হবে।
.
আমাদের জবাব :
.
উক্ত যুক্তিটির দুটি জবাব নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
.
১.
.
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উক্ত মতামত থেকে তিনি পরবর্তীতে রুজু (মত প্রত্যাহার) করেছেন। সুতরাং তার এই বর্জিত মতামতটি দলিল হিসেবে পেশ করা বোকার পরিচয় দেওয়া। যেমন হেদায়া কিতাবে ১/১০২ উল্লেখ আছে,
.
ويروى رجوعه فى اصل المسئلة إلى قولهما وعليه الاعتماد، والخطبة والتشهد على هذا الاختلاف
.
২.
.
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রথম মতামত অনুযায়ী খুতবা অনারবী ভাষায় দেওয়া জায়েয দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল মাকরূহে তাহরীমির সাথে জায়েয। (শামী, ২/১৮৩, বাহরুর রায়েক , ১/ ৫৩৫ , তাতারখানিয়া, ২/৭৪, সিআয়া, ২/১৫৫)
.
এ ছাড়া ফিকহে হানাফীর অধিকাংশ কিতাবেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে অনারবী ভাষায় খুতবা জায়েয দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মাকরূহে তাহরীমির সাথে জায়েয।
.
৩.
.
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর পূর্ববর্তী মতটির উদ্দেশ্য হলো, অনারবী ভাষায় খুতবা দ্বারা যদি আল্লাহর যিকর আদায় হয়ে যায়, তাহলে জুমু’আহ সহীহ হবে। কিন্তু খুতবার সুন্নাত আরবী ভাষা পরিত্যাগ করার কারণে তা মাকরূহ হবে। যেমন খুতবা দাঁড়িয়ে পবিত্র অবস্থায়, শ্রোতাদের দিকে মুখ করে, পূর্ণ লেবাস পরিধান করে পাঠ করা সুন্নাত। কেউ যদি ওযর-কারণ ছাড়া বসে বসে, কিবলামুখী হয়ে, শুধু সতর ঢেকে খুতবা দেয়, তা জায়েয, কিন্তু সুন্নাত পরিপন্থী ও মাকরূহে তাহরীমি হবে।
.
অতএব, অনারবী ভাষায় খুতবা প্রদান করার ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর পূর্বের মতটিকে দলিল হিসেবে পেশ করা কখনো সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। শ্রোতাদের ভাষায় খুতবার প্রবক্তা বন্ধুগণ নিম্নের সমস্যাটির নকলী বা আকলী সমাধান পেশ করবেন কি?
.
সমস্যা :
.
একটি মসজিদে জুমু’আর দিন খুতবার সময় দশ জন ইংরেজি ভাষী, দশ জন উর্দূ ভাষী, দশ জন ফারসী ভাষী, দশ জন আরবী ভাষী ও দশ জন বাংলা ভাষী মুসল্লি উপস্থিত রয়েছেন। এমতাবস্থায় খতীব সাহেব শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কোন ভাষায় খুতবা পেশ করবেন?
:
:
আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় জুমআর খুতবা দেয়া বিদআত
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
জুমআর খুতবা অন্য কোন ভাষায় প্রদান করা বিদআত। আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় খুতবা প্রদান করা রাসূল সাঃ এবং পরবর্তীতে কোন সাহাবী থেকেই প্রমাণিত নয়।
.
নবীজী সাঃ এর মৃত্যুকালের শেষ সময়ে আরবের বাহিরের অনেক অনারবী মুসলমানই মসজিদে নববীতে এসে নামায পড়তো। কিন্তু কোনদিনও কোন জুমআর খুতবা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়নি।
.
সাহাবায়ে কেরামের জমানায় এর কোন নজীর পাওয়া যায় না। হযরত উমর রাঃ এর জমানায় অনারবী মানুষে ভরে গিয়েছিল মদীনা। কিন্তু কোনদিন মসজিদে নববীতে জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় দেয়া হয়েছে বা দোভাষী দিয়ে অন্য ভাষায় তা অনুবাদ করা হয়েছে এর কোন নজীর নেই।
.
সেই সাথে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেছেন। সেসব রাষ্ট্রে ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু অনারবী রাষ্ট্রে এসে আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিয়েছেন বা তাদের আরবী খুতবা অন্য ভাষায় অনুবাদ করে জুমআর সময় শুনানো হয়েছে এর কোন নজীর নেই।
.
যে কাজ রাসূল সাঃ করেননি, বা পরবর্তী সাহাবায়ে কেরাম করেননি। সে কাজ দ্বীন হিসেবে করা সুনিশ্চিতভাবেই বিদআত। এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় প্রদান করা বিদআত। এটি পরিত্যাজ্য।
.
নামাযের কিরাত যেমন আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় পড়া বিদআত। ঠিক তেমনি জুমআর খুতবা আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় দেয়া বিদআত।
.
যারা এ বিদআতি কাজটি করে যাচ্ছেন, তাদের কাছে এ বিষয়ে রাসুল সাঃ থেকে এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে সহীহ হাদীসের দলীল চান। তাহলেই দেখবেন, দলীল নয় মনের খাহেশাতই হচ্ছে তাদের দলীল।
.
সুতরাং এ বিদআতি কাজ থেকে সকলেরই বিরত থাকতে হবে।
.
হযরত ইরবাস বিন সারিয়া রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন,
.
مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِي اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
.
তোমাদের মাঝে আমার পর জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতভেদ দেখবে। তখন তোমাদের উপর আমার এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরবে। সেটিকে মাড়ির দাত দিয়ে কামড়ে রাখবে। আর সাবধান থাকবে নব উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয় থেকে। কেননা ধর্ম বিষয়ে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৭১৪৪}
.
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ»
.
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মে নেই এমন বিষয় ধর্মীয় বিষয় বলে আবিস্কার করে তা পরিত্যাজ্য। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭১৮, বুখারী, হাদীস নং-২৬৯৭}
.
একটি মনগড়া কিয়াসের জবাবঃ
.
যারা রাসূল সাঃ ও সাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে নিজের নফসের পূজা করে আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দিয়ে থাকেন, তারা কুরআন ও হাদীস রেখে নিজের অজ্ঞ মস্তিস্কপ্রসূত একটি ভ্রান্ত কিয়াসের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। সেটি হল, তারা বলেন, খুতবা হল একটি বক্তৃতা। আর বক্তৃতা সেই ভাষায়ই দিতে হবে, যে ভাষায় মানুষ বুঝে থাকে।
.
জবাবঃ
.

.
খুতবা মানে শুধু বক্তৃতা এটি অজ্ঞতাসূচক বক্তব্য। কুরআন ও হাদীসে জুমআর খুতবাকে শুধু বক্তৃতা সাব্যস্ত করা হয়নি।
.
কুরআনে খুতবাকে জিকির বলা হয়েছে-
.
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ [٦٢:٩]
.
মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ। ( সুরা জুমা আয়াত ৯ )
.
এই আয়াতের মধ্যকার যিকরুল্লাহ দ্বারা প্রায় সকল মুফাসসিরদের মতে খুতবা উদ্দেশ্য ।
(তাফসিরে রাযি ১/৪৪৬, তাফসিরে রুহুল মাআনি ২৮/১০২, তাফসিরে ইবনে আব্বাস রাঃ)
হাদিসেও খুতবাকে যিকির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ।
.
فإذا خرج الإمام حضرت الملائكة يستمعون الذكر
.
যখন ইমাম খুতবা দিতে বের হন তখন ফেরেশতারা এসে যিকির শুনে অর্থাৎ খুতবা শোনে । (বোখারি ১/৩০১, মুসলিম হাদিস নং ৮০৫)
.
সুতরাং কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির যেমন অন্য ভাষায় দেয়া হয় না।তেমনি খুতবাও অন্য ভাষায় দেয়ার বিধান নেই।
.

.
হাদীসে জুমার খুতবাকে দুই রাকাত নামজের স্থলাবিসিক্ত করা হয়েছে ।
.
হযরত ওমর ও আয়েশা রঃ থেকে বর্ণিত,
.
حَدِيثُ عُمَرَ وَغَيْرِهِ أَنَّهُمْ قَالُوا إنَّمَا قَصُرَتْ الصَّلَاةُ لِأَجْلِ الْخُطْبَةِ
.
জুমার নামাজ কে খুতবার জন্য ছোট করে দেওয়া হয়েছে। (ইবনে হাজার আসকালানি তালখিসুল হাবির ২/১৭৬)
.
كَانَتِ الْجُمُعَةُ أَرْبَعًا فَجُعِلَتِ الْخُطْبَةُ مَكَانَ الرَّكْعَتَيْنِ
.
জুমার নামাজ চার রাকাত ছিল অতঃপর খুতবাকে দুই রাকাতের স্থলাবিসিক্ত করা হয়েছে (বাইহাকি ৫২৫৮ নং)
শুধু নিছক বক্তৃতার নাম খুতবা নয়। এটি নামাযের মতই গুরুত্বপূর্ণ ও দুই রাকাতের স্থলাভিসিক্ত। তাই নামাযে যেমন আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় পড়া যায় না, তেমনি খুতবাও অন্য ভাষায় পড়া যাবে না।
.
খুতবা অন্য ভাষায় দেয়ার দাবি ইসলামকে খেলনা বস্তু বানানোর ষড়যন্ত্র
.
আজান, ইকামত, তাকবীর, কুরআন, তিলাওয়াত, জিকির ও খুতবা এ সবই ইসলামের প্রতীক। এর কোনটিরই অন্য ভাষায় পড়ার কোন নজীর রাসূল সাঃ থেকে নেই। নেই সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে। এমনকি তাবেয়ী বা তাবেয়ীগণ থেকেও নেই।
.
তাই এসবকে অনুবাদ করে বলার দাবি করা ইসলামের প্রতিককে পাল্টে ফেলার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা প্রদানকারী বিদআতি ব্যক্তিদের থেকে মুসলিম উম্মাহকে হিফাযত করুন।
:
:
জুমআর মূল খুতবার আগে বাংলায় প্রচলিত বয়ান করা কি বিদআত?
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
‍“জুমআর খুতবার আগে বাংলায় যে খুতবা দেয়া হয়” এ বাক্যটি ভুল।
.
কারণ, আমাদের মসজিদগুলোতে বাংলায় খুতবা দেয়া হয় না, বরং বাংলায় ওয়াজ-নসিহত করা হয়। খুতবাতো আরবীতেই দিতে হয়। দু’ই কারণে আমাদের মসজিদগুলোতে তা করা হয়। যথা-
.

.
জুমআর নামাযের নির্ধারিত সময় হবার এক দেড় ঘন্টা আগে মুসল্লিরা মসজিদে এসে একত্র হন। তখন অনেকেই গল্প গুজব করে গোনাহে লিপ্ত হয়, সেই কারণে খতীব সাহেব উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে কুরআন ও হাদীস থেকে কিছু আলোচনা করেন। যাতে করে সময়টা কাজে লাগে। যে মুসল্লিরা তা শ্রবণ করেন, তারাও জানেন যে, এটা জুমআর খুতবা নয়। তেমনি যিনি বয়ান করেন, সেই খতীব সাহেবও জানেন এটা জুমআর খুতবা নয়। এটি কেবলি মানুষ নামাযের নির্ধারিত সময়ের আগে মুসল্লিরা একত্রিত হওয়ায় সময়টি কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। সুতরাং এটিকে খুতবা বলে বিদআত বলার কোন সুযোগ নেই।
.
কেউ যদি এটাকে বিদআত বলতে চায়, তাহলে তার প্রথমে মসজিদে মুসল্লিরা একত্রিত হলে, তাদের উদ্দেশ্য বয়ান করা হারাম হওয়া প্রমাণ করতে হবে।
.
অথচ এমন কোন প্রমাণ কোন ব্যক্তি প্রমাণ করতে পারবে না। সুতরাং বুঝা গেল, জুমআর মূল খুতবার আগে বাংলায় যে বয়ান করা হয়, তা বিদআত নয়। নিষিদ্ধ নয়। আর সেটি খুতবাও নয়। যদি কেউ আলাদা খুতবা মনে করে, তাহলেই কেবল তা বিদআত হবে। অথচ এমনটি কেউ মনে করে না।
.

.
জুমআর মূল খুতবার আগে বয়ান করা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে প্রমাণিত। আমরা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর অনুসরণে তা করে থাকি।
.
যেমনঃ
.
عَاصِمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى جَانِبِ الْمِنْبَرِ فَيَطْرَحُ أَعْقَابَ نَعْلَيْهِ فِي ذِرَاعَيْهِ ثُمَّ يَقْبِضُ عَلَى رُمَّانَةِ الْمِنْبَرِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَقُولُ فِي بَعْضِ ذَلِكَ: وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فَإِذَا سَمِعَ حَرَكَةَ بَابِ الْمَقْصُورَةِ بِخُرُوجِ الْإِمَامِ جَلَسَ. هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ
.
অর্থ : আসেম (রহ.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, জুমু’আর দিন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জুতা খুলে মিম্বরের পাশে দাঁড়িয়ে মিম্বর ধরে বলতেন, আবুল কাসেম (সা.) বলেন, মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেন, সাদেক মাসদুক (সা.) বলেন, ধ্বংস আরবদের জন্য, ওই ফিতনার কারণে, যা নিকটবর্তী…। এরপর যখন ইমাম সাহেবের বের হবার আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি বসে যেতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/১৯০, হাদীস-৩৩৮)
.
عَنْ أَبِي الزَّاهِرِيَّةِ، قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا مَعَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُسْرٍ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَمَا زَالَ يُحَدِّثُنَا حَتَّى خَرَجَ الْإِمَامُ
.
হযরত আবদুল্লাহ বিন বুছর (রা.) জুমু’আর দিন প্রথমে ওয়াজ করতেন। যখন খতীব খুতবার জন্য আগমন করতেন, তখন তিনি ওয়াজ বন্ধ করতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/২৮৮, হাদীস-১০১২)
.
হযরত তামীম দারী (রা.) হযরত উমর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে খুতবার পূর্বে ওয়াজ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, ৩১/৩৩১, হাদীস-১৫১৫৭)
.
সুতরাং বুঝা গেল, আমাদের মসজিদগুলোর আমলটি বিদআত হবার প্রশ্নই উঠে না।
:
:
ঈদের খুৎবা নামাযের পর হয়, জুমার খুৎবা নামাযের পূর্বে কেন?
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
১. মহান আল্লাহ তায়ালা যে কোন বিধান নিয়ে কারো নিকটে জিজ্ঞাসিত নন-
.
{ ﻟَﺎ ﻳُﺴْﺄَﻝُ ﻋَﻤَّﺎ ﻳَﻔْﻌَﻞُ ﻭَﻫُﻢْ ﻳُﺴْﺄَﻟُﻮﻥَ {[ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ : 23
.
অর্থাৎ : মহান আল্লাহ তাঁর কৃতকর্ম সম্পর্কে কারো কাছে জিজ্ঞাসিত নন, বরং সকলেই তাঁর কাছে জিজ্ঞাসিত।( সূরা আম্বিয়া-২৩)।
তাই এই সব বিষয়ে প্রশ্ন না করাই উত্তম।
.
২. প্রকৃত পক্ষে ঈদ ও জুমা দুটির খুৎবাই নামাযের পরে ছিল। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে জুমার খুৎবাকে নামাযের পূর্বে আনা হয়েছে। তা নিন্মে উল্লেখ করা হলো-
.
ﺍﻟﻤﺮﺍﺳﻴﻞ ﻷﺑﻲ ﺩﺍﻭﺩ ‏( 1 / 105 ‏) :
62 – ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻣَﺤْﻤُﻮﺩُ ﺑْﻦُ ﺧَﺎﻟِﺪٍ، ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺍﻟْﻮَﻟِﻴﺪُ، ﺃَﺧْﺒَﺮَﻧِﻲ ﺃَﺑُﻮ ﻣُﻌَﺎﺫٍ ﺑُﻜَﻴْﺮُ ﺑْﻦُ ﻣَﻌْﺮُﻭﻑٍ ﺃَﻧَّﻪُ ﺳَﻤِﻊَ ﻣُﻘَﺎﺗِﻞَ ﺑْﻦَ ﺣَﻴَّﺎﻥَ، ﻗَﺎﻝَ : ” ﻛَﺎﻥَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻳُﺼَﻠِّﻲ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔَ ﻗَﺒْﻞَ ﺍﻟْﺨُﻄْﺒَﺔِ ﻣِﺜْﻞَ ﺍﻟْﻌِﻴﺪَﻳْﻦِ ﺣَﺘَّﻰ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﻮْﻡُ ﺟُﻤُﻌَﺔٍ ﻭَﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻳَﺨْﻄُﺐُ ﻭَﻗَﺪْ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔَ، ﻓَﺪَﺧَﻞَ ﺭَﺟُﻞٌ ﻓَﻘَﺎﻝَ : ﺇِﻥَّ ﺩِﺣْﻴَﺔَ ﺑْﻦَ ﺧَﻠِﻴﻔَﺔَ ﻗَﺪِﻡَ ﺑِﺘَﺠَﺎﺭَﺗِﻪِ، ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺩِﺣْﻴَﺔُ ﺇِﺫَﺍ ﻗَﺪِﻡَ ﺗَﻠَﻘَّﺎﻩُ ﺃَﻫْﻠُﻪُ ﺑِﺎﻟﺪِّﻓَﺎﻑِ، ﻓَﺨَﺮَﺝَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻓَﻠَﻢْ ﻳَﻈُﻨُّﻮﺍ ﺇِﻟَّﺎ ﺃَﻧَّﻪُ ﻟَﻴْﺲَ ﻓِﻲ ﺗَﺮَﻙِ ﺍﻟْﺨُﻄْﺒَﺔِ ﺷَﻲْﺀٌ؛ ﻓَﺄَﻧْﺰَﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﺰَّ ﻭَﺟَﻞَّ } ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺭَﺃَﻭْﺍ ﺗِﺠَﺎﺭَﺓً ﺃَﻭْ ﻟَﻬْﻮًﺍ ﺍﻧْﻔَﻀُّﻮﺍ ﺇِﻟَﻴْﻬَﺎ { ‏[ ﺍﻟﺠﻤﻌﺔ : 11 ‏] ، ﻓَﻘَﺪِﻡَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺍﻟْﺨُﻄْﺒَﺔَ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔِ ﻭَﺃَﺧَّﺮَ ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓَ …….. ﺍﻟﺦ
.
অর্থাৎ : হযরত মুকাতেল ইবনে হাইয়ান (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ঈদের নামাযের ন্যায় খুৎবার পূর্বেই জুমার নামায আদায় করতেন। একদা রাসূল (সা.) জুমার নামায শেষে খুৎবা দিচ্ছিলেন। অতঃপর এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে বললো: দেহইয়া ইবনে খলিফা ব্যবসায়ী সরাঞ্জাম নিয়ে আগমন করেছে, (আর দেহইয়া যখন আগমন করতো, সকলে তাকে বাদ্যযন্ত্রবিশেষ দ্বারা স্বাগতম জানাতো।) অতঃপর সকলেই খুৎবা শুনা আবশ্যক নয় ভেবে (মসজিদ থেকে) বের হয়ে গেলো। এই মর্মে
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন- তারা যখন কোন ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রিড়াকৌতুক দেখে তখন সেদিকে ছুটে যায় (সূরা জুমা-১১)
.
অতঃপর রাসূল (সা.) পরবর্তী জুমায়, খুৎবাকে নামাযের পূর্বে নিয়ে আসেন। আর নামায খুৎবাহ এর পরে আদায় করেন….. (আল মারাসিল লি আবি-দাউদ-১০৫, হাদীস-৬২)
.
উক্ত হাদীসটি মুরসালে সহীহ।
জ্ঞাতব্য : মুরসাল হাদীস যয়ীফ হাদীস এর একটি প্রকার।
.
উল্লেখ্য যে, যয়ীফ হাদীস (আমলযোগ্য)। উলুমে হাদীসের নিয়ম অনুসারে দুটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যত্র যয়ীফ হাদীস এর উপর আমল করা যাবে-
.
ﺗﻴﺴﻴﺮ ﻣﺼﻄﻠﺢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ‏( ﺹ : 80 ‏)
ﻳﺠﻮﺯ ﻋﻨﺪ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻭﻏﻴﺮﻫﻢ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺍﻷﺣﺎﺩﻳﺚ ﺍﻟﻀﻌﻴﻔﺔ، ﻭﺍﻟﺘﺴﺎﻫﻞ ﻓﻲ ﺃﺳﺎﻧﻴﺪﻫﺎ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺑﻴﺎﻥ ﺿﻌﻔﻬﺎ – ﺑﺨﻼﻑ ﺍﻷﺣﺎﺩﻳﺚ ﺍﻟﻤﻮﺿﻮﻋﺔ ﻓﺈﻧﻪ ﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺭﻭﺍﻳﺘﻬﺎ ﺇﻻ ﻣﻊ ﺑﻴﺎﻥ ﻭﺿﻌﻬﺎ – ﺑﺸﺮﻃﻴﻦ، ﻫﻤﺎ :
ﺃ – ﺃﻻ ﺗﺘﻌﻠﻖ ﺑﺎﻟﻌﻘﺎﺋﺪ، ﻛﺼﻔﺎﺕ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ .
ﺏ – ﺃﻻ ﻳﻜﻮﻥ ﻓﻲ ﺑﻴﺎﻥ ﺍﻷﺣﻜﺎﻡ ﺍﻟﺸﺮﻋﻴﺔ ﻣﻤﺎ ﻳﺘﻌﻠﻖ ﺑﺎﻟﺤﻼﻝ ﻭﺍﻟﺤﺮﺍﻡ
.
আক্বিদা সম্বলিত যেমন আল্লাহর গুনাগুন ও হালাল হারাম ব্যতীত অন্য স্থানে যয়ীফ হাদীস এর উপর আমল করা যাবে। তাইসীরু মুসতালাহীল হাদীস-৮০। তাই এ ক্ষেত্রেও হাদীসটি প্রমাণযোগ্য হতে কোন বাধা নেই।
:
:
খুতবা দেয়ার সময় সুন্নত পড়াঃ আসলেই সহীহ হাদীসের বিরুদ্ধে লাল বাতি জ্বালানো হয়?
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
প্রশ্ন:
.
কিছুদিন আগে আমাকে মাযহাবে বিপক্ষে একটি প্রশ্ন করল এক ভাই। আমার প্রশ্নের জবাবটি খুব শিগ্রই প্রয়োজন।
প্রশ্নটি হল….
.
আমি একটি দলীল দিলাম দেখুন কিভাবে সহীহ হাদীসকে লাল বাতি জ্বালিয়ে দুরে ঠেলে দেয়া হয়েছে :
.
হাদীস:১
.
আবু কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন ,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ,যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে ,তখন সে যেন দু’রাকাত সালাত আদায় করা ব্যতীত না বসে ।
( বুখারী হা/৪৪৪ , ১১৬৭ ; মুসলিম হা/ ৭১৪ ; তিরমিযী হা/ ৩১৬ ; নাসাঈ হা/ ৭৩০ ; আবু দাউদ হা/ ৪৬৭ ; ইবনু মাজাহ হা/ ১১২৩ ; আহমাদ হা/ ২২০১৭ , ২২০৭২ , ২২০৮৮ , ২২১৪৬ ;দারেমী হা/ ১৩৯৩ ; রিয়াদুস সালেহীন হা/ ১১৫১)
.
হাদীস: ২
.
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন ,নবী করীম (সাঃ) এর খুৎবা দানকালে সেখানে এক ব্যক্তি আগমন করেন । তিনি তাকে বলেন , হে অমুক ! তুমি কি ( তাহিয়াতুল মাসজিদ ) সালাত পড়েছ ? ঐ ব্যক্তি বলেন , না । নবী ( সাঃ ) বলেন , তুমি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় কর । অন্য হাদীসে বলা হয়েছে তুমি সংক্ষিপ্ত ভাবে দুই রাকাআত ( তাহিয়াতুল মাসজিদ ) সালাত আদায় কর ।
( বুখারী হা/৮৮৩ , ৮৮৪ ; মুসলিম হা/১৮৯৫ , ১৮৯৬ , ১৮৯৭ , ১৮৯৮ , ১৮৯৯ , ১৯০০ ; তিরমিযী ; ইবনে মাজাহ ; নাসাঈ হা/১৪০৩ ; আবু দাউদ হা/১১১৫ , ১১১৬ , ১১১৭)
.
প্রথম হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাহিয়াতুল মাসজিদ সালাতের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন এবং এই সালাত না আদায় করে বসতে নিষেধ করেছেন ।
.
দ্বিতীয় হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে খুৎবা চলাকালীন অবস্থায় আগত ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে দুই রাকাত তাহিয়াতুল মাসজিদ সালাত আদায় করিয়ে এই সালাতের গুরুত্বের প্রমাণ দিয়েছেন ।
.
আর আমাদের মসজিদ গুলিতে লাল বাতি জ্বালিয়ে নিষেধ করা হয় যে লাল বাতি জ্বলা কালীন কোন নামায পড়া নিষেধ। কারণ আপনাদের মাযহাবে তাহিয়াতুল মসজিদ নফল । আার খুৎবা ওয়াজিব । যে ওয়াজিব খুৎবা থামিয়ে তাহিয়াতুল মসজিদ নামায পড়ানো হল সেটা নফল হয় কি করে ?
.
একটু ভেবে দেখুন অন্ধ অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা সহীহ হাদীসের সাথে যে আচরণ করছি তার পরে নবী (সাঃ) এর সামনে দাঁড়াতে পারবো তো ?
.
জবাবঃ
.
প্রথমেই একটি কথা জেনে রাখা দরকার-সেটা হল-তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া মুস্তাহাব। এটাকে ওয়াজিব বা ফরজ কোন মুহাদ্দিস, কোন মুফাসসির, কোন মুহাক্কিক আলেম বলেন নি। সুতরাং লোকটির দাবি যে, আমরা এটিকে নফল বলে তাহিয়্যাতুল মসজিদকে ছেড়ে দেই একথাটি হাদীস সম্পর্কে চূড়ান্ত অজ্ঞতার পরিচায়ক।
.
হাদীস অনুসরণের নামে হাদীস অস্বিকার করার এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত
.
عن ابن عمر قال : سمعت النبي صلى الله عليه و سلم يقول إذا دخل أحدكم المسجد والإمام يخطب على المنبر فلا صلاة ولا كلام حتى يفرغ الإمام
.
অনুবাদ-আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ বলেন-আমি রাসূল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে আর ইমাম খুতবা দিচ্ছে মিম্বরের উপর, তাহলে ইমাম ফারিগ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোন নামায নেই কোন কথাও নেই। {মাযমাউজ জাওয়ায়েদ, ২/১৮৪, হাদীস নং-২০১৪} ইবনে হিব্বান রহঃ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
.
তবে হাদীসটি যদিও আইউব বিন নুহাইক এর কারণে দুর্বল। কিন্তু অন্যান্য কারণে এটা শক্তিশালী হয়ে গেছে। সেটা হল ইমাম খুতবাদানকালে নামায পড়া নিষিদ্ধ এটা ইবনে ওমর রাঃ এর মতামত। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-২/১২৪}
.
সেই সাথে হযরত ওমর রাঃ, হযরত উসমান রাঃ, হযরত আলী রাঃ সহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও পূর্ববর্তীদের মতামত এটাই যে, ইমামের খুতবাদানকালে নামায পড়া নিষিদ্ধ। {শরহে মুসলিম লিন নাবাবী রহঃ-১/২৮৭}
.
عن ثعلبة بن أبى مالك القرظي : أن جلوس الإمام على المنبر يقطع الصلاة وكلامه يقطع الكلام (شرح معانى الآثار، كتاب الصلاة، باب الرجل يدخل المسجد يوم الجمعة والإمام يخطب هل ينبغي له أن يركع أم لا، رقم الحديث-2014)
.
অনুবাদ-হযরত সা’লাবা বিন আবি মালিক আল কুরাজী রাঃ বলেন-“নিশ্চয় ইমামের মিম্বরে বসা নামায বন্ধ করে দেয়, আর তার কথা বলা কথাকে বন্ধ করে দেয়”। {তাহাবী শরীফ, ১/৩৭০, হাদীস নং-২০১৪} এই হাদীসটি সহীহ।
.
আল্লাহ তাআলা যদি মানুষ থেকে আকল ছিনিয়ে নেন তাহলে কি অবস্থায় দাঁড়ায়, এই উদ্ভট প্রশ্নটিই এর প্রোজ্জ্বল প্রমাণ। তাহিয়্যাতুল মসজিদের হাদীস মেনে লোকটি খুতবাদানকালে নামায পড়া ও কথা বলা নিষিদ্ধ সম্বলিত বর্ণিত সহীহ হাদীসকে অস্বিকার করছেন। এটা কি হাদীসের অনুসরন? না হাদীস অস্বিকার করা?
.
আমরা তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়া মুস্তাহাব বলি। সুতরাং তাহিয়্যাতুল মসজিদের বিধান সম্বলিত হাদীসকে অস্বিকার করি না। মানি।
.
কিন্তু কথিত আহলে হাদীসের লোকেরা তাহিয়্যাতুল মসজিদের বিধান সম্বলিত হাদীসটিই কেবল মানে, খুতবাদানকালে নামায না পড়ার বিধান সম্বলিত হাদীসটি অস্বিকার করে। তাহলে তারা একটি সহীহ হাদীস মানে, আর একটিকে অস্বিকার করে চরম পর্যায়ের ঔদ্ধত্বতার সাথে। রাসূলের বাণীর সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের বেয়াদবী করে।
.
যারা দু’টি সহীহ হাদীসকেই মানে তারা সঠিক অর্থে হাদীসের অনুসারী না, যারা একটি সহীহ হাদীসকে অস্বিকার করে তারা হাদীসের প্রকৃত অনুসারী?
.
২নং হাদীস এর জবাবঃ
.
১ নং জবাবঃ
.
হাদীসটির হুকুম রহিত হয়ে গেছে। হুকুম রহিত হয়েছে আমাদের পূর্ববর্তী বর্ণিত হাদীস দ্বারা। তাছাড়া আরো অনেক হাদীস রয়েছে এর প্রমাণ স্বরূপ। যেমন-
.
أن أبا هريرة أخبره أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إذا قلت لصاحبك يوم الجمعة أنصت والإمام يخطب فقد لغوت (صحيح البخارى-كتاب الجمعة، باب الإنصات يوم الجمعة والإمام يخطب، رقم الحديث-892
.
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন-রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যখন তুমি তোমার পাশের জনকে জুমআর দিন বল-চুপ থাক এমতাবস্থায় যে, ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছে, তাহলে তুমি অযথা কাজ করলে। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৮৯২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৫}
.
লক্ষ্য করুন-যেখানে কাউকে চুপ করতে বলা নিষিদ্ধ খুতবা শুনতে ডিষ্টার্ব হবে বলে, সেখানে মসজিদের মাঝে সবার সামনে নামায পড়তে শুরু করলে কি খুতবা শুনতে ব্যাঘাত ঘটবে না? কারণ নামায পড়তে শুরু করলে নামাযের জায়গা স্থীর করতে হবে, কখনো সখনো সামনে থেকে কাউকে সরাতে হবে, সামনে দিয়ে যেন কেউ না যায় ইত্যাদী রুখার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সকল কাজ কি করে বৈধ থাকে?
.
সুতরাং বিষয় হল-প্রথম প্রথম খুতবাদানকালেও নামায পড়া জায়েজ ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গেছে। নতুবা বলা হবে-এর হুকুমটি বাকি আছে ইমাম সাহেব খুতবা শুরু করার আগ পর্যন্ত। খুতবা শুরু করে দিলে তা নিষিদ্ধ।
.
২ নং জবাবঃ
.
শুধু হাদীসের বাহ্যিক শব্দের অর্থের দিকে খেয়াল করে সিদ্ধান্ত নেয়া বোকামী। হুকুম দিতে হবে অন্তর্নিহিত অর্থের দিকে খেয়াল করে। একটি হাদীসের হুকুম দেখতে হবে এ সম্পর্কীয় সকল হাদীসের উপর নজর বুলিয়ে। যেন একটি হাদীস মানতে গিয়ে অন্য হাদীসকে অস্বিকার করার ধৃষ্টতা দেখাতে না হয়।
.
প্রশ্নে উল্লেখিত দ্বিতীয় হাদীসটি হযরত সুলাইক গাতফানী রাঃ এর ঘটনা সম্বলিত একটি হাদীস। যা হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে ভিন্ন শব্দে এসেছে। আমরা প্রথমে একাধিক কিতাবের বর্ণনার দিকে একটু খেয়াল করি-
.
جابر بن عبد الله رضي الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم وهو يخطب ( إذا جاء أحدكم والإمام يخطب أو قد خرج فليصل ركعتين (صحيح البخارى-كتاب ابواب التطوع، باب ما جاء في التطوع مثنى مثنى، رقعم الحديث-1113
.
হযরত জাবের রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-রাসূল সাঃ খুতবাদানকালে বলেছেন-যখন তোমাদের কেউ আগমণ করে আর ইমাম খুতবা দিতে থাকে, (অথবা বলেছেন) খুতবা দিতে বের হয় তবে সে যেন দুই রাকাত নামায পড়ে নেয়। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১১৩}
.
عن جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- خَطَبَ فَقَالَ إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَقَدْ خَرَجَ الإِمَامُ فَلْيُصَلِّ رَكْعَتَيْنِ (صحيح مسلم، كتاب الجمعة، باب التَّحِيَّةِ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ، رقم الحديث-2059
.
হযরত জাবের রাঃ বলেন-রাসূল সাঃ খুতবাদানকালে বলেন-যখন তোমাদের কেউ জুমআর দিন আসে এমতাবস্থায় যে, ইমাম খুতবার জন্য বের হয়েছে তাহলে সে যেন দুই রাকাত নামায পড়ে নেয়। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০৫৯}
.
আমরা যদি উক্ত হাদীসটির এই অর্থ নেই যে, যা বুখারী মুসলিমে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে, ইমাম যখন খুতবার জন্য বের হয় তখন নামায পড়তে পারবে। খুতবা দিতে শুরু করলে পারবে কি না? সেটা বুখারীর বর্ণনাটিতে নেই, আর মুসলিমের বর্ণনায় বর্ণনাকারী সন্দেহ রয়েছে, আছে কি নাই?
.
তাহলে যেসব বর্ণনায় খুতবা দিতে শুরু করলে নামায পড়তে পারবে বলে বর্ণিত আছে এর অর্থ হল-ইমাম খুতবা দিতে থাকে, মানে খুতবার জন্য বসে থাকে। খুতবা শুরু করে দেয়নি। কারণ খুতবা দিতে শুরু করলে নামায পড়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়। যা ইতোপূর্বের বর্ণনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে। এটা মেনে নিলে উভয় হাদীসের উপর আমল হয়, কোন হাদীসকে অবজ্ঞাবশতঃ বাদ দেবার ধৃষ্টতা দেখাতে হয় না। উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে যায়। অর্থাৎ খুতবার জন্য বসা পর্যন্ত নামায পড়া যাবে, কিন্তু খুতবা শুরু হয়ে গেলে আর পড়া যাবে না।
.
৩ নং জবাবঃ
.
এই হাদীসটি মূলত সুলাইক গাতফানী রাঃ এর সাথে খাস। এই হাদীসের হুকুম আম নয়। কারণ এই ঘটনা সম্বলিত হাদীসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই-সুলাইক গাতফানী রাঃ যখন নামায শুরু করেন তখন রাসূল সাঃ খুতবা থামিয়ে বসে ছিলেন। এটা ব্যতিক্রমি ঘটনা। কেউ যদি খুতবার মাঝখানে এসে যায়, যে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়েনি, তাহলে খতীব সাহেব খুতবা থামিয়ে তাকে নামায পড়তে দিবেন, এটা কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এখানে উদ্দেশ্য হল ভিন্ন। আর সেটা হল-সুলাইক গাতফানী ছিলেন দারিদ্র-গরীব। তিনি যখন সবার সামনে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে শুরু করেন, তখন সবাই তার দারিদ্র হাল দেখে তার প্রতি দয়ার্দ্র হন। আর রাসূল সাঃ ও খুতবার মাঝে গরীবদের দান করার ফযীলতের কথা আলোচনা করেন, ফলে সাহাবায়ে কিরাম অনেক দান করতে থাকেন। রাসূল সাঃ এর মিম্বরের নিকট সদকার মালের স্তুপ হয়ে যায়। রাসূল সাঃ সেখান থেকে এক জোড়া তাকে দান করলেন। আর বাকি কাপড় অন্য গরীবদের জন্য রেখে দিলেন। দেখুন নিচের দারা কুতনীর বর্ণনা, যেখানে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সুলাইক গাতফানী রাঃ নামায পড়তেছিলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত নবীজী সাঃ খুতবা বন্ধ রাখেন। যা স্পষ্ট প্রমাণবাহী এটি বিশেষ কারণে করা হচ্ছে। নতুবা খুতবা বন্ধ রাখার কোন মানে হয় না।
.
عن أنس قال : دخل رجل من قيس ورسول الله صلى الله عليه و سلم يخطب فقال النبي صلى الله عليه و سلم قم فاركع ركعتين وأمسك عن الخطبة حتى فرغ من صلاته (سنن الدار قطنى، كتاب أول كتاب الجمعة، باب في الركعتين إذا جاء الرجل والإمام يخطب، رقم الحديث-9)
.
যদি এই ঘটনায় সুলাইক গাতফানীর প্রতি দান করার বিষয়টি সাহাবাদের মধ্যে জাগ্রত করার উদ্দেশ্যের বদলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার গুরুত্ব রাসূল সাঃ এর উদ্দেশ্য হত, তাহলে এরকম আরো অসংখ্যা ঘটনা আছে যাতে সাহাবারা খুতবার সময় মসজিদে এসেছেন এমতাবস্থায় যে, নবীজী খুতবা দিচ্ছিলেন। তখনও নবীজী সাঃ সেই সাহাবাদের তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়তে নির্দেশ দিতেন। অথচ নবীজী সাঃ এমন নির্দেশ দেন নি। যেমন-
.
১- একদা ইবনে মাসউদ রাঃ রাসূল সাঃ মিম্বরে বসা অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাঃ সবাইকে বসে পড়ার হুকুম করলেন। সে সময় ইবনে মাসউদ রাঃ মসজিদে নববীর দরজায় ছিলেন। তিনি সেখানেই বসে গেলেন। তখন রাসূল সাঃ বললেন-“ইবনে মাসউদ! তুমি আগে চলে আস”! {সুনানে আবু দাউদ-১/১৫৬} আগে এসে বসার কথা বলেছেন কিন্তু তাঁকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার হুকুম দেন নি।
.
২- একদা এক ব্যক্তি লোকদের ডিঙ্গিয়ে সামনে আসতে ছিল, তখন রাসূল সাঃ তাঁকে বললেন-“তোমার একাজ লোকদের কষ্ট দিচ্ছে”। (নাসায়ী শরীফ-২০৭} কিন্তু রাসূল সাঃ তাকেও নামায পড়তে আদেশ দেন নি।
.
৩- ইস্তিস্তাকার হাদীসে এক ব্যক্তি রাসূল সাঃ এর কাছে বৃষ্টি না হওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসে, তখন সে ফিরে গিয়ে এক সপ্তাহ পর আবার বন্যা হওয়ার সংবাদ নিয়ে আসে। এই সাহাবী উভয় দাবি নিয়ে এসেছিলেন এমন সময় যখন রাসূল সাঃ খুতবা দিচ্ছিলেন, {বুখারী শরীফ, নামাযে ইস্তিস্কা অধ্যায়} তাঁকেও রাসূল সাঃ তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার নির্দেশ দেন নি।
.
এই সকল বর্ণনা একথাই প্রমাণ করছে যে, খুতবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া আবশ্যক কোন বিষয় নয়। যদি তাই হতো রাসূল সাঃ অবশ্যই সবাইকে তা পড়তে নির্দেশ দিতেন, যেমনটি তিনি সুলাইক গাতফানী রাঃ কে দিয়েছিলেন। এসব বর্ণনা একথাই প্রমাণ করছে যে, সুলাইক গাতফানী রাঃ কে বিশেষ কারণে রাসূল সাঃ খুতবা বন্ধ করে সবার সামনে নামায পড়তে আদেশ দিয়েছেন। তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া আবশ্যক এজন্য বলেন নি।
.
সকল বিশেষ আমলই আবশ্যক নয় উম্মতের উপর
.
হাদীস সম্পর্কে বিধান বলতে হবে তার পূর্বাপর অবস্থা দেখে। অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে। শুধু বাহ্যিক শব্দ দেখে হুকুম আরোপিত করা বোকামী ছাড়া কিছু নয়। যদি তাই হয়, তাহলে বলতে হবে
.
১- রাসূল সাঃ সর্বদা পাগড়ী মাথায় রাখতেন। তাই এটা ফরয আমাদের উপর!?
.
২- রাসূল সাঃ সর্বদা মাথায় বাবরী রাখতেন। সর্বদা বাবরী রাখা কি ফরজ!?
.
৩- রাসূল সাঃ সব কাজ ডান দিক থেকে করতেন। এটাও ফরয আমাদের জন্য!?
.
৪- রাসূল সাঃ দাড়ি বড় করতে বলেছেন। কাটতে কোথাও বলেননি। তাহলে কি দাড়ি কখনোই কাটা যাবে না!?
.
বিস্তারিত জানতে দেখুন-
.
১-তুহফাতুল আলমায়ী-২/৩৭৮-৩৮২;

২-আদিল্লাতুল হানাফিয়্যাহ মিন আহাদিসিন নাবাবিয়্যাহ-২৫০-২৫১

৩-বাজুল মাজহুদ ফি হাল্লি আবি দাউদ-খুতবাকালে নামায পড়া অধ্যায়)
:
:
খুতবা চলাকালীন সময়ে তাহইয়াতুল মসজিদ, কথা বলা ইত্যাদি নিষেধের দলিল
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
❖ প্রশ্ন -: আমাদের এখানে খুতবা সম্পর্কিত আহকামে বলা হয়ে থাকে যে, যখন ইমাম খুতবা পাঠের জন্য মিম্বরে বসেন, তখন নামায পড়া যাবে না আর না কোন কথা, এমনকি মুখদ্বারা অন্য কাউকে বারণ করাও নিষেধ, বরং দু’আ, দরূদও জিহ্বা না নাড়িয়ে মনে মনে পড়ে নিতে হবে। অথচ হাদীছসমূহের বরাতে এ বিষয়টি প্রমাণ করা হয় যে, যদি কেউ এমন অবস্থায় মসজিদে উপস্থিত হয় যে, ইমাম খুতবা পড়ছেন, তাহলে সে হালকাভাবে দু’ রাকআত পড়ে বসে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এ সম্বন্ধে সহীহ মুসলিম, ইবনে মাজাহ, এবং আবূ দাউদ শরীফের বরাতে সুলায়ক গাতফানী (রা.) এর ঘটনা নকল করা হয় যে, যখন তিনি খুতাব দেয়াকালীন সময়ে মসজিদে আসেন এবং দু’ রাকআত নামায আদায় না করে বসে গেলেন তখন রসূলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তুমি কি দু’ আকআত নামায পড়ে বসেছো? এর নেতিবাচক জবাবে তিনি ইরশাদ করলেন উঠ, এবং দু’ রাকআত আদায় করে বস। অতঃপর লোকদেরকে সম্বোধন করে তিনি ইরশাদ করলেন, যে কেউ এমন সময়ে মসজিদে উপস্থিত হয়, সে যেন হালকাবাবে দু’ রাকআত পড়ে বসে।
.
❏ অধিকন্তু এর বিস্তারিত আলোচনায় বলা হয় যে, মারওয়ান বিন হাকামের শাসনামলে এই শাহী নির্দেশ ছিল যে, বাদশা খুতবা পড়ার সময় কেউ যেন দু’ রাকআত নামায না পড়ে। আর কারণ বলা হয়েছে, এ দ্বারা বাদশাহের অবমাননা করা হয়। কিন্তু হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) বাদশা খুতবা পাঠের সময়েই সমজিদে উপস্থিত হতেন এবং দু’ রাকআত আদায় করতেন। তার নামায জোরপূর্বক ভেঙ্গে দেয়ার পরওয়াও তিনি করতেন না। বাদশাহের কানূন রক্ষার জন্য সুন্নতে রসূল (সা.) পরিত্যাগ করা যায় না; বরং একটি সুন্নত রক্ষার জন্য বাদশাহী সমুদয় কানূন পায়ের নীচে ফেলে ধূলিসাৎ করা যেতে পারে। এ ঘটনা প্রমাণের জন্য তিরমিযী শরীফের বরাত দেয়া হয়ে থাকে। আর খুতবা পাঠকালে আগত ব্যক্তি দু’ রাকআত না পড়াকে মারওয়ানী বিদআত বলা হয়। আর মারওয়ান সম্বন্ধে বলা হয় যে, তিনি ঈদের খুতবাকে নামাযের পূর্বে প্রচলন করে ছিলেন।
.
❏ উপরোল্লিখিত আলোচনা সামনে রেখে হাদীছের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের উপায় কি হবে? আমাদের এখানে তো খুতবা পাঠকালে অন্যান্য কাজ যেমন নিষেধ তেমনি নামায পড়াকেও নিষেধ করা হয়। আর উপরোক্ত ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে, নামাযের হুকুম দেয়া হয়েছে। উক্ত হাদীছের আলোকে নামায পড়ার অনুমতি আমাদের রয়েছে কি না? যদি অনুমিত না থাকে, তাহলে আমাদের দলীল এবং উক্ত হাদীছের জবাব কি হবে? উক্ত হাদীছ শরীফে যে দু’ রাকআত নামাযের উল্লেখ রয়েছে, তা দ্বারা তো তাহইয়াতুল মসজিদ বলে বুঝা যায়, যা সম্ভবতঃ ওয়াজিবের মর্যাদা রাখে না; বরং এখানে গুরুত্ব দেয়ার কারণে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলে অনুভূত হয়। যদি তাহইয়াতুল মসজিদ (উক্ত দু’ রাকআত) এর পদ মর্যাদা সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয়, তাহলে চার রাকআত কাবলাল জুমুআ, যা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (তা খুতাব চলাকালীন সময়ে পড়া) এর অনুমতি থাকা বাঞ্ছনীয়। এ প্রসঙ্গে অপর একটি প্রশ্ন মনে উদয় হয় যে, যে ব্যক্তি হুবহু খুতবা পাঠকালে উপস্থিত হয় তার ওযূও করার প্রয়োজন হতে পারে। সে ওযূ করার কারণে ছাওয়াব নষ্ট হবে কি না?
.
❖ জবাব- : হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন, জমহুরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এবং তাবেঈনে ইযাম (রহ.) এর মতে খুতবা পাঠকালে নামায ও কথা উভয়ই নিষিদ্ধ। ইমাম আযম আবূ হানীফ (রহ.) ইমাম মালেক (রহ.) এবং অধিকাংশ ফুকাহায়ে উম্মত ইহারই প্রবক্তা। আর কুরআন ও সুন্নতের আলোকে এই তরীকাই প্রাধান্য ও সঠিক। এর বিপরীত কতক সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ও তাবেঈনে ইযাম (রহ.) খুতবা পাঠকালেও তাহইয়াতুল মসজিদ পড়ার প্রবক্তা ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) এবং পরবর্তী অধিকাংশ মুহাদ্দিছীন (রহ.) এর এ তরীকাকেই গ্রহণ করেছেন। তা সত্ত্বেও এ সকল হযরাতের অভিমতেও তাহইয়াতুল মসজিদ পড়া ইসতিহসান কিংবা জায়েযা হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে এই যে, খুতবার যেন শেষ পর্যায়ে না হয়। তাহইয়াতুল মসজিদ আদায়ে মশগুল হওয়া অবস্থায় যদি জামাআত আরম্ভ হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে, তাহলে এ অবস্থায় তাদের মতেও তাহইয়াতুল মসজিদ আদায়ে মশগুল হওয়া নিষিদ্ধ।
.
❏যে সকল সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ খুতবা পাঠকালে তাহইয়াতুল মসজিদ পড়া জায়েয কিংবা ইসতিহসান হওয়ার প্রবক্তা তাদের দলীল হলো হযরত সুলায়ক গাতফানী (রা.) এর হাদীছ, যা প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্বন্ধে আলোচনা করার পূর্বে সমীচীন হবে যে, জমহুরে উম্মত যে তরীকা গ্রহণ করেছেন যে, খুতবা পাঠকালে সালাত ও কালাম নিষিদ্ধ। এর দলীলসমূহ আলোচনা করা । আর তা হচ্ছে :
.
✏ কুরআনে করীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
.
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ* (سورة الاعراف ـ ২০৪)
.
অর্থাৎ ‘আর যখন কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাতে কান লাগিয়ে রাখ এবং নিশ্চুপ থাক, যাতে তোমাদের উপর রহমত হয়।’’
.
❏ শায়খ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, এ আয়াত নামায এবং খুতবা সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন তিনি তার ফাতওয়ায় লিখেছেন :
‘‘আর সালাফি সালিহীন (রহ.) থেকে খুবই খ্যাতির সঙ্গে বর্ণিত হয়ে এসেছে যে, এই আয়াত قرأة فى الصلوة (নামাযে কিরআত পাঠ) সম্বন্ধে নাযিল হয়েছে। আর কতক বিশেষজ্ঞের অভিমত হচ্ছে ইহা খুতবা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আর ইমাম আহমদ (রহ.) ইহার উপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন যে, এই আয়াত নামায ও খুতবা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।’’
(প্রাচীন প্রকাশ ১ম খণ্ড ১৪৩ পৃ., নতুন ২৩ খণ্ড ২৬৯পৃ.)
.
❏ অন্যত্র লিখেন :
‘‘ইমাম আহমদ (রহ.) এই বিষয়ে উম্মতের ইজাম নকল করেন যে, এই আয়াত নামায ও খুতবা সম্বন্ধে নাযিল হয়েছে।’’ (প্রথম খণ্ড ৪১২পৃ., ২৩ খণ্ড ৩১২ পৃ.)
.
❏ সুতরাং উপরোক্ত আয়াতখানা যখন নামায ও খুতবা উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ইমাম আহমদ (রহ.) ইহার উপর উম্মতের ইজমা নকল করেছেন তখন কুরআনের অকট্য দলীল نص قطعى দ্বারা খুতবা শ্রবণ করা এবং এর জন্য নীরব থাকা ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। আর সে সব সমুদয় কথা কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা শ্রবণ ও নীরবের বিপরীত হয়। এর তাৎপর্য হলো এই যে, খুতবা যেহেতু কুরআনী আয়াত দ্বারা হয় সেহেতু সম্পূর্ণ খুতবাকে الذكر (যিকর) বলে তা শ্রবণ করা ওয়াজিব করা হয়েছে। অপর দিকে খতীবের পদমর্যাদা যেহেতু আল্লাহ তায়লার প্রতিনিধির ন্যায় হয় যিনি মানুষকে আল্লাহ তাআলার আহকাম শুনাচ্ছেন সেহেতু শ্রুতাদেরকে সদা কান লাগিয়ে রাখার হুকুম দিয়ে প্রত্যেক এমন চলচ্ছক্তিকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, যা খুতবা শ্রবণে প্রতিবন্ধকাতার সৃষ্টি করে। আর যে ব্যক্তি এ স্থলে শ্রবণ উপযোগিতার বিপরীত চলচ্ছক্তি করে সে নির্বোধ কর্ম সম্পাদনকারী এবং তার জুমুআর নামাযে উপস্থিতি বাতিল, অর্থহীন এবং ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
কেননা খুতবার মধ্যে দ্বিমুখী আমল হয়। খতীব সাহেবের পক্ষ থেকে আল্লাহ তাআলার আহকাম শুনানো এবং শ্রুতাদের পক্ষ থেকে শ্রবণ করা এবং নীরব থাকা। সুতরাং উপস্থিত লোকদের থেকে যে ব্যক্তি খুতবা শ্রবণ করার ফরয দায়িত্ব থেকে আবাধ্যতা করে সে যেন খতীব এবং খুতবার অবমাননা করছে যে, খতীব তাকে আল্লাহ তায়ালার আহকাম শুনাচ্ছেন, কিন্তু শুনতে আগ্রহী নয়; বরং সে অন্য কোন অনোপযোগী কর্মে লিপ্ত রয়েছে।
সম্ভবতঃ এর ভিত্তিতেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) এর হাদীছে এ প্রকারের ব্যক্তিকে গাধার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (মিশকাত-১ম খণ্ড ১২৩ পৃ.)
এ থেকে প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, জুমুআর খুতবার পদমর্যাদা শুধু ওয়ায নসীহত নয়, বরং এতে নামাযেরও একটি শান বিদ্যমান রয়েছে। সম্ভবতঃ এই হিকমতের বিবেচনায়ই খুতবাকে জুমুআ সহীহ হওয়ার জন্য একটি শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভব এ কারণেই কতক সালাফি সালিহীন (রহ.) ইহা বুঝেছেন যে, যে ব্যক্তির জুমুআর খুতবা ছুটে যায়, তার জুমুআর নামাযই হবে না; বরং তাকে যুহর নামাযের চার রাকআত পড়তে হবে।
.
✏ কেননা হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে,
.
الخطبة موضع الركعتين من فاتته الخطبة صلى اربعا* (مصنف عبد الرزاق ص ২৩৭ ج : ৪، ابن ابى شيبة ص : ১২৮ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘জুমুআর খুতবা দু’ রাকআতের স্থলাভিষিক্ত, যে ব্যক্তির খুতবা ছুটে যায় সে যেন চার রাকআত পড়ে নেয়।’’
.
✏ আর হযরত তাউস (রহ.) মুজাহিদ (রহ.) হযরত আতা (তাবেঈ) (রহ.) থেকে নকল করেন,
.
فمن لم يدرك الخطبة صلى اربعا* (عبد الرزاق ص : ২৩৮ ، ابن ابى شيبة ص : ১২৮)
.
অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি খুতবা পায়নি সে চার রাকআত পড়বে।’’
.
যদিও জমহুরে উম্মতের মতে সে ব্যক্তির জুমুআর দু’ রাকআতই পড়তে হবে। কিন্তু উক্ত আছার থেকে জুমুআর খুতবার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়।
.
সার কথা উপরোল্লিখিত আয়াত শরীফে জুমুআর খুতবা শ্রবণ করাকে ফরয করে দেয়া হয়েছে। কাজেই খুতবা পাঠকালে সালাত, কালাম, যা শ্রবণের প্রতিবন্ধক হয়, তা উক্ত আয়াতে করীমার আলোকে নিষিদ্ধ হবে।
.
░▒▓█►নবী (সা.) এর হাদীছ সমূহ◄█▓▒░
.
উপরোক্ত বিষয়টিই রসূলুল্লাহ (সা.) এর মুতাওয়াতির হাদীছ শরীফ সমূহে বর্ণিত হয়েছে।
✏ ১। হযরত সালমান ফারসী (রা.) এর রিওয়ায়তে রসূলুল্লাহ (সা.) এর এই ইরশাদ বর্ণিত হয়েছে :
.
لاَ يَغْتَسِلُ رَجُلٌ يَوْمَ الجُمُعَةِ، وَيَتَطَهَّرُ مَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ، وَيَدَّهِنُ مِنْ دُهْنِهِ، أَوْ يَمَسُّ مِنْ طِيبِ بَيْتِهِ، ثُمَّ يَخْرُجُ فَلاَ يُفَرِّقُ بَيْنَ اثْنَيْنِ، ثُمَّ يُصَلِّي مَا كُتِبَ لَهُ، ثُمَّ يُنْصِتُ إِذَا تَكَلَّمَ الإِمَامُ، إِلَّا غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الجُمُعَةِ الأُخْرَى (صحيح يخارى ص : ১২১ ج : ১، ص : ১২৪ ج : ১)
.
অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি জুমুআর দিন গোসল করবে এবং উত্তমভাবে পবিত্রতা লাভ করবে। তৈল লাগাবে এবং ঘরের মধ্যে সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করবে, অতঃপর জুমুআর জন্য বের হয়ে পড়েব, অতঃপর মসজিদে যেয়ে দু’জনের মধ্য থেকে কাউকে উঠিয়ে না বসে কিংবা মসজিদে উপস্থিত হয়ে না বসে আল্লাহ তাআলার তাওফীক মুতাবিক নামায পড়ে নেয়, অতঃপর যখন ইমাম খুতবা আরম্ভ করে তখন নীরব থাকে, তাহলে এ রকম ব্যক্তির দু’জুমুআর মধ্যবর্তী যাবতীয় (সগীরা) গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’’
.
✏ ২। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) এর হাদীছ বিন্মোক্ত শব্দসমূহে বর্ণিত হয়েছে।
.
فصلى ما قدر له ثم انصت حتى يفرغ من خطبته* ( ص : ২৮৩ ج : ১)
.
অর্থাৎ ‘যে পরিমাণ নামায আদায় করা তার ভাগ্যে ছিল সে পরিমাণ নামায পড়ে। অতঃপর নীরব রইল যতক্ষণ না ইমাম খুতবা থেকে অবসর হন। ………শেষ পর্যন্ত।
.
✏ ৩। হযরত আবূ আয়্যূব আনসারী (রা.) থেকে উক্ত বিষয়বস্তুর হাদীছ এ শব্দসমূহে বর্ণিত আছে :
.
ثم خرج الى المسجد فيركع ان بدا له ـ ولم يؤذ احدا ثم انصت حتى يصلى* (رواه احمد والطبرانى فى الكبر ورجاله ثقات مجمع الزوائد ص : ১৭১ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘অতঃপর সে মসজিদের দিকে বের হল। অতঃপর নামায পড়তে রইল। যতক্ষণ তার মনে চেয়েছে এবং কাউকেও কষ্ট দেয়নি। অতঃপর জুমুআর নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত নিশ্চুপ রইল।’’
.
✏ ৪। হযরত আবূ দারদা (রা.) এর হাদীছে রয়েছে :
.
وركع ما قضى له ثم انتظر حتى ينصرف الامام* (رواه احمد و الطبرانى فى الكبر عن حرب بن قيس عن ابى الدرداء ، وحرب لم يسمع من ابى الدراء زوائد ص : ১৭১ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘আর যে পরিমাণ নামায পড়া তার ভাগ্যে ছিল তা পড়ল। অতঃপর ইমাম নামায শেষ করা পর্যন্ত নীরব রইল।
.
✏ ৫। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এবং আবূ হুরায়রা (রা.) এর হাদীছে আছে :
.
ثم صلى ما كتب الله له ثم انصت اذا خرج الامام* (ابوداود ص : ৫০ ج : ১، واللفظ له طحاوى ص : ১৮০ ج : ১)
.
অর্থাৎ‘অতঃপর সে নামায পড়ল যা আল্লাহ তাআলা তাকে তাওফীক দিয়েছেন। অতঃপর ইমাম যখন খুতবা পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেল তখন সে নীরব রইল।’’
.
উপরোক্ত হাদীছসমূহের মধ্যে দু’টো বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়।
.
❏ এক, এই যে, রসূলুল্লাহ (সা.) নামায পড়ার সময়সীমা খুতবা আরম্ভ করার পূর্ব পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যার মর্মার্থ হলো এই যে, যে ব্যক্তি খুতবা আরম্ভ হওয়ার পর নামায পড়বে সে রসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্ধারিত সীমা লংঘন করলো।
.
❏ দুই, এই যে, উল্লেখিত হাদীছসমূহে রসূলুল্লাহ (সা.) নামায এবং নীরব থাকাকে পরস্পর বিপরীতমূখী বলে উল্লেখ করেছেন। খুতবার পূর্বে নামায এবং খুতবা চলাকালীন সময়ে নিশ্চুপ থাকা যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খুতবা চলাকালীন সময়ে নামায পড়া নীরবের পরিপন্থী হয়। যেহেতু খুতবা পাঠকালে নীরব থাকা ওয়াজিব সেহেতু নামায এবং কালাম উভয়ই নিষিদ্ধ হবে।’’
.
✏ ৬। সিহাহ সিত্তাহ’ এর মধ্যে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে প্রসিদ্ধ হাদীছ বর্ণিত আছে, যাতে রসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মুহুর্তে আগমনকারীদের মর্যাদা ক্রমানুসারে বর্ণনা করে বলেছেন :
.
فاذا خرج الامام طووا صحفهم ويستمعون الذكر * (صحيح بخارى ص : ১২৭ ج : ১ صحيح مسلم ص : ২৮৩ ج : ১ )
.
অর্থাৎ ‘যখন ইমাম খুতবার জন্য দণ্ডায়মান হন তখন ফিরিশতাগণ তাদের লেখার খাতা বন্ধ করে রেখে দেন এবং যিকর শুনতে ব্যস্ত হয়ে যান।’’
.
এ বিষয়বস্তুর হাদীছ হযরত আবূ উমাম (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে। যার শব্দসমূহ নিন্মরূপ।
.
حتى اذا خرج الامام رفعت الصحف* (رواه احمد الطبرانى فى الكبر نحوه ورجل احرتقات مجمع زوائد ص : ১৭৭ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘এমন কি যখন ইমাম খুতবা পাঠের জন্য বের হয়ে আসেন, তখন সহীফাসমূহ উঠিয়ে নেয়া হয়।’’
.
✏ ৭। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকেও এ বিষয়ের হাদীছ বর্ণিত আছে :
.
فاذا اذن المؤذنون وجلس الامام على المنبر طويت الصحف ودخلوا المسجد يستمعون الذكر* (رواه احمد ورجاله ثقات ، زوائد ص : ১৭৭ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘অতঃপর যখন মুয়াযযিনগণের আযান আরম্ভ হয়ে যায় এবং ইমাম মিম্বরে বসে যান তখন সহীফাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ফিরিশতাগণ মসজিদে এসে যিকর শুনতে থাকেন।’’
.
ইমাম বের হয়ে আসার পর ফিরিশতাগণ আমলনামা বন্ধ করে যিকর শ্রবণে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া, এই বিষয়ের দলীল যে, খুতবা চলাকালীন সময়ে যিকর শ্রবণ ব্যতীত যাবতীয় কাজকর্ম বন্ধ রাখার সময়। এ সময় মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ ব্যতীত অন্য কোন নেক আমল করার অবকাশ নেই। নামাযও নয় আর না কোন কথা বলার অবকাশ রয়েছে। আর এই বিষয়বস্তুটি বিভিন্ন হাদীছে স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন :
.
✏ ৮। মুসনাদে আহমদ ৫ম খণ্ডের ৭৫ পৃষ্ঠায় হযরত নবীশাহুযালী (রা.) রিওয়ায়তে রসূলুল্লাহ (সা.) এর এই ইরশাদ বর্ণিত আছে :
.
ان المسلم اذا اغتسل يوم الجمعة ثم اقبل الى المسجد ، ولا يوذى احدا فان لم يجد الامام خرج صلى ما بدا له وان وجد الامام قد خرج جلس فاستمع وانصت حتى يقضى الامام جمعته وكلامه الخ* (رواه احمد ورجاله رجال الصحيح خلا شيخ احمد وهو ثقة ـ زوائد ص : ১৭১ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘যখন কোন মুসলমান জুমুআর দিন গোসল করে মসজিদে রওয়ানা হয় এবং কাউকে কষ্ট দেয় না, অতঃপর দেখতে পায় যে, ইমাম এখনো বের হয়নি, তখন সে যত রাকআত নামায পড়ার ইচ্ছা করে তত রাকআত পড়ে নিবে। আর যদি ইমাম বের হয়ে এসে যায় তাহলে বসে শ্রবণ করতে থাকবে এবং নীরব থাকবে যতক্ষণ না ইমাম খুতবা ও নামায সমাপ্ত করবেন …….শেষ পর্যন্ত।
.
✏ ৯। ইমাম তাবরানী (রহ.) মু’জামি’ কবীর’ গ্রন্থে হযরত ইবনে উমর (রা.) এর বিওয়ায়তে রসূলুল্লাহ (সা.) এর নিন্ম লিখিত ইরশাদ নকল করেছেন।
.
واذا دخل احدكم المسجد والامام على المنبر فلا صلوة ولا كلام حتى يفرغ الامام* (وفيه ايوب بن نهيك ، وهو متروك ضعفه جماعة ، وذكر ابن حبان فى الثقات وقال يخطئ ) زوائد ص : ১৮৪ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘যখন তোমাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি এমন সময় মসজিদে প্রবেশ করে যখন ইমাম মিম্বরের উপর রয়েছেন, তাহলে নামায ও কথা বন্ধ রাখবে যতক্ষণ না ইমাম অবসর হবেন।’’
উপরোক্ত রিওয়ায়তের একজন রাবী যদিও বিতর্কিত, তবে আল্লামা হায়ছমী (রহ.) ইবনে হিব্বান (রহ.) থেকে তার নির্ভরযোগ্যতাও নকল করেছেন। কিন্তু উপরোক্ত রিওয়ায়তে হুবহু সেই বিষয়বস্তুই বিদ্যমান, যা কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীছসমূহে পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

এতদ্ব্যতীত বিভিন্ন মুতাওয়াতির হাদীছসমূহে এই বিষয়বস্তুটি বর্ণিত হয়েছে যে, খুতবা চলাকালীন সময়ে কথা বলার অনুমতি নেই। এমন কি যে, কোন ব্যক্তি খুতবা চলাকালীন সময়ে অন্য কোন ব্যক্তিকে নিশ্চুপ করানোর উদ্দেশ্যে انصت (চুপ কর) কিংবা صه (নিশ্চুপ থাক) শব্দটি বলবে তার জুমুআও নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ সামর্থ্য অনুযায়ী امر بالمعروف (সৎ কাজের আদেশ) করা ওয়াজিব। কাজেই খুতবার সময় যখন এমন একটি ওয়াজিব কাজ করা নিষেধ, যা শ্রবণ ও নীরবতার ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে তাইয়াতুল মসজিদ যেমন মুস্তাহাব আমল আরো স্পষ্টভাবে নাজায়েয হবে। তাছাড়া এই তাতইয়াতুল মসজিদ নামাযটি চুপ’ শব্দটি বলা থেকে অধিক استماع (শ্রবণ) এর অন্তরায় হয়। এর উদাহরণ এইরূপ যে, কুরআন মজীদে পিতামাতাকে اف বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এ থেকে শরীয়আত বিশেষজ্ঞগণ ইহা বুঝেছেন যে, যখন পিতামাতাকে اف বলা জায়েয নয় তখন মারধর করা যা পাপের দিকে দিয়ে اف বলার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ তা অধিকতরভাবে নাজায়েয হবে। ঠিক অনুরূপ যখন রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা পাঠকালে صه (নিশ্চুপ থাক) বলার অনুমতি দেননি; বরং এ দু’বর্ণের শব্দকেও অর্থহীন এবং জুমুআ নষ্টকারী বলে ইরশাদ করেছেন, তাহলে নামায, যা উহা থেকেও অধিকতর শ্রবণের অন্তরায় হয়, তা আরো কঠোরতর না জায়েয হবে।
.
░▒▓█►সালাফি সালিহীনের আমল◄█▓▒░
.
কুরআন ও হাদীছ শরীফের অকাট্য দলীলের পর এ মাসয়ালায় হযরাতে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ও তাবেঈন (রহ.) এর আ’মলের প্রতি লক্ষ্য করা হোক :
.
❁ ১। মুয়াত্তা ইমাম মালেক (রহ.) এর মধ্যে ইমাম যুহরী (রহ.) এর রিওয়ায়তে হযরত ছা’লাব বিন আবী মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে :
.
أَنَّهُمْ كَانُوا فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، يُصَلُّونَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، حَتَّى يَخْرُجَ عُمَرُ بْنِ الْخَطَّابِ، فَإِذَا خَرَجَ عُمَرُبْنِ الْخَطَّابِ، وَجَلَسَ عَلَى الْمِنْبَرِ، وَأَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ، جَلَسْنَا نَتَحَدَّثُ، حتى إذاسَكَتَ الْمُؤَذِّنُ وَقَامَ عُمَرُ سكتنا، فَلَمْ يَتَكَلَّمْ مِنَّا أَحَدٌ.قَالَ مَالِكٌ: قَالَ ابْنُ شِهَابٍ: خُرُوجُ الإِمَامِ يَقْطَعُ الصَّلاَةَ، وَكَلاَمُهُ يَقْطَعُ الْكَلاَمَ.
.
অর্থাৎ ‘হযরত উমর (রা.) এর যুগে লোকেরা জুমুআর দিন নামায আদায় করতে থাকতেন যতক্ষণ না হযরত উমর (রা.) তাশরীফ আনতেন। অতঃপর যখন হযরত উমর (রা.) তশরীফ এনে মিম্বরে বসে যেতেন এবং মুয়াযযিন আযান দিতেন। রাবী ছা’লাবা (রা.) বলেন, তখন আমরা বসে বসে পরস্পর কথাবর্তা বলতাম। অতঃপর যখন মুয়াযযিন আযান শেষ করতেন এবং হযরত উমর (রা.) খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন তখন আমরা নিশ্চুপ হয়ে যেতাম। অতঃপর আমাদের মধ্যে থেকে কেউ কথা বলতেন না। ইবনে শিহাব যুহরী (রহ.) বলেন, সুতরাং ইমাম বের হয়ে আসার কারণে নামায বন্ধ হতো এবং ইমামের খুতবার কারণে মানুষের পরস্পরের মধ্যকার কথাবার্তা বন্ধ হতো।’’
.
মুসান্নাফ ইবনে শায়বা এর মধ্যে হযরত ছা’লাবা বিন আবী মালেক (রা.) এর বিওয়ায়ত এ শব্দসমূহে বর্ণিত আছে :
.
ادركت عمر وعثمان فكان الامام اذا خرج يوم الجمعة تركنا الصلوة*
.
অর্থাৎ ‘আমি হযরত উমর (রা.) এবং হযরত উছমান (রা.) এর যুগ পেয়েছি। সুতরাং জুমুআর দিন যখন ইমাম খুতবা দেয়ার জন্য বের হতেন তখন আমরা নামায আদায় করা ছেড়ে দিতাম।’’
.
❁ ২। নসবুর রায়াহ’ গ্রন্থের (২য় খণ্ডের ২০৪ পৃষ্ঠার) মধ্যে মুসনাদে ইসহাক বিন রাহওয়াই (রহ.) থেকে হযরত সায়িব বিন ইয়াযিদ (রা.) এর বাণী নকল করেন :
.
كنا يصلى فى زمن عمر يوم الجمعة فاذا خرج عمر وجلس على المنبر قطعنا الصلوة ، وكنا نتحدث ويحدثونا وربما نسأل الرجل الذى يليه عن سوقه ومعاشه فاذا سكت المؤذن خطب ولم يتكلم احد حتى يفرغ من خطبته*
.
অর্থাৎ ‘হযরত উমর (রা.) এর খিলাফত যুগে আমরা জুমুআর দিন নামায আদায় করতে থাকতাম। অতঃপর যখন হযরত উমর (রা.) এসে মিম্বরে আসন গ্রহণ করতেন তখন আমরা নামায বন্ধ করে দিতাম। আর আমরা পরস্পর কথাবার্তা বলতাম এবং কখনো এক ব্যক্তি নিজ পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিকে বাজার ও জীবিকার হালঅবস্থা সমন্ধে জিজ্ঞাসা করে নিত। অতঃপর যখন মুয়াযযিন আযান শেষ করতেন এবং হযরত উমর (রা.) খুতবা আরম্ভ করতেন তখন তার খুতবা দেয়া সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কেউ কথা বলতো না।’’
হাফিয (রহ.) দিরায়াহ’ গ্রন্থে বলেন যে, উহার সনদ উত্তম।’’ (হাশিয়ায়ে নুসবুর রায়াহ ২য় খ- ২০৩ পৃ.)
.
❁ ৩। মুয়াত্তা গ্রন্থে হযরত উছমান (রা.) থেকে নকল করেন যে, তিনি সাধারণতঃ স্বীয় খুতবায় বলতেন :
.
واذا قام الامام فاستمعوا و انصتوا فان للمنصت الذى لايسمع من الخطبة مثل ما للسامع المنصت * (موطا امام محمد ص : ১৩৮)
.
অর্থাৎ ‘যখন ইমাম খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যান তখন তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর এবং নিশ্চুপ থাক; কেননা নিশ্চুপ হয়ে যদিও সে খুতবা না শুনে, তার জন্যও সেই ব্যক্তির সমপরিমাণ ছাওয়াব রয়েছে যে ব্যক্তি নীরব থেকে খুতবা শ্রবণ করে।’’
.
❁ ৪। মুসান্নাফে আব্দুর রযযাক’ গ্রন্থে হযরত আলী (রা.) এর বাণী নকল করেছেন যে, জুমুআর মধ্যে তিন প্রকারের লোক অংশ গ্রহণ করে।
.
এক, সেই ব্যক্তি যে, ধীরতা, গাম্ভীর্যতা এবং নীরবতার সঙ্গে জুমুআর হাজির হয়। এ তো এমন ব্যক্তি যার এক জুমুআ থেকে অপর জুমুআ পর্যন্ত কৃত সকল (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (রাবী বলেন যে, আমার ধারণা যে, তিনি ইহাও বলেছিলেন যে) আরো তিন দিন অতিরিক্ত।
.
দুই, সেই ব্যক্তি যে জুমুআর নামাযে শরীক হয়ে لغو ( বেহুদা) কর্মে লিপ্ত হয়, তার প্রাপ্য অংশ তো কেবল উক্ত لغو (অনর্থকই)। (অর্থাৎ নেকী বরবাদ হয়ে গুনাহ ভাগ্যে জুটবে)।
.
তিন,
ورجل صلى بعد خروج الامام فليست بسنة ـ ان شاء اعطاه وان شاء منعه*
অর্থাৎ ‘সেই ব্যক্তি যে ইমাম খুতবা দেয়ার লক্ষ্যে দাড়িয়ে যাওয়ার পর নামায পড়ে। তার এ নামায সুন্নত মুতাবিক হয়নি। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে ছাওয়াব দিবেন এবং তিনি ইচ্ছা করলে নাও দিতে পারেন।’’
.
❁ ৫। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, জুমুআর খুতবা পাঠকালে মানুষ কি নামায পড়তে পারে? তিনি জবাবে বললেন, যদি সবাই পড়তে থাকে তাহলেও কি তা সঠিক হবে? (বরাত ঐ-২৪৫ পৃ.)
.
❁ ৬। হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইমাম আসার পূর্বে নামায পড়তেন। ইমাম আসার সময় হলেই তিনি নামায পড়া বন্ধ করে দিতেন; বরং বসে যেতেন। (রাবত ঐ-২১০ পৃ.)
.
❁ ৭। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা গ্রন্থে হযরত আলী, হযরত ইবনে উমর এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে নকল করেন :
.
انهم كانوا يكرهون الصلوة والكلام بعد خروج الامام* (ص : ১১১ ج :২)
.
অর্থাৎ ‘তাদের সবার মতে ইমাম খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর নামায ও কথাবার্তা উভয়ই মাকরূহ।’’
.
❁ ৮। ইমাম তহাভী (রহ.) হযরত উকবা বিন আমির (রা.) এর বাণী নকল করেছেন যে,
.
الصلوة و الامام على المنبر معصية* (طحاوى ص : ১৮১ ج : ১)
.
অর্থাৎ ‘ইমাম মিম্বরের উপর থাকাকালীন সময়ে নামায পড়া গুনাহ।’’
.
❁ ৯। হযরত ছা’লাবা বিন আবী মালিক (রা.) এর বাণী নকল করেন :
.
جلوس الامام على المنبر يقطع الصلوة وكلامه يقطع الكلام* (حواله مذكورة)
.
অর্থাৎ ‘ইমাম মিম্বরের উপর বসা, নামায বন্ধ করে দেয় এবং তার কালাম (খুতবা পাঠ) করা অন্যদের কথাবার্তাকে বন্ধ করে দেয়।’’ (বারাত ঐ)
.
❁ ১০। মাআরিফুস সুনান’ গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ৩৬৮ পৃষ্ঠায় কাযী আয়্যায (রহ.) এর বরাতে নকল করেন যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.) খুতবা পাঠকালে নামায পড়তে নিষেধ করতেন।’’
.
❁ ১১। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’ গ্রন্থে সায়্যিদুত তাবেঈন হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যাব (রা.) এর বাণী নকল করেন :
.
خروج الامام يقطع الصلوة وكلامه يقطع الكلام* (عبد الرزاق ص : ২০৮ ج : ২)
.
অর্থাৎ ‘‘ইমাম খুতবার জন্য প্রস্তুত হওয়া নামায বন্ধ করে দেয় এবং তার কালাম (খুতবা) অন্যদের কালাম (কথাবার্তা) বন্ধ করে দেয়।
.
❁ ১২। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৩য় খণ্ডের ২৪৫ পৃষ্ঠায় এবং ইবনে আবী শায়বা ২য় খণ্ডের ১১১ পৃষ্ঠায় কাযী শুরায়হ (রহ.) থেকে নকল করেন যে, তিনি খুতবা চলাকালীন সময়ে নামায পড়ার প্রবক্তা ছিলেন না।
.
❁ ১৩। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৩য় খণ্ডের ২৪৫-২৪৬ পৃষ্ঠায় হযরত কাতাদাহ (রহ.) এবং হযরত আতা (রহ.) থেকে উপরোক্ত অভিমতই নকল করেছেন।
.
❁ ১৪। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা গ্রন্থে ইবনে সীরীন (রহ.) উরওয়া বিন যুবায়র (রহ.) এবং ইমাম যুহরী (রহ.) থেকেও খুতবার সময় নামায ও কথাবার্তার নিষেধাজ্ঞার অভিমত নকল করা হয়েছে।
.
░▒▓█►হযরত সুলায়ক গাতফানী (রা.) এর ঘটনা◄█▓▒░
.
প্রশ্নের মধ্যে হযরত সূলায়ক গাতফানী (রা.) এর যে ঘটনার বরাত দেয়া হয়েছে সে সম্বন্ধে কতিপয় বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরী।
.
✏ ১। পূর্বে এ বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে যে, কুরআন মাজীদ খুতবা শ্রবণ করা ও নিশ্চুপ থাকাকে ফরয সাব্যস্ত করেছে। আর রসূলুল্লাহ (সা.) এর মুতাওয়াতির হাদীছসমূহেও উক্ত বিষয়টিরই তাকীদ বর্ণিত হয়েছে। খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.), অর্ধিকাংশ সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ও তাবেঈন (রহ.) কুরআন ও সুন্নতের উক্ত অকাট্য প্রমাণসমূহ সম্মুখে রেখে খুতবা পাঠকালে সালাত এবং কালাম তথা কথাবার্তা সমর্থক ছিলেন না। আর এটাই স্পষ্ট যে, সুলায়ক গাতফানী (রা.) এর ঘটনা তাদের জানা ছিল। কেননা আমরা তো উক্ত ঘটনা রিওয়ায়তের মাধ্যমে অবগত হয়েছি কিন্তু উল্লিখিত আকাবিরে হযরাত উক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। কেননা ঘটনাটি জুমুআর নামাযের গণসমাবেশ স্থলে ঘটেছিল। আর রসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সুলায়ক (রা.) কে উদ্দেশ্য করে যা কিছু ইরশাদ করেছেন, তা মিম্বরের উপর থেকেই করেছিলন। কাজেই উক্ত ঘটনার এ ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই যে, হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রা.) উক্ত ঘটনা এবং রসূলুল্লাহ (সা.) এর সে সম্পর্কিত ইরশাদের ইলম ছিল না।
.
আর এটাও হতে পারে না যে, হাযরাতে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) জেনে-শুনে এবং কোন যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে হাদীছে নবী (সা.) কে পরিত্যাগ করেছেন এবং হাদীছে নবীর অকাট্য দলীলের বিপরীত অভিমত পোষন করে থাকবেন। কেননা যদি এ সম্ভবনাকে স্বীকার করে নেয়া হয়, তাহলে হযরাতে খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.), জমহুর সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এবং তাবেঈন (রহ.) এর দ্বীন ও সততার উপর থেকেই বিশ্বাস্ততা উঠে যাবে। আর এ সম্ভাবনা তো কেবল রাফেযীদের মস্তিষ্কে আসতে পারে, কিন্তু কোন সহীহ আকীদা পোষনকারী কোন মুসলমান এর কল্পনাও করতে পারে না।
.
আর ইহাও প্রকাশ্য যে, উক্ত সকল আকাবিরে উম্মত আমাদের চেয়ে অধিকতর সুন্নতের অনুসারী এবং নেককর্মসমূহের প্রত্যাশী ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সুলায়ক (রা.) কে যে হুকুম দিয়েছেন, যদি তা সবার জন ব্যাপক হুকুম হতো, তাহলে সকল সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বিশেষভাবে হযরাতে খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) উক্ত হুকুম মুতাবিক আমল না করা অবম্ভব ছিল। আর উক্ত ছাওয়াবের কর্ম থেকে না কেবল নিজেরা বঞ্চিত থাকতেন; বরং অন্যান্যদেরকেও বঞ্চিত থাকতে নিষেধ করতেন।
.
✏ ২। উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যার যথার্থতা সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও প্রকাশ্য, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত আকাবিরে হযরাত যখন সুলায়ক (রা.) এর হাদীছের উপর আমল করেননি, তখন এর কোন যুক্তিসংগত ও সহীহ কারণ অবশ্যই রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, সে কারণটি কি?
এর জবাব কেবল আমাদের দায়িত্বই নয়; বরং সেই সকল লোকদের দায়িত্বেও রয়েছে, যারা হযরাতে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এবং খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) কে হক্ক এবং বিশ্বস্ততার পতাকাধারী তথা মাপকাঠি বলে বিশ্বাস করেন এবং যাদের মস্তিষ্ক রাফেযীদের মালিন্য থেকে মুক্ত রয়েছে। যদি কোন হাদীছের বিরোধীতার অভিযোগ ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) এর প্রতি হয়, তাহলে এর জবাব দেয়ার দায়িত্ব হয়তো কেবল হানাফী মতাবলম্বীগণের উপর ফরয হয়ে দাড়ায়, কিন্তু খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) তো কেবল হানাফীগণের নয়। কাজেই যদি কোন হাদীছের বিরোধীতার অভিযোগ খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এর প্রতি হয়, তাহলে এর জবাব দেয়ার দায়িত্ব প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয হয়ে যায়।
.
আর এখান থেকেই এই মূলতত্ত্বও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় যে, খবরে ওয়াহিদের গুরুত্ব কি অত্যধিক কিংবা খুলাফায়ে রাশিদীন এবং হযরাতে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর আ’মলের গুরুত্ব অত্যধিক? অর্থাৎ যদি খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর আ’মল কোন খবরে ওয়াহিদের বিপরীত হয় ( যেমন আমাদের আলোচ্য মাসয়ালায়) তাহলে খবরে ওয়াহিদকে ওয়াজিবুল আ’মল গণ্য করে কি উক্ত আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কে অভিযুক্ত করা যাবে? কিংবা উক্ত আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর আ’মলের আলোকে স্বয়ং খবরে ওয়াহিদকে তাবীল তথা ব্যাখ্যাযোগ্য বলে অনুভব করা হবে? প্রথম রাস্তাটি রাফেযী ও বিদআতীদের দিকে যায় এবং দ্বিতীয় রাস্তাটি ما انا عليه واصحابى (আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর রয়েছেন আল-হাদীছ) এর দিকে রয়েছে। সুতরাং এখন প্রত্যেক ব্যক্তির এই স্বাধীনতা রয়েছে যে, উক্ত রাস্তাদ্বয়ের যে কোন একটি রাস্তা গ্রহণ করে নেবে।
.
✏ ৩। উক্ত আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) হযরত সুলায়ক গাতফানী (রা.) রিওয়ায়তকে যে আমলযোগ্য মনে করেননি, আমাদের মতে এ দুটি কারণ হতে পারে।
.
❑ এক, এই যে, তারা জানতেন যে, সুলায়ক (রা.) কে রসূলুল্লাহ (সা.) দু’ রাকআত পড়ার যে হুকুম দিয়েছিলেন, তা ব্যাপক হুকুম নয়; বরং ইহা কেবল তারই জন্য একটি বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী হুকুম ছিল।
.
❑ দুই, এই যে, উক্ত আকাবিরে হযরাতে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) অবহিত ছিলেন যে, এ ঘটনার পর রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা পাঠকালে সালাত ও কালাম করতে নিষেধ করেছেন। কাজেই এখন উক্ত হুকুম রহিত হয়ে গেছে।
.
✏ ৪। রসূলুল্লাহ (সা.) এর ইরশাদটি যে শুধু হযরত সুলায়ক (রা.) এর জন্য বিশেষত্ব ছিল এবং তা ব্যাপক হুকুম ছিল না, এর কিছু কারণ নিন্মে উদ্ধৃতি করা হলো।
.
❑ (ক) বিশেষত্বের এক দলীল এই যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যে, তারা খুতবা চলাকালীন সময়ে উপস্থিত হয়েছেন অথচ রসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দু’ রাকআত আদায় করতে হুকুম দেননি। উদাহরণত :
.
❀ ১। সহীহ বুখারী শরীফের ১ম খণ্ডের ১২৭ পৃষ্ঠায় باب الاستسقاء فى المسجد এর মধ্যে সেই ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যিনি খুতবা চলাকালীন সময়ে এসেই বৃষ্টির জন্য দু’আর দরখাস্ত করে ছিলেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা.) তাকে দু’ রাকআত পড়তে হুকুম দেননি।
.
❀ ২। অতঃপর উক্ত রিওয়ায়তে সেই ব্যক্তির পরবর্তী জুমুআর আসার কথা উল্লেখ রয়েছে। কন্তিু সে সময়ও তাকে দু’ রাকআত পড়ার নির্দেশ দেননি।
.
❀ ৩। আবূ দাঊদ ১ম খণ্ডের ১৫৬ পৃষ্ঠায় باب الامام يكلم الرجل فى خطبته এর মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা পাঠকালে এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করলেন ‘বসে যাও’। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রা.) তখনও মসজিদের দরজার বাইরে ছিলেন, পবিত্র ইরশাদ শুনে তিনি সে স্থানেই বসে গেলেন। অতঃপর যখন রসূলুল্লাহ (সা.) এর মুবারক দৃষ্টি তার উপর পতিত হলো তখন তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করলেন, ইবনে মাসউদ! ভিতরে এসে যাও; কিন্তু তিকি তাকে দু’ রাকআত পড়ার হুকুম দেননি।
.
❀ ৪। আবূ দাউদ ১ম খণ্ডের ১৫৯ পৃষ্ঠায় এবং নাসায়ী ১ম খণ্ডের ২০৭ পৃষ্ঠায় সেই ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যিনি খুতবা চলাকালীন সময়ে লোকদের গ্রীবাসমূহের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছিল। রসূললুল্লাহ (সা.) তাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করলেন اجلس فقد اذيت ‘বসে যাও, তুমি লোকদেরকে কষ্ট দিচ্ছ।’’ কিন্তু তাকে দু’ রাকআত পড়ার হুকুম দেননি।
.
❑ (খ) রিওয়ায়তসমূহ এ বিষয়ে সম্মত যে, রসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সুলায়ক (রা.) কে বসে যাওয়ার পর তাকে দু’ রাকআত পড়ার হুকুম দিয়েছিলেন। অথচ বসে যাওয়ার পর তাহইয়াতুল মসজিদ অকেজো হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি মসজিদে উপবিষ্ট রয়েছে তার জন্য খুতবা পাঠকালে নফলসমূহ পড়া কারো মতে জায়েয নয়। কাজেই যতি ইহা বিশেষ ও ব্যত্রিকমধর্মী হুকুম না হতো, তাহলে তার বসে যাওয়ার পর (আর তাও খুতবা চলাকালীন সময়ে) তাকে নফল পড়া হুকুম দেয়া হতো না।
.
❑ (গ) অধিকন্তু রিওয়ায়তসমূহ থেকে ইহাও প্রতীয়মান হয় যে, রসূলুল্লাহ (সা.) তখনো মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন, (দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়া শুরু করেননি) হযরত সুলায়ক (রা.) এসে বসে গেলেন। এ থেকে মনে হচ্ছে যেন তার সঙ্গে কথাবার্তা খুতবা চলাকালীন সময়ে হয়নি; বরং খুতবা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে হয়েছিল। যেমন সহীহ মুসলিম শরীফের ১ম খণ্ডের ২৮৭ পৃষ্ঠায় আছে :
.
جاء سليك الغطفانى يوم الجمعة ورسول الله صلى الله قاعد على المنبر فقعد سليك قبل ان يصلى الخ*
.
অর্থাৎ ‘হযরত সুলায়ক গাতফানী (রা.) জুমুআর দিন সে সময় উপস্থিত হলেন যখন রসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বরে উপবিষ্ট ছিলেন। সুতরাং হযরত সুলায়ক (রা.) নামায পড়ার পূর্বেই বসে পড়েলেন।
.
ইমাম নাসায়ী (রহ.) সুনানে কুবরা’ গ্রন্থে উপরোক্ত রিওয়ায়তের ভিত্তিতে এ অনুচ্ছেদ কায়িম করেছেন باب الصلوة قبل الخطبة (অনুচ্ছেদঃ খুতবার পূর্বে নামাযের বর্ণনা।)-(নসবুর রায়াহ ২য় খ- ২০৪ পৃ.)।
.
অধিকন্তু ইহাও বর্ণিত আছে যে, হযরত সুলায়ক (রা.) যতক্ষণ পর্যন্ত না দু’ রাকআত নামায পড়া শেষ করেছেন ততক্ষণ রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা শুরু করেননি। যেমন দারা কুতনী ১৬৯ পৃষ্ঠায় রিওয়ায়তে আছে :
.
فقال النبى صلى الله عليه وسلم قم فاركع ركعتين ، وامسك عن خطبته حتى فرغ من صلوته*
.
অর্থাৎ ‘নবী করীম (সা.) ইরশাদ করলেন, উঠ! দু’ রাকআত পড়ে নাও। আর রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা দেয়া থেকে বিরত রইলেন। যতক্ষণনা হযরত সুলায়ক (রা.) স্বীয় নামায থেকে অবসর হলেন।’’
.
ইমমা দারা কুতনী উক্ত রিওয়ায়তকে মুসনাদ এবং মুরসাল উভয়ভাবে রিওয়ায়ত করে লিখেন যে, মুরসাল সহীহ। আর মুরসাল রিওয়ায়ত যদি সহীহ হয়, তাহলে অনেক আহলে ইলমের মতে দলীল হিসাবে গৃহীত হয়। আর যদি তা বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয় কিংবা এর সমর্থনে অন্য কোন রিওয়ায়ত বিদ্যমান থাকে, তাহলে সকল আহলে ইলমের মতে দলীল হিসাবে গৃহীত হয়। এখানে শেষোক্ত তরীকাই বিদ্যমান রয়েছে। কেননা ইমাম দারা কুতনী (রহ.) আরো একটি রিওয়ায়ত (আবূ মা’শার থেকে, তিনি মুহাম্মদ থেকে, তিনি কায়স (রহ.) এর সূত্রে) উক্ত রিওয়ায়তের সমর্থনে নকল করেন। এই রিওয়ায়ত মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা গ্রন্থে এই শব্দসমূহে রয়েছে :
.
ان النبى صلى الله عليه وسلم حيث امره ان يصلى ركعتين امسك عن الخطبة حتى فرغ من ركعته ثم عاد الى خطبته* (ابن ابى شيبة ص : ২১০ دار قطنى ص : ১৬৯)
.
অর্থাৎ ‘নবী করীম (সা.) যখন হযরত সুলায়ক (রা.) কে দু’ রাকআত পড়ার হুকুম দিয়েছিলেন তখন খুতবা থেকে বিরত রইলেন। এমন কি যখন তিনি দু’ রাকআত পড়ে শেষ করলেন তখন তিনি পুনরায় খুতবা আরম্ভ করলেন। ’’
.
উক্ত রিওয়ায়াতের রাবীকে ইমাম দারা কুতনী যঈফ বলেছেন। কিন্তু এ রিওয়ায়ত উপরোল্লিখিত মুরসালে সহীহকে অতিরিক্ত শক্তির যোগান দিয়েছে। অধিকন্তু হাদীছে ইহাও প্রত্যক্ষ করা যায় যে, হযরত সুলায়ক (রা.) অতীব অভাবাক্রান্ত ও অনুগ্রহযোগ্য অবস্থায় এসেছিলেন সেহেতু রসূলুল্লাহ (সা.) তাকে সাহায্য করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কে উৎসাহিত করলেন। ফলে উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম (রা.) নিজের পরিধেয় জামা কাপড় খুলে পেশ করলেন। আর রসূলুল্লাহ (সা.) তন্মধ্যে দু’টি কাপড় তাকে প্রদান করলেন। (নাসায়ী ১ম খ- ২০৮ পৃ.)
.
সম্ভবতঃ এসব কর্ম থেকে অবসর হয়ে রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা আরম্ভ করেছিলেন। যার আলোচনা দারাকুতনী এবং ইবনে আবী শায়বা এর রিওয়ায়তে পূর্বে এসেছে।
.
সুতরাং এসব বিষয়গুলো যা উক্ত ঘটনায় ঘটেছে অর্থাৎ হযরত সুলায়ক (রা.) দু’ রাকআত নামায আদায় পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা থেকে বিরত থাকা, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কে চাঁদার জন্য উৎসহিত করা এবং সাহবায়ে কিরাম (রা.) পরিধেয় কাপড় দান করা প্রভৃতি কর্মগুলো খুতবার সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী হয়। কাজেই এগুলো তারই বিশেষত্বের উপর প্রয়োজ করা যেতে পারে।
.
কিন্তু এতদসত্ত্বেও যদি কারো জেদ হয় যে, তা হযতর সুলায়ক (রা.) এর সঙ্গে বিশেষত্ব নয়; বরং খুতবা চলাকালীন সময়ে তাহইয়াতুল মসজিদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ব্যাপকভাবে সুন্নত তাহলে আমাদের বলতে হয় যে, যদি খুতবা চলাকালীন সময়ে দু’ রাকআত পড়া হযরত সুলায়ক (রা.)এর সুন্নত হয়, তাহলে এ প্রকার ব্যক্তির জন্য খতীব সাহেব স্বীয় খুতবা থেকে বিরত থাকা রসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত হবে কাজেই খতীবের জন্য অপরিহার্য যে, তাহইয়াতুল মসজিদ আদায়কারীদের প্রতি লক্ষ্য করে খুতবা থেকে বিরত হয়ে সুন্নতে নবী (সা.) এর উপর আমল করা। এমন তো হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় যে, মুকতাদীগণ তো হযরত সুলায়ক (রা.) এর সুন্নতের উপর আমল করছে আর খতীব সাহেবের উপর নবী (সা.) এর সুন্নতের পাবন্দী অপরিহার্য হবে না। হ্যাঁ! হযরত সুলায়ক (রা.) এর সুন্নতের উপরও তখনই পুরোপুরি আ’মল হবে যখন প্রথমে মসজিদে এসে বসে যাওয়া হবে। অতঃপর খতীব সাহেব তাকে দু’ রাকআত আদায় করার নির্দেশ দেবেন। অতঃপর তার দু’ রাকআত নামায আদায় সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি স্বীয় খুতবা পাঠ বন্ধ রাখবেন। অতঃপর উপস্থিত লোকদের থেকে তার জন্য চাঁদাও আদায় করে দেবেন। তার পর পুনরায় খুতবা দেয়া শুরু করবেন।
.
এ তাহকীক (তথা নিশ্চয়তা প্রতিপাদন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত সুলায়ক (রা.) ও দু’ রাকআত হুবহু খুতবা পাঠকালে আদায় করেন নি। কেননা রসূলুল্লাহ (সা.) তার জন্য খুতবা বন্ধ করে রাখলেন, তখন তো তা আর খুতবা চলাকালীন সময় থাকলো না। এতদ্ব্যতীত রসূলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে অন্য কাউকে কিয়াস করা যায় না। কেননা রসূলুল্লাহ (সা.) এর আহবানে হুবহু নামাযের হালাতেও লব্বায়িক বলা ওয়াজিব। কাজেই রসূলুল্লাহ (সা.) হয়তো কোন উপযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে যখন হযরত সুলায়ক (রা.) কে দু’ রাকআত পড়ার হুকুম দেন তখন হুবহু খুবা অবস্থায়ও ইরশাদে নবী (সা.) এর উপর আ’মল করা অপরিহার্য ছিল এবং সে সময় তার থেকে খুতবা শ্রবণের ফরয মুলতবি ছিল। কিন্তু অন্যদের জন্য ইহা জায়েয নয় যে, খুতবা শ্রবণের ফরয পরিত্যাগ করে নফল (তথা তাহইয়াতুল মসজিদ) আদায়ে ব্যস্ত হওয়া।
.
❑ (ঘ) বিশেষত্বের একটি দলীল ইহাও যে, সহীহ ইবনে হেব্বান এর রিওয়ায়ত অনুযায়ী রসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সুলায়ক (রা.) কে বলেছিলেন :
.
اركع ركعتين ولاتعودن لمثل هذا* (موارد الظمان ص : ১৫০ نصب الراية : ص : ২০৩ ج : ১)
.
অর্থাৎ ‘তুমি দু’ রাকআত পড়। আর ভবিষ্যতে কখনো এরূপ করো না।’’

আর দারা কুতনীর এক রিওয়ায়তে আছে
ولاتعد لمثل هذا*
.
অর্থাৎ ‘আর ভবিষ্যতে এর অনুরূপ করো না।’’
.
যারা খুতবা চলাকালীন সময়ে তাহইয়াতুল মসজিদ পড়া জায়েয বলে থাকেন, তারা উপরোক্ত ইরশাদের এই ব্যাখ্যা করেন যে, এতে তাকে বিলম্বে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। কেননা তিনি পরবর্তী জুমুআয়ও দু’ রাকআত না পড়ে বসে গিয়েছিলেন তখন রসূলুল্লাহ (সা.) তাকে দু’ রাকআত পড়তে হুকুম দিয়েছিলন।
.
কিন্তু হযরাতে খুলাফায়ে রাশিদীন এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কিরাম (রা.) উক্ত ইরশাদের মর্ম এই বুঝেছেন যে, ভবিষ্যতে দু’ রাকআত পড়তে নিষেধ করেছেন, যার একটি ইঙ্গিত তো ইহাই যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি দু’ রাকআতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কাজেই এরই নিষেধাজ্ঞা হবে।
দ্বিতীয় ইঙ্গিত এই যে, হযরত সুলায়ক (রা.) পরবর্তী জুমুআয়ও দু’ রাকআত পড়েননি, তা উক্ত ইরশাদেরই উপর আমল ছিল। নতুবা ইহা অসম্ভব যে, তিনি গত জুমুআর নসীহত ভুলে যাবেন। আর রসূলুল্লাহ (সা.) পরবর্তী জুমুআয়ও তার দ্বারা দু’ রাকআত পড়ানোরও কোন বিশেষ উপযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে হবে। কেননা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা.) অন্য কোন সাহাবা দ্বারা পড়াননি।
.
সারকথা হচ্ছে যে, খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) জমহুরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এবং তাবেঈন (রহ.) হযরত সুলায়ক (রা.) এর রিওয়ায়তকে শরীআতের ব্যাপক হুকুম হিসাবে গ্রহণ করেন নি। এর একটি কারণ এই যে, রিওয়ায়তসমূহে বিভিন্ন ইঙ্গিত রয়েছে যে, বিষয়টি তার বিশেষত্ব।
.
❀ ৫। আর উক্ত রিওয়ায়তকে ব্যাপক আমল রূপে গ্রহণ না করার দ্বিতীয় কারণ এই হতে পারে যে, খুতবা চলাকালীন সময়ে নামায ও কথাবার্তার নিষেধাজ্ঞা পরবর্তীতে নাযিল হয়েছিল। আমাদের সামনে তো কুরআন মজীদ এবং হাদীছে নবী (সা.) এর ভাণ্ডার একই সময়ে পুরোপুরি ভাবে হস্তগত হয়েছে। কাজেই আমাদেরকে তো ইহা জানার জন্য যে, কোন আয়াত প্রথম নাযিল হয়েছে এবং কোন আয়াত পরে, কোন ইরশাদখানা রসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমে বলেছেন এবং কোনটি পরে? নকল এবং রিওয়ায়তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু হযরাতে খুলাফায়ে রাশিদীন এবং আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর জন্য কুরআন মজীদের আয়াতসমূহের অবতরণের এবং রসূলুল্লাহ (সা.) এর ইরশাদসমূহের তরতীব (তথা আগে পরের বিন্যাস) পর্যবেক্ষিত বস্তু ছিল। তারা জানতেন যে, কোন আয়াত কখন এবং কোন স্থলে নাযিল হয়েছে। আর রসূলুল্লাহ (সা.) এর কোন ইরশাদ কোন স্থল ও কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন? কোন হুকুম প্রথমে ছিল এবং কোনটি পরে? আল ইতকান গ্রন্থে النوع الثمانون এর মধ্যে হযরত আলী (রা.) থেকে নকল করেন যে, তিনি খুতবায় বলেছেন :
.
سلونى، فوالله لا تسألون عن شئ الا اخبركم، وسلونى عن كتاب الله ، فوالله مامن من اية الا وانا اعلم بليل نزلت ام بنهار ام فى سهل ام فى جبل*
.
অর্থাৎ ‘আমাকে জিজ্ঞাসা কর। আল্লাহ তায়ালার কসম! তোমরা আমার নিকট যে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর আমি তার উত্তর দেব। আর আমার কাছে কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর। আল্লাহ তাআলার কসম! কুরআন মজীদের এমন কোন আয়াত নেই যার সম্পর্কে আমি ভালভাবে অবগত নই যে, তা কি রাতে অবতীর্ণ হয়েছে কিংবা দিনে? ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে কিংবা পাহাড়ে?
.
আর হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) এর বাণী নকল করেছেন যে,
.
والله الذى لا اله غيره ما نزلت من اية من كتاب الله الا وانا اعلم فيمن نزلت واين نزلت* (ايضا)
.
অর্থাৎ ‘সেই মাহিমাম্বিত আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া অন্য কোন মা’বুদ নেই। কুরআন মজীদের এমন কোন আয়াত নেই, যার সম্পর্কে আমি উত্তম ভাবে অবহিত নই যে, তা কি সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছে এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে?
.
সুতরাং এই সকল আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) যখন এ রিওয়ায়তের মুকাবালায় উক্ত নসূস তথা আয়াত ও হাদীছসমূহের উপর আমল করেন, যাতে খুতবা চলাকালীন সময় নামায ও কথাবার্তার নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে, তখন এ রিওয়ায়ত যদি বিশষত্বের উপর প্রয়োগ না হয় তাহলে অবশ্যই তা متروك العمل (আমল বর্জিত) হবে।
.
❀ ৬। যে সকল হযরাত সুলায়ক (রা.) এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণ পেশ করে খুতবা চলাকালীন সময়ে তাহইয়াতুল মসজিদ পড়ার উপর জোর দিয়ে থাকেন তাদেরকে এই বিষয়ে গভীর চিন্তা করা উচিত যে, তাহইয়াতুল মসজিদ সাধারণ অবস্থায়ও মুস্তাহাব আর খুতবা শ্রবণ করা ফরয। মুস্তাহাবের উপর আমল করার জন্য কি ফরয পরিত্যাগ করা জায়েয আছে? আর তাহইয়াতুল মসজিদ না পড়া অবস্থায় যদিও একটি হাদীছের উপর আমল করা থেকে বঞ্ছিত হওয়া অপরিহার্য হয় বটে, কিন্তু খুতবা শ্রবণ করা এবং নীরব থাকা যে ফরয তা পরিত্যাগ করার কারণে তো কুরআন মজীদ, মুতাওয়াতির হাদীছসমূহ এবং খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এর বিপরীত করা অপরিহার্য হয়। একটি হাদীছের উপর আমল করার জন্য কি কুরআন মজীদ, মুতাওয়াতির হাদীছসমূহ এবং খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এর হুকুম থেকে ফিরে থাকা জায়েয আছে?
.
░▒▓█►হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এর ঘটনা◄█▓▒░
.
প্রশ্নের মধ্যে তিরমিযী শরীফের বরাতে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এর ঘটনাকে রঙ মিশিয়ে উল্লেখ করে খুতবা চলাকালীন সময়ে নামায পড়ার নিষেধাজ্ঞাকে ‘মারওয়ানী বিদআত’ বলা হয়েছে। এ বিষয়টি পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, ইহা মারওয়ানী হুকুম নয়; বরং কুরআনী হুকুম। আর তা মারওয়ানী বিদআত নয়; বরং রসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরাতে খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এর সুন্নত। যে বিষয়টি কুরআনে করীম, সুন্নতে মুতাওয়াতিরা এবং খুলাফায়ে রাশিদীন (রা.) এর আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, উহাকে কেবল মারওয়ান সমর্থন করেছেন বলেই মারওয়ানী বিদআত’ বলে দেয়া কিভাবে সহীহ হবে? সম্ভবতঃ তারা জুমুআর সম্পূর্ণ খুতবাকেই মারওয়ানী বিদআত’ বলে দিচ্ছেন।
.
রইল এই বিষয়টি যে, হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) দু’ রাকআত পড়তে জোর দেয়ার বিষয়টির উপর দলীল হিসাবে তো তারা সেই হযরত সুলায়ক (রা.) এর ঘটনাই পেশ করেছেন। আর তা থেকে দু’ রাকআত নামায পড়া জায়েয হওয়ার মাসয়ালা উদ্ভাবন করেছেন। অথচ খুলাফায়ে রাশিদীন এবং আকাবিরে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর বিপরীত ফাতওয়া দিয়েছে। কাজেই এখন বিবেক ইনসাফ করে বলুন যে, আমাদের কোন তরীকা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
.
আর এ অধমের ধারণায় তো হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এ স্থলে জোর দেয়ার বিষয়টি অন্য কোন কথারই ইঙ্গিত বহন করছে। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এই যে, যালিম আমীরদের যুগে সালাফে সালিহীনের মধ্যে মাসয়ালাটি আলোচনাধীন ছিল যে, যদি ইমাম খুতবার মধ্যে যিকর পরিত্যাগ করে অপ্রাসঙ্গিক কথা আরম্ভ করে, তাহলে কি তা শ্রবণ করা অপরিহার্য হবে?
কতক আকাবিরের অভিমত ছিল যে, ইমাম যেহেতু যিকর থেকে বের হয়ে গেছেন আর যিকরের শ্রবণই কেবল অপরিহার্য হয়, তার অপ্রাসঙ্গিক কথা নয়, সেহেতু সেই সময় তার খুতবার বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না। ফলে খুতবা শ্রবণ ওয়াজিব থাকে না।
.
যেমন মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ২২৬ পৃষ্ঠায় আছে যে, হাজ্জাজ বিন ইউসূফ খুতবা দিচ্ছিলেন আর ইমাম শাবী (রহ.) এবং আবূ বুরদা (রহ.) পরস্পর কথা বলছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, আপনি খুতবা চলাকালীন সময়ে কথাবার্তা বলছেন? তিনি জবাবে বললেন, এসব অপ্রাসঙ্গি কথা শ্রবণের জন্য নীরবতা অবলম্বনের হুকুম দেয়া হয়নি।
.
আর মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ১২৬ পৃষ্ঠায় হযরত ইব্রাহীম নাখয়ী (রহ.) এবং সাঈদ বিন যুবায়র (রা.) এর থেকে অনুরূপ ঘটনা নকল করা হয়েছে। এ তো অসম্ভব নয় যে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.)ও এইরূপ অবস্থায় সম্মুখীন হয়ে ছিলেন। তাই তিনি নামায আরম্ভ করে ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি হযরত সুলায়কা (রা.) এর হাদীছের বরাত দেয়াও যথাস্থানে সঠিক হবে। কেননা হযরত সুলায়কা (রা.) এর দু’ রাকআত নামায আদায়ের সময় খুতবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। অনুরূপ আমিও খুতবা বন্ধ থাকার অবস্থায় দু’ রাকআত আদায় করেছি।
:
:
দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার দলিল
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
১.
.
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ أَسْمَاءَ، قَالَ أَخْبَرَنَا جُوَيْرِيَةُ، عَنْ مَالِكٍ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، بَيْنَمَا هُوَ قَائِمٌ فِي الْخُطْبَةِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِذْ دَخَلَ رَجُلٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ الأَوَّلِينَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَنَادَاهُ عُمَرُ أَيَّةُ سَاعَةٍ هَذِهِ قَالَ إِنِّي شُغِلْتُ فَلَمْ أَنْقَلِبْ إِلَى أَهْلِي حَتَّى سَمِعْتُ التَّأْذِينَ، فَلَمْ أَزِدْ أَنْ تَوَضَّأْتُ‏.‏ فَقَالَ وَالْوُضُوءُ أَيْضًا وَقَدْ عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَأْمُرُ بِالْغُسْلِ‏
.
ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) জুম্মার দিন দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম যুগের একজন মুহাজির সাহাবী এলেন। উমর (রাঃ) তাঁকে ডেকে বললেন, এখন সময় কত? তিনি বললেন, আমি ব্যস্ত ছিলাম, তাই ঘরে ফিরে আসতে পারিনি। এমন সময় আযান শুনতে পেয়ে শুধু উযূ করে নিলাম। উমর (রাঃ) বললেন, কেবল উযূই? অথচ আপনি জানেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসলের আদেশ দিতেন।
(সহীহ বুখারী-হা/৮৩৪)
.
২.
.
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سُلَيْمَانَ، حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي يُونُسُ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ، أَنَّهُ سَمِعَ أَسْمَاءَ بِنْتَ أَبِي بَكْرٍ ـ رضى الله عنهما ـ تَقُولُ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَطِيبًا فَذَكَرَ فِتْنَةَ الْقَبْرِ الَّتِي يَفْتَتِنُ فِيهَا الْمَرْءُ، فَلَمَّا ذَكَرَ ذَلِكَ ضَجَّ الْمُسْلِمُونَ ضَجَّةً‏
.
উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি আসমা বিনতে আবূ বকর (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একবার) দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন, তাতে তিনি কবরে মানুষ যে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, তার বর্ণনা দিলে মুসলমানগণ ভয়ার্ত চিৎকার করতে লাগলেন।
(সহীহ বুখারী-হা/১২৯০)
.
৩.
.
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَمْرٍو، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُولُ ‏ “‏ إِنَّكُمْ مُلاَقُو اللَّهِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً ‏
.
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে শুনেছি তিনি বলেছেনঃ নিশ্চয়ই তোমরা আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে মুলাকাত করবে খালি গা, উলঙ্গ ও খাতনাবিহীন অবস্থায়।
(সহীহ বুখারী-হা/৬০৮১)
.
৪.
.
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، أَخْبَرَنِي السَّائِبُ بْنُ يَزِيدَ، سَمِعَ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ، خَطَبَنَا عَلَى مِنْبَرِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏
.
সাইব ইবনু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে শুনেছি।
(সহীহ বুখারী-হা/৬৮৩৮)
:
:
দুই খুতবার মাঝে বসার দলিল
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
১.
.
حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ الْقَوَارِيرِيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ الْحَارِثِ، قَالَ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ قَائِمًا ثُمَّ يَقْعُدُ ثُمَّ يَقُومُ، كَمَا تَفْعَلُونَ الآنَ‏
.
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। এরপর বসতেন এবং পুনরায় দাঁড়াতেন। যেমন তোমরা এখন করে থাক।
(সহীহ বুখারী-হা/৮৭৪)
.
২.
.
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ الْمُفَضَّلِ، قَالَ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ خُطْبَتَيْنِ يَقْعُدُ بَيْنَهُمَا‏
.
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ খুতবা দিতেন আর দু’ খুতবার মাঝে বসতেন।
(সহীহ বুখারী-হা/৮৮১)
.
৩.
.
عَنْ عَبْدِ اللهِ: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَانَ يَخْطُبُ الْخُطْبَتَيْنِ، وَهُوَ قَائِمٌ، وَكَانَ يَفْصِلُ بَيْنَهُمَا بِجُلُوسٍ»

[التعليق] 1446 – قال الأعظمي: إسناده صحيح
.
হযরত আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ দাঁড়িয়ে দুই খুতবা দিতেন এবং দুই খুতবার মাঝে বসতেন।
(সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী-হা/১৭২৩; সুনানে নাসায়ী কুবরা-হা/১৭৩৪; সুনানে নাসায়ী-হা/১৪১৬; সহীহ ইবনে খুজাইমা-১/৭০০, হা/১৪৪৬; সুনানে দারা কুতনী-হা/১৬৩০)
হাদীসটির সনদ সহীহ।
:
:
ঈদের নামাযের পর দুই খুতবা দেয়ার দলিল
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
অবশ্যই প্রমান আছে এবং এটি সম্পূর্ণ সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
.
১.
.
حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْمُنْذِرِ، قَالَ حَدَّثَنَا أَنَسٌ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ،‏.‏ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي فِي الأَضْحَى وَالْفِطْرِ، ثُمَّ يَخْطُبُ بَعْدَ الصَّلاَةِ‏
.
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন সালাত আদায় করতেন। আর সালাত শেষে খুতবা দিতেন।
(সহীহ বুখারী-হা/৯০৯, ৯১২)
.
২.
.
حَدَّثَنَا مُسْلِمٌ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ جُنْدَبٍ، قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ النَّحْرِ ثُمَّ خَطَبَ، ثُمَّ ذَبَحَ فَقَالَ ‏ “‏ مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيَذْبَحْ أُخْرَى مَكَانَهَا، وَمَنْ لَمْ يَذْبَحْ فَلْيَذْبَحْ بِاسْمِ اللَّهِ ‏
.
জুনদাব ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন সালাত আদায় করেন, এরপর খুতবা দেন। তারপর যবেহ করেন এবং তিনি বলেন, সালাত -এর পূর্বে যে ব্যাক্তি যবেহ করবে তাকে তার স্থলে ‌আর একটি যবেহ করতে হবে। এবং যে যবেহ করেনি, আল্লাহর নামে তার যবেহ করা উচিৎ।
(সহীহ বুখারী-হা/৯৩৩)
.
৩.
.
وَحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَبْدَةُ بْنُ سُلَيْمَانَ، وَأَبُو أُسَامَةَ عَنْ عُبَيْدِ، اللَّهِ عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانُوا يُصَلُّونَ الْعِيدَيْنِ قَبْلَ الْخُطْبَةِ ‏
.
ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বাকর ও উমর (রাঃ) খুতবা দেয়ার পূর্বে উভয় ঈদের সালাত আদায় করতেন।
(সহীহ মুসলিম-হা/১৯২৫)
.
৪.
.
حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، ح وَحَدَّثَنَا ابْنُ كَثِيرٍ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ عَطَاءٍ، قَالَ أَشْهَدُ عَلَى ابْنِ عَبَّاسٍ وَشَهِدَ ابْنُ عَبَّاسٍ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ خَرَجَ يَوْمَ فِطْرٍ فَصَلَّى ثُمَّ خَطَبَ ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ وَمَعَهُ بِلاَلٌ ‏.‏ قَالَ ابْنُ كَثِيرٍ أَكْبَرُ عِلْمِ شُعْبَةَ فَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ فَجَعَلْنَ يُلْقِينَ ‏
.
ইবনে আব্বাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন নামায শেষে খুতবা দেন। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম . বেলাল (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে মহিলাদের নিকট যান এবং তাদেরকে দান-সদকার জন্য উদ্ভুদ্ধ করেন। তারা নিজেদের অলংকারাদি দান করতে থাকেন।
(আবু দাউদ-হা/১১৪২)
.
৫.
.
أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ أَبِي سُلَيْمَانَ، عَنْ عَطَاءٍ، عَنْ جَابِرٍ، قَالَ صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي عِيدٍ قَبْلَ الْخُطْبَةِ بِغَيْرِ أَذَانٍ وَلاَ إِقَامَةٍ ‏
.
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে ঈদের দিনে সালাত আদায় করলেন খুৎবার পুর্বে আযান এবং ইকামাত ব্যতীত।
(সূনান নাসাঈ-হা/১৫৬৫)
.
৬.
.
أَخْبَرَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ أَنْبَأَنَا عَبْدَةُ بْنُ سُلَيْمَانَ، قَالَ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ – رضى الله عنهما – كَانُوا يُصَلُّونَ الْعِيدَيْنِ قَبْلَ الْخُطْبَةِ
.
ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর এবং উমর (রাঃ) উভয় ঈদের সালাত খুৎবার পূর্বে আদায় করতেন।
(সূনানে নাসাঈ-হা/১৫৬৭)
.
৭.
حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، سَمِعَ أَبَا عُبَيْدٍ، قَالَ: شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ عُمَرَ، فَبَدَأَ بِالصَّلاةِ قَبْلَ الْخُطْبَةِ، وَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ صِيَامِ هَذَيْنِ الْيَوْمَيْنِ، أَمَّا يَوْمُ الْفِطْرِ فَفِطْرُكُمْ مِنْ صَوْمِكُمْ، وَأَمَّا يَوْمُ الْأَضْحَى فَكُلُوا مِنْ لَحْمِ نُسُكِكُمْ إسناده صحيح على شرط الشيخين. أبو عبيد: هو سعد بن عبيد الزهري مولى عبد الرحمن بن أزهر وأخرجه الحميدي (8) ، وابن أبي شيبة 3 / 103 و104، وأبو داود (2416) ، وابن ماجه (1722) ، وأبو يعلى (150) و (152) و (238) ، وابن الجارود (401) وابن خزيمة (2959) ، والطحاوي 2 / 247 من طرق عن سفيان بن عيينة، بهذا الإسناد وأخرجه مالك في ” الموطأ ” 1 / 178، ومن طريقه البخاري (1990) و (5571) ، ومسلم (1137) ، وأبو يعلى (232) ، وابن حبان (3600) ، والبغوي (1795) عن الزهري، به. وسيأتي برقم (224) و (225) و (282)
.
আবু উবাইদ বলেন, আমি উমার (রাঃ) এর সাথে ঈদের নামায পড়েছি। তিনি খুৎবার আগে নামায পড়লেন এবং বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। ঈদুল ফিতরের দিন তোমাদের পানাহারই তোমাদের রোযার শামিল। আর ঈদুল আযহার দিন তোমরা তোমাদের কুরবানীর গোশতের একাংশ খাও।
(মুসনাদে আহমাদ-হা/১৬৩, ২২৪, ২৮২)
:
:
ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়া সুন্নাত
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
.
ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়া সুন্নাত। যা সহীহ বুখারীসহ একাধিক কিতাব দ্বারা প্রমাণিত!
.
❏ বর্তমানে কথিত আহলে হাদীস এর কতক শায়খ বলে বেড়াচ্ছে যে, মিম্বরের উপর ঈদের খুৎবা দেয়া বেদআত! কারণ সহীহ বুখারীর ৯৫৬নং হাদীস; যা হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত। তাতে ঈদের আলোচনা এসেছে সেখানে রাসূল (সা.) খুৎবা মিম্বারে দিয়েছে এই কথাটি উল্লেখ নেই। তাই এটি বেদআত….!
.
তাদের এই সব দলীল শুনলে আমার খুব দুঃখ লাগে। কেননা যেই হাদীসের প্রথম অংশ দিয়ে তারা মিম্বরে খুৎবাকে বেদআত বলে ঐ হাদীসের শেষ অংশের মাঝেই মিম্বরে খুৎবা দেয়ার আলোচনা রয়েছে। তাহলে দেখুন হাদীসটি-
.
ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ‏( /2 17 ‏)
ﺑَﺎﺏُ ﺍﻟﺨُﺮُﻭﺝِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻤُﺼَﻠَّﻰ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﻣِﻨْﺒَﺮٍ
956 – ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﺳَﻌِﻴﺪُ ﺑْﻦُ ﺃَﺑِﻲ ﻣَﺮْﻳَﻢَ، ﻗَﺎﻝَ : ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻣُﺤَﻤَّﺪُ ﺑْﻦُ ﺟَﻌْﻔَﺮٍ، ﻗَﺎﻝَ : ﺃَﺧْﺒَﺮَﻧِﻲ ﺯَﻳْﺪُ ﺑْﻦُ ﺃَﺳْﻠَﻢَ، ﻋَﻦْ ﻋِﻴَﺎﺽِ ﺑْﻦِ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺑْﻦِ ﺃَﺑِﻲ ﺳَﺮْﺡٍ، ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﺳَﻌِﻴﺪٍ ﺍﻟﺨُﺪْﺭِﻱِّ، ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﻛَﺎﻥَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻳَﺨْﺮُﺝُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟﻔِﻄْﺮِ ﻭَﺍﻷَﺿْﺤَﻰ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻤُﺼَﻠَّﻰ، ﻓَﺄَﻭَّﻝُ ﺷَﻲْﺀٍ ﻳَﺒْﺪَﺃُ ﺑِﻪِ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓُ، ﺛُﻢَّ ﻳَﻨْﺼَﺮِﻑُ، ﻓَﻴَﻘُﻮﻡُ ﻣُﻘَﺎﺑِﻞَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ، ﻭَﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﺟُﻠُﻮﺱٌ ﻋَﻠَﻰ ﺻُﻔُﻮﻓِﻬِﻢْ ﻓَﻴَﻌِﻈُﻬُﻢْ، ﻭَﻳُﻮﺻِﻴﻬِﻢْ، ﻭَﻳَﺄْﻣُﺮُﻫُﻢْ، ﻓَﺈِﻥْ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﺃَﻥْ ﻳَﻘْﻄَﻊَ ﺑَﻌْﺜًﺎ ﻗَﻄَﻌَﻪُ، ﺃَﻭْ ﻳَﺄْﻣُﺮَ ﺑِﺸَﻲْﺀٍ ﺃَﻣَﺮَ ﺑِﻪِ، ﺛُﻢَّ ﻳَﻨْﺼَﺮِﻑُ ‏» ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺑُﻮ ﺳَﻌِﻴﺪٍ : ‏« ﻓَﻠَﻢْ ﻳَﺰَﻝِ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻋَﻠَﻰ ﺫَﻟِﻚَ ﺣَﺘَّﻰ ﺧَﺮَﺟْﺖُ ﻣَﻊَ ﻣَﺮْﻭَﺍﻥَ – ﻭَﻫُﻮَ ﺃَﻣِﻴﺮُ ﺍﻟﻤَﺪِﻳﻨَﺔِ – ﻓِﻲ ﺃَﺿْﺤًﻰ ﺃَﻭْ ﻓِﻄْﺮٍ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﺗَﻴْﻨَﺎ ﺍﻟﻤُﺼَﻠَّﻰ ﺇِﺫَﺍ ﻣِﻨْﺒَﺮٌ ﺑَﻨَﺎﻩُ ﻛَﺜِﻴﺮُ ﺑْﻦُ ﺍﻟﺼَّﻠْﺖِ، ﻓَﺈِﺫَﺍ ﻣَﺮْﻭَﺍﻥُ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﺃَﻥْ ﻳَﺮْﺗَﻘِﻴَﻪُ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼَﻠِّﻲَ، ﻓَﺠَﺒَﺬْﺕُ ﺑِﺜَﻮْﺑِﻪِ، ﻓَﺠَﺒَﺬَﻧِﻲ، ﻓَﺎﺭْﺗَﻔَﻊَ، ﻓَﺨَﻄَﺐَ ﻗَﺒْﻞَ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓِ ‏» ، ﻓَﻘُﻠْﺖُ ﻟَﻪُ : ﻏَﻴَّﺮْﺗُﻢْ ﻭَﺍﻟﻠَّﻪِ، ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺃَﺑَﺎ ﺳَﻌِﻴﺪٍ : ‏« ﻗَﺪْ ﺫَﻫَﺐَ ﻣَﺎ ﺗَﻌْﻠَﻢُ ‏» ، ﻓَﻘُﻠْﺖُ : ﻣَﺎ ﺃَﻋْﻠَﻢُ ﻭَﺍﻟﻠَّﻪِ ﺧَﻴْﺮٌ ﻣِﻤَّﺎ ﻻَ ﺃَﻋْﻠَﻢُ، ﻓَﻘَﺎﻝَ : ‏« ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻮﻧُﻮﺍ ﻳَﺠْﻠِﺴُﻮﻥَ ﻟَﻨَﺎ ﺑَﻌْﺪَ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓِ، ﻓَﺠَﻌَﻠْﺘُﻬَﺎ ﻗَﺒْﻞَ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓِ »
.
অর্থ : হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে গমন করে সেখানে তিনি প্রথম যে কাজ শুরু করতেন তা হল সালাত। আর সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং তারা তাদের কাতারে বসে থাকতেন।……..
আবূ সাঈদ (রা.) বলেন, লোকেরা বরাবর এ নিয়েমই অনুসরণ করে আসছিল। অবশেষে যখন মারওয়ান মদীনার আমীর হলেন, তখন ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিতরের উদ্দেশ্যে আমি তার সঙ্গে বের হলাম। আমরা যখন ঈদগাহে পৌঁছলাম তখন সেখানে একটি মিম্বর দেখতে পেলাম, সেটি কাসীর ইবনে সালত (রা.) তৈরী করে ছিলেন। (তাতে খুৎবা দেয়া হলো)…..সহীহ বুখারী-২/১৭, হাদীস-৯৫৬।
.
❖ উল্লেখ্য যে, উক্ত হাদীসটিকে ইমাম বুখারী (রহ.) ﺑَﺎﺏُ ﺍﻟﺨُﺮُﻭﺝِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻤُﺼَﻠَّﻰ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﻣِﻨْﺒَﺮٍ (অর্থাৎ মিম্বার না নিয়ে ঈদগাহে গমণ করা) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছেন। আর ইমাম বুখারী (রহ.) এর যুক্তি হলো হাদীসের মাঝে এসেছে ﻓَﻴَﻘُﻮﻡُ ﻣُﻘَﺎﺑِﻞَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ، অর্থাৎ রাসূল (সা.) লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন। যদি মিম্বর থাকতো তাহলে লোকদের মুখামুখি হওয়া সম্ভব কি করে?
.
যাই হোক ইমাম বুখারী (রহ.) শুধু মাত্র একটি যুক্তি দিয়ে তার মতামত সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন, যা প্রকৃত পক্ষে হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত নয়। আর কি করেই বা প্রমাণিত হবে ঐ হাদীসের মাঝেইতো স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, মারওয়ান এর সময় মিম্বরের উপর খুৎবা দেয়া হতো। তাহলে ইমাম বুখারী (রহ.) এর যুক্তির উপর শ্লোগানদারীগণ এখানে কি জবাব দিবেন???
.
আর যেই সাহাবী তথা আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) রাসূল (সা.) এর সাথে ছিলেন তিনি মারওয়ান এর সময়েও ছিলেন। যখন মারওয়ান মিম্বরে খুৎবা দিচ্ছিলো। যদি এটি বেদআত হতো তাহলে তিনি বারণ করলেন না কেন?
যার দ্বারাও স্পষ্ট যে, রাসূল (সা.) এর যুগেও এই প্রথা ছিল।
.
এছাড়াও দেখুন ঈদের খুৎবা সম্ভলিত সহীহ বুখারীর অন্য একটি বর্ণনার মাঝে কি ‍উল্লেখ হয়েছে?-
.
ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ‏( /2 18 ‏)
961 – ﻭَﻋَﻦْ ﺟَﺎﺑِﺮِ ﺑْﻦِ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﻠَّﻪِ، ﻗَﺎﻝَ : ﺳَﻤِﻌْﺘُﻪُ ﻳَﻘُﻮﻝُ : ‏« ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻗَﺎﻡَ ﻓَﺒَﺪَﺃَ ﺑِﺎﻟﺼَّﻼَﺓِ، ﺛُﻢَّ ﺧَﻄَﺐَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺑَﻌْﺪُ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻓَﺮَﻍَ ﻧَﺒِﻲُّ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻧَﺰَﻝَ، ﻓَﺄَﺗَﻰ ﺍﻟﻨِّﺴَﺎﺀَ، ﻓَﺬَﻛَّﺮَﻫُﻦَّ ﻭَﻫُﻮَ ﻳَﺘَﻮَﻛَّﺄُ ﻋَﻠَﻰ ﻳَﺪِ ﺑِﻼَﻝٍ، ﻭَﺑِﻼَﻝٌ ﺑَﺎﺳِﻂٌ ﺛَﻮْﺑَﻪُ ﻳُﻠْﻘِﻲ ﻓِﻴﻪِ ﺍﻟﻨِّﺴَﺎﺀُ ﺻَﺪَﻗَﺔً ‏» ﻗُﻠْﺖُ ﻟِﻌَﻄَﺎﺀٍ : ﺃَﺗَﺮَﻯ ﺣَﻘًّﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻹِﻣَﺎﻡِ ﺍﻵﻥَ : ﺃَﻥْ ﻳَﺄْﺗِﻲَ ﺍﻟﻨِّﺴَﺎﺀَ ﻓَﻴُﺬَﻛِّﺮَﻫُﻦَّ ﺣِﻴﻦَ ﻳَﻔْﺮُﻍُ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺇِﻥَّ ﺫَﻟِﻚَ ﻟَﺤَﻖٌّ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﺃَﻥْ ﻻَ ﻳَﻔْﻌَﻠُﻮﺍ »
.
হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে এ-ও বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) দাঁড়িয়ে প্রথমে সালাত আদায় করলেন এবং পরে লোকদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিলেন। যখন নবী (সা.) খুৎবা শেষ করলেন, তিনি (মিম্বর থেকে) নেমে মহিলাগণের (কাতারে) কাছে আসলেন এবং নসীহত করলেন।……সহীহ বুখারী-২/২৮, হাদীস-৯৬১।
.
উল্লেখ্য যে, আহলে হাদীস ভাইদের মহামান্য শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিনকে ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন-
.
ﻣﺠﻤﻮﻉ ﻓﺘﺎﻭﻯ ﻭﺭﺳﺎﺋﻞ ﺍﺑﻦ ﻋﺜﻴﻤﻴﻦ ” ‏( 16 350/ ‏) .
ﻭﻗﺪ ﺳﺌﻞ ﺍﻟﺸﻴﺦ ﺍﺑﻦ ﻋﺜﻴﻤﻴﻦ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ :
ﻫﻞ ﻳﺴﻦ ﻟﻺﻣﺎﻡ ﺃﻥ ﻳﺨﻄﺐ ﻋﻠﻰ ﻣﻨﺒﺮ ﻓﻲ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﻌﻴﺪ؟
ﻓﺄﺟﺎﺏ : ” ﻳﺮﻯ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ ﺃﻧﻪ ﺳﻨﺔ ، ﻷﻥ ﻓﻲ ﺣﺪﻳﺚ ﺟﺎﺑﺮ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﺃﻥ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ، ﺧﻄﺐ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻓﻘﺎﻝ : ‏( ﺛﻢ ﻧﺰﻝ ﻓﺄﺗﻰ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ ‏) ﻗﺎﻟﻮﺍ : ﻭﺍﻟﻨﺰﻭﻝ ﻻ ﻳﻜﻮﻥ ﺇﻻ ﻣﻦ ﻣﻜﺎﻥ ﻋﺎﻝٍ ، ﻭﻫﺬﺍ ﻫﻮ ﺍﻟﺬﻱ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﻌﻤﻞ .
ﻭﺫﻫﺐ ﺑﻌﺾ ﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ ﺇﻟﻰ ﺃﻥ ﺍﻟﺨﻄﺒﺔ ﺑﺪﻭﻥ ﻣﻨﺒﺮ ﺃﻭﻟﻰ .
ﻭﺍﻷﻣﺮ ﻓﻲ ﻫﺬﺍ ﻭﺍﺳﻊ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠﻪ ” .
ﺍﻧﺘﻬﻰ ﻣﻦ “
.
অনেক আলেমগণই ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়াকে সুন্নাত বলেছেন।
কেননা হযরত জাবের (রা.) এর (উল্লেখিত হাদীসে) এসেছে যে,
.
ﺧﻄﺐ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻓﻘﺎﻝ : ‏( ﺛﻢ ﻧﺰﻝ ﻓﺄﺗﻰ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ )
.
‘‘রাসূল (সা.) মানুষের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিয়ে অবতরণ করলেন এবং মহিলাদের নিকট আসলেন’’
আর অবতরণতো কোন উচু স্থানে (যেমন মিম্বার ইত্যদিতে) গ্রমণ ব্যতীত হয় না। তাই বর্তমানে এটির উপরই আমল করা হয়…..। মাজমুউ ফাতওয়া ওয়া রাসায়েলু ইবনে উসাইমিন-১৬/৩৫০।
.
❖ উক্ত হাদীস এর ব্যাখ্যায় সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ব্যাখ্যাবিত আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন-
.
ﻓﺘﺢ ﺍﻟﺒﺎﺭﻱ ﻻﺑﻦ ﺣﺠﺮ ‏( /2 467 ‏)
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻓَﺮَﻍَ ﻧَﺰَﻝَ ﻓِﻴﻪِ ﺇِﺷْﻌَﺎﺭٌ ﺑِﺄَﻧَّﻪُ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺨْﻄُﺐُ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻜَﺎﻥٍ ﻣُﺮْﺗَﻔِﻊٍ
.
হযরত জাবের (রা.) এর হাদীসে এসেছে- ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻓَﺮَﻍَ ﻧَﺰَﻝَ ‘‘তিনি খুৎবা শেষ করে অবতরণ করতেন’’ যার দ্বারা স্পষ্ট যে, রাসূল (সা.) কোন উঁচু স্থানে ঈদের খুৎবা দিতেন। ফাতহুল বারী-২/৪৬৭।
.
এখন দেখুন এ বিষয়ে সুনানে তিরমিযী এর একটি সহীহ বর্ণনা-
.
ﺳﻨﻦ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ﺕ ﺑﺸﺎﺭ ‏( /3 152 ‏)
1521 – ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻗُﺘَﻴْﺒَﺔُ، ﻗَﺎﻝَ : ﺣَﺪَّﺛَﻨَﺎ ﻳَﻌْﻘُﻮﺏُ ﺑْﻦُ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ، ﻋَﻦْ ﻋَﻤْﺮِﻭ ﺑْﻦِ ﺃَﺑِﻲ ﻋَﻤْﺮٍﻭ، ﻋَﻦِ ﺍﻟْﻤُﻄَّﻠِﺐِ، ﻋَﻦْ ﺟَﺎﺑِﺮِ ﺑْﻦِ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻗَﺎﻝَ : ﺷَﻬِﺪْﺕُ ﻣَﻊَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺍﻷَﺿْﺤَﻰ ﺑِﺎﻟﻤُﺼَﻠَّﻰ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻗَﻀَﻰ ﺧُﻄْﺒَﺘَﻪُ ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ، ﻓَﺄُﺗِﻲَ ﺑِﻜَﺒْﺶٍ، ﻓَﺬَﺑَﺤَﻪُ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﺑِﻴَﺪِﻩِ، ﻭَﻗَﺎﻝَ : ﺑِﺴْﻢِ ﺍﻟﻠﻪِ، ﻭَﺍﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻛْﺒَﺮُ، ﻫَﺬَﺍ ﻋَﻨِّﻲ ﻭَﻋَﻤَّﻦْ ﻟَﻢْ ﻳُﻀَﺢِّ ﻣِﻦْ ﺃُﻣَّﺘِﻲ .
__________
‏[ ﺣﻜﻢ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ‏] : ﺻﺤﻴﺢ ]
.
অর্থ : হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি ঈদুল আযহাতে রাসূল (সা.) এর সাথে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন খুৎবা শেষ করলেন তখন ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ মিম্বর থেকে অবতরণ করেন।…..তিরমিযী-৩/১৫২, হাদীস-১৫২১।
.
শায়খ আলবানী নিজেও উক্ত হাদীসকে সহীহ বলেছেন। অতএব ফেৎনা করার সুযোগ কোথায়?
.
❖ আহলে হাদীসদের অন্য একজন মহামান্য সুনানে তিরমিযী এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাবিদ আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহঃ বলেন-
.
ﺗﺤﻔﺔ ﺍﻷﺣﻮﺫﻱ ‏( /5 94 ‏)
‏( ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ ‏) ﻓِﻴﻪِ ﺛُﺒُﻮﺕُ ﻭُﺟُﻮﺩِ ﺍﻟْﻤِﻨْﺒَﺮِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤُﺼَﻠَّﻰ ﻭَﺃَﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺨْﻄُﺐُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ
.
হাদীসের শব্দ ( ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ ) ‘‘রাসূল (সা.) মিম্বর থেকে অবতরণ করতেন’’ দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূল (সা.) এর যুগেও ঈদগাহে মিম্বর ছিল এবং নবী (সা.) তাতেই ঈদের খুৎবা দিতেন। তোহফাতুল আহওয়াযী-৫/৯৪।
.
❖ আহলে হাদীস ভাইদের আরো একজন্য মহামান্য সুনানে আবূ দাউদের ব্যাখ্যাবিদ আযীমাবাদী উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন-
.
ﻋﻮﻥ ﺍﻟﻤﻌﺒﻮﺩ ﻭﺣﺎﺷﻴﺔ ﺍﺑﻦ ﺍﻟﻘﻴﻢ ‏( /8 3 ‏)
‏( ﻧَﺰَﻝَ ﻣِﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ ‏) ﻓِﻴﻪِ ﺛُﺒُﻮﺕُ ﻭُﺟُﻮﺩِ ﺍﻟْﻤِﻨْﺒَﺮِ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺼﻠﻲ ﻭﺃﻥ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺨْﻄُﺐُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ
হাদীসের শব্দ ( ﻧَﺰَﻝَ ﻋَﻦْ ﻣِﻨْﺒَﺮِﻩِ ) ‘‘রাসূল (সা.) মিম্বর থেকে অবতরণ করতেন’’ দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূল (সা.) এর যুগেও ঈদগাহে মিম্বর ছিল এবং নবী (সা.) তাতেই ঈদের খুৎবা দিতেন। আওনুল মাবুদ-৮/০৩।
.
❖ সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাবিদ আল্লাম ইবনু বাত্তাল (রহ.) বলেন-
.
ﺷﺮﺡ ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻯ ﻻﺑﻦ ﺑﻄﺎﻝ ‏( /2 554 ‏)
ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻤﺆﻟﻒ : ﻗﺎﻝ ﺃﺷﻬﺐ ﻓﻰ ﺍﻟﻤﺠﻤﻮﻋﺔ : ﺧﺮﻭﺝ ﺍﻟﻤﻨﺒﺮ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﻌﻴﺪﻳﻦ ﻭﺍﺳﻊ ﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺃﺧﺮﺝ ﻭﺇﻥ ﺷﺎﺀ ﺗﺮﻙ
.
অর্থ : আল্লামা আশহাব তার ‘‘মাজমুয়া’’ এর মাঝে বলেন, ঈদের খুৎবা মিম্বরে দেয়ার বিষয়টির মাঝে ব্যাপকতা রয়েছে, কেউ চাইলে দিতে পারে আর না চাইলে না। শারহু সহীহিল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল-২/৫৫৪
.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *